নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৪ জুলাই, ২০১৭
হাওড়ে অকাল বন্যার মতো চলমান বন্যায়ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন উপজেলায় নদী রক্ষা বাঁধ ভেঙে অনেক এলাকা প্লাবিত হয়ে ১০-১৫ দিন ধরে স্থায়ী বন্যার আকার নিয়েছে।
দুর্গত মানুষের দাবি, নতুন বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি সঠিকভাবে নদী রক্ষা বাঁধগুলো মেরামত করা হলে পরিস্থিতি এত নাজুক হত না। এজন্য দুর্গত এলাকার মানুষ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি পাউবো’র অবহেলাকে দায়ী করছেন। পাউবো’র শীর্ষ কর্মকর্তারা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে অপ্রতুল বরাদ্দের কথা বলছেন।
চলতি বর্ষা মৌসুমে আগে বন্যা নিয়ন্ত্রণ রক্ষা বাঁধ মেরামত ও নতুন বাঁধ নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে ৩৫ কোটি টাকার চাহিদাপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু চাহিদার বিপরীতে সবমিলিয়ে মাত্র ৫৮ লাখ টাকার মত বরাদ্দ পেয়েছে সিলেট পাউবো!
গত এপ্রিলে সুনামগঞ্জের ১৫৪টি ছোট-বড় হাওরের ফসল অকাল বন্যায় তলিয়ে হাজার কোটি টাকার ফসলহানি হয়। সেই সময় বিপুল ক্ষয়ক্ষতির জন্য বাঁধ নির্মাণে পাউবো’র অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করেন জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগী মানুষ। গত ২ জুলাই ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৫ কর্মকর্তাসহ ৬১ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা করে।
এরপর ৪ জুলাই সিলেট সফরকালে সুনামগঞ্জের প্রসঙ্গ উপস্থাপন করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া সবাইকে সতর্ক করে বলেন, এরই মধ্যে একটা ওয়ার্নিং হয়ে গেছে। দুর্নীতি ও দায়িত্ব অবহেলা জন্য ৬১ জন গেছেন। আমরা সবাই ভাল হয়ে যাই। দুনীতি করে ৬১ যেনো ৬২ না হয়।
তিনি সিলেট ও মৌলভীবাজারে চলতি বন্যার জন্য সংশ্লিষ্টদের দায়ী করে বলেন, আপনারা সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করলে আজ এ অবস্থা হত না। কয়েকদিন আগে খোয়াই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছিল হবিগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ।
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের জন্য সিলেট জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে আটটিতে বন্যা দেখা দিয়েছে; যার মধ্যে অনেক এলাকায় ১০-১৫ দিন ধরে প্লাবিত। মৌলভীবাজারের চার উপজেলায় স্থায়ী বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় চরম দুর্ভোগে আছে মানুষ। ইতিমধ্যে কুশিয়ারা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অনেক জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছে; সুরমা নদীর অনেক জায়গায় বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে।
গত জুন মাসে ওসমানীনগরের সাদিপুরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ভাঙনের ফলে উপজেলার অন্তত ২৫ গ্রামের ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হন। নিম্নমানের কাজ হওয়ায় প্রতিবছর এই বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয় বলে জানান পূর্ব তাজপুর গ্রামের মো. আলমগীর হোসেন।
তিনি সাদিপুর থেকে গালিমপুর পর্যন্ত সাত কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ পাকা করার দাবি করে বলেন, শুষ্ক মৌসুমে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার মানুষও এই ডাইক সড়ক হিসেবে ব্যবহার করেন।
ওসমানীনগরের সাদিপুরের এই বাঁধ দুই বছর আগে সংস্কার করা হয়েছিল বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়। সর্বশেষ গত রমজান মাসে এই বাঁধে সংস্কার কাজ করা হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত এই বাঁধ রক্ষা করা যায়নি বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা।
কুশিয়ারা নদীর বিয়ানীবাজারের দুবাগ এলাকায় সাতটি স্থানে বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে; যা ওই উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে। উপজেলার গজুকাটা এলাকায়ও চলতি বন্যায় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; যা গত বছর সংস্কার করা হয়েছিল। ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জে বন্যা স্থায়ী হওয়ার জন্য বাঁধ কাজে না আসার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কানাইঘাটে সুরমা ডাইক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জকিগঞ্জে বাঁধের চারটি জায়গা দুর্বল ছিল; এখন কাজ চলছে।
বিয়ানীবাজার ও ফেঞ্চুগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি বেশি খারাপ হওয়ার পেছনে কুশিয়ারা নদীর পানি অপসারণ না হওয়াকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে সিলেটে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, মাসখানেক আগের বন্যায় হাকালুকি হাওর তলিয়ে যায়। এখন নতুন করে অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নদী ভরাট হওয়ার পর পানি যাওয়ার জায়গা পাচ্ছে না; যেহেতু আগে থেকেই হাকালুকিসহ আশপাশের ছোট-বড় হাওর ভর্তি। এজন্য অনেক এলাকায় মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পানিবন্দি হয়ে আছে।
তিনি বলেন, সিলেটে বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে বিভাগের চার জেলায় সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। একদিকে পাহাড় ও অন্যদিকে বিশাল হাওর এলাকা থাকায় যৌথ পরিকল্পনা নেওয়ার জোর দিয়ে তিনি বলেন, পাহাড়ি ঢলের সমস্যা যেমন আছে, তেমনি হাওর উপচে পড়ার সমস্যাও রয়েছে।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ রক্ষা বাঁধ মেরামত ও নতুন বাঁধ নির্মাণে অপ্রতুল বরাদ্দ প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, বন্যার্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসল রক্ষায় সাধ্যমত চেষ্টা করা হচ্ছে।