Sylhet Today 24 PRINT

রাত কাটে আফাল আর সাপ আতঙ্কে

হাকালুকি হাওরপারে টিকে থাকার লড়াই বন্যাকবলিতদের

তপন কুমার দাস, বড়লেখা  |  ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ঢেউ ঘরের ভিটার মাটি ভাসিয়ে নিয়েছে। মাটিশূন্য ভিটের মধ্যে বাঁশের খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে আছে ঘর। কোনোটার বেড়া ভেঙে পড়েছে। কারো ঘরসহ ভিটে বিলীন হয়েছে হাওরে। টিকে থাকতে না পেরে বাড়িঘর ছেড়ে অনেকেই ছুটে গেছেন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি। আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি না থাকায় অনেকে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন মাচা বেঁধে। অনেক বাড়িঘর পড়ে আছে জনহীন। তলিয়ে গেছে রান্না ঘর, টিউবওয়েল ও শৌচাগার।

তৃতীয় দফা বন্যায় মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার হাকালুকি হাওরপারের সুজানগর ও তালিমপুর ইউনিয়নের গ্রামে গ্রামে এ অবস্থা। এই দুই ইউনিয়নে আফালে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা দেড় সহস্রাধিক। গত মার্চ মাস থেকে টানা বন্যা চলছে এ উপজেলায়। হাওরপারের মানুষের দিন যেমন-তেমন। রাত কাটে আফাল (ঢেউ) ও সাপ আতঙ্কে।

এমনিতেই হাওরপারের বাসিন্দাদের টানাপোড়নের সংসার। এরই মধ্যে টানা ৬ মাস ধরে বন্যা। প্রথম দফা বন্যায় তলিয়ে গেছে ধান, দেখা দেয় মাছের মড়ক। দ্বিতীয় দফা বন্যায় তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি। এরপর পানি কিছুটা কমতে শুরু করে। ঘর-বাড়িসহ বিভিন্ন দিক থেকে ক্ষতির পর ঘুরে দাঁড়ানের জন্য চেষ্টা করছিলেন হাওরপারের সংগ্রামী মানুষ। কিন্তু ফের মধ্য আগস্ট থেকে টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে আবারও হাকালুকি হাওরে পানি বৃদ্ধি পেয়ে তলিয়ে যায় বাড়িঘর। দীর্ঘস্থায়ী এ বন্যায় হাওরপারের মানুষ এখন দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।

এদিকে গত শনিবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাত থেকে এ উপজেলায় সকাল পর্যন্ত টানাবৃষ্টির ফলে হাওরে পানি বেড়েছে।

সুজানগর ইউনিয়নের আজিমগঞ্জ বাজার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে ভোলারকান্দি গ্রাম। নৌকা করে ভোলারকান্দি গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে পানিবন্দী বাড়িগুলো। গ্রামের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে দেখা যায়, অনেক বাড়িরই ভিটে বাঁশ ও কচুরিপানা দিয়ে আফাল (ঢেউ) থেকে রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক ঘরের ভিটার মাটি হাওরের ঢেউয়ে ভেসে গেছে। মাটি ভেসে যাওয়ায় ঘরের তলা ফাঁকা হয়ে আছে। বাঁশের খুঁটির উপর টিনের চালা ও বেড়া দাঁড়িয়ে আছে।

গত শনিবার (৯ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে সুজানগর ইউনিয়নের ভোলারকান্দি, দশঘরি, রাঙ্গিনগর, বাড্ডা, ঝগড়ি, পাটনা, চরকোনা, কটালপুর ও তালিমপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর, হাল্লা, আহমদপুর, কুটাউরা, মুর্শিবাদকুরা, নুনুয়া, পাবিজুরী, শ্রীরামপুর, বাড্ডা, পশ্চিম গগড়া, কুঁচাই গ্রাম ঘুরে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের লোকজন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে এমন চিত্র ও তথ্য পাওয়া গেছে।

