Sylhet Today 24 PRINT

অনন্ত হত্যা : মূর্ছা যাচ্ছেন মা, কান্না থামছে না পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবার

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ১৯ মে, ২০১৫

মুক্তমনা ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশের বাবা দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। ইতিমধ্যে তিনবার স্ট্রোক হয়ে গেছে তাঁর। হুইলচেয়ারে বসে কিংবা বিছানায় শুয়েই সময় কাটে। বাক ও বোধশক্তি নেই। কথা বলতে পারেন না, অনুভূতিও প্রকাশ করতে পারেন না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। কথা বলতে পারে না বলে তার কান্না 'ঘোঁ ঘোঁ' শব্দের মতো শোনায়। ১২ মে'র পর থেকে যে কোন সময়ই অনন্ত বিজয়ের বাসায় গেলে শোনা যাবে এই কষ্টমিশ্রিত ঘোঁ ঘোঁ শব্দ।

অনন্তর মা পীযূষ রানী দাশও উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। অনন্তই মা-বাবার দেখভাল করতেন। ১২ মে অনন্ত বিজয়ের হত্যাকাণ্ডের দিন থেকে তাঁর চোখের জল আর বিলাপ একবারের জন্যও বন্ধ হয় নি। প্রিয় ছেলেকে হারিয়ে পীযুষ রানীর বিলাপ শুনে কান্না আটকাতে পারেন না বাসায় সমবেদনা জানাতে আসা স্বজন প্রতিবেশীরাও।

দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে অনন্ত ছিলেন সবার ছোট। বড় ভাই রত্নেশ্বর দাশ একটি ব্যাংকে চাকরি করেন, কর্মস্থল সিলেটের বিয়ানীবাজার। চাকরির সুবাদে উপজেলা সদরেই থাকেন তিনি। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাড়ি আসেন। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, বনকলাপাড়ায় অনন্তদের বাসা থেকে একটু দূরেই তাঁদের বাসা। ছোট বোনের এখনো বিয়ে হয়নি। ভাই-বোনেরা প্রায় অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছেন। বাসায় দৈনন্দিন কাজ করার শক্তিটুকুও যেনো হারিয়ে বসেছেন তারা।

বাবার সেবা-শুশ্রূষা, ওষুধ-পথ্য খাওয়ানো, মাকে ইনসুলিন দেওয়াসহ সব দায়িত্ব ছিল অনন্তর। সকালে মা-বাবাকে ওষুধ খাইয়ে তারপর রওনা হতেন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার জাউয়া বাজারের পথে। সেখানে পূবালী ব্যাংকে সহকারী উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে কাজ করতেন তিনি। তাঁর নিয়োগ ছিল চুক্তিভিত্তিক। বাসা থেকে হেঁটে আসতেন সুবিদবাজার। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে যেতেন কর্মস্থলে।

সেই অনন্ত আজ আট দিন হলো নেই। ১২ মে অফিসে যাওয়ার জন্য বের হয়ে মূল সড়কে আসার মুহুর্তে চার দুর্বৃত্ত তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে। ঘটনার পর থেকে প্রায় পাগল হয়ে গেছেন মা, ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে শুধুই কাঁদছেন। বাক-বোধশক্তিহীন বাবাও অনন্তের অনুপস্থিতি টের পাচ্ছেন। মুখে কিংবা ইশারায় কিছু বলতে না পারলেও চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।

বড় ভাই রত্নেশ্বর দাশ বলেন, 'ঘটনার সময় আমি বিয়ানীবাজারে ছিলাম। আমাকে ফোন করে বলা হয় অনন্ত অ্যাকসিডেন্ট করেছে, আমি যেন তাড়াতাড়ি বাসায় আসি। তখনো আমি জানতাম না অনন্তর আসলে কী হয়েছে। অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ওই কাপড়েই শহরে চলে আসি। শহরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বলা হয় সরাসরি যেন হাসপাতালে চলে যাই। প্রথমে ওসমানী হাসপাতালে যাই। আমার ধারণা ছিল সে (অনন্ত) অ্যাকসিডেন্ট করেছে, হাসপাতালে ভর্তি আছে। কিন্তু হাসপাতাল গিয়ে দেখি স্বজনরা লাশঘরের সামনে। ওখানে যাওয়ার পর জানতে পারি ও খুন হয়েছে। এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না আমার ভাই নেই।'

রত্নেশ্বর বলেন, 'মা অসুস্থ। হঠাৎ খবরটি জানলে তিনি আক্রান্ত হবেন তাই তাঁকে জানানো হয়নি। বিকেল ৩টার দিকে আমরা যখন লাশ নিয়ে বাসায় যাচ্ছিলাম তখন মাকে বিষয়টি জানানো হয়। এর পর থেকে মায়ের ঘুম নেই, নাওয়া-খাওয়া নেই। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। ওষুধও খাচ্ছেন না ঠিকমতো, শুধু কাঁদছেন। বাবা লাশ দেখেছেন। তখন ভাবলেশহীন ছিলেন। এখন মনে হচ্ছে তিনি বিষয়টি টের পাচ্ছেন। ঘটনার রাতে দেখলাম তাঁর চোখে অশ্রু। সকালেও কাঁদতে দেখেছি। এখন প্রায়ই তাঁকে অশ্রুসিক্ত দেখি।'

কেন এই হত্যাকাণ্ড- জানতে চায় পরিবার : কেন অনন্তকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো- এ প্রশ্ন তাঁর পরিবারের। রত্নেশ্বর বলেন, 'কেন ওকে খুন করা হলো, সে প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। ও যে ব্লগে লেখালেখি করত তা পরিবারের কেউ জানত না। হুমকির বিষয়টি সে কখনো আমাদের জানায়নি। এমনকি তার বই বেরুচ্ছে, এ বিষয়টা পর্যন্ত আমরা জানতাম না। বই বেরুনোর পর বই দেখে আমরা জানতে পেরেছি। খুন হওয়ার পর এখন শুনতে পাচ্ছি তার ওপর হুমকি ছিল, সে হিটলিস্টে ছিল। সে ব্লগে লিখত। হুমকির বিষয়টি যদি আমরা আঁচ করতে পারতাম তাহলে তাকে সতর্ক করতাম কিংবা একটা ব্যবস্থায় যেতাম।'

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.