নৌকায় যেতে যেতে কথা হয় ভোলারকান্দি গ্রামের মাতুল বিবি (৪৫) এর সাথে। নাতিকে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। তিনি জানালেন ঘর নিয়ে কষ্টের কথা। তিনি জানান, ঘর অর্ধেক আওরে (হাওরে)। অর্ধেক আছে। আগেই-স্কুলে আছলাম (ছিলাম)। পানি কমায় বাড়িত আইলাম (এসেছিলাম)। আবার পানি বাড়ি গেছে। আফালের (ঢেউয়ের) ডরে (ভয়ে) রাতে ভয়ে ঘুম লাগে না। ভাঙা ঘর সাপেরও ডর আছে।

গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের আব্দুল মতলিবের বাড়ির পাঁচটি ঘরের প্রায় সবকটি ঘরেরই ভিটের মাটি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ঢেউ। বাড়ির তিনটি ঘরে পানি উঠায় এরা যে ঘরগুলোতে পানি উঠেনি। সেগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। পেশায় মৎসজীবী এই পরিবারগুলোর কোনো রকমে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল বেড়া আর টিনের দুই কক্ষের ঘরটি। কিন্তু ঢেউয়ে মাটি ভেসে যাওয়ায় ঘরের তলা ফাঁকা হয়ে আছে। বাঁশের খুঁটির উপর টিনের চালা ও বেড়া দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহূর্তে ভেঙে যাওয়া ঘর মেরামত করার সামর্থ্য নেই তার।

আব্দুল মতলিব বলেন ‘তিনবারকুর (তিনবারের) বন্যায় আমরারে একবারে শেষ করিদিছে। আমার কষ্টের বানাইল ঘরটিও বন্যায় ভাঙ্গি দিছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আফাল (ঢেউ) উঠে। রাইত অইলে ঘুম নাই। ঘরে ঠিকা দায় (ঘরে থাকা কষ্ট)।’

মুতলিব আলীর মতো একই অবস্থা প্রতিবেশি করিম উদ্দিন, নুরুল ইসলাম ও তৈমুন বিবির। বন্যা তাদের ঘর একেবারেই ভেঙ্গে দিয়েছে। এই তিন বাড়িতে লোকজন নেই। তারা এখন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

ভোলারকান্দি গ্রামের আলমাছ আলী বলেন, ‘আফালে (ঢেউয়ে) আমার ঘরখান একেবারে ভাঙ্গিলাইছে। মেয়ে ও জমাই আইছন। ঘরে থাকার জায়গা নাই। তারারে ঘরে জায়গা দিয়া গত রাতে (শুক্রবার দিবাগত রাতে) পরিবার নিয়া নৌকায় ঘুমাইছি। খুব কষ্টে আছি।’

সুজানগর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে দশঘরী ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে ভোলারকান্দি। ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শহীদ মিয়া ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মাসুক আলী বলেন, ‘এলাকার বেশিরভাগ মানুষই মৎস্যজীবী। এরা মাছ ধরে জীবিকা চালায়। পানি বেশি হওয়ায় মাছ নেই। বন্যায় অনেকেরই ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত। এগুলো ঠিক করাতে সরকারি সাহায্য তাড়াতাড়ি দরকার।’

সুজানগর ইউপি চেয়ারম্যান নছিব আলী বলেন, ‘আমার ইউনিনে প্রায় সাড়ে পাঁচশত ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এসব ঘর নতুন করে নির্মাণ করা ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে সম্ভব নয়। ঝুঁকি নিয়ে মানুষ ঘরে বসবাস করছে। দ্রুত সরকারি সাহায্য প্রয়োজন।’

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের গৃহ নির্মাণে সাহায্যের জন্য ১ হাজার বান্ডেল টিন বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি ৩৫০ বান্ডেল পাওয়া গেছে। যতই দিন যাচ্ছে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। আবারও বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় প্রাপ্ত এ টিনগুলো প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করে দেওয়া হবে।’

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.