Sylhet Today 24 PRINT

‘হায় হোসেন হায় হোসেন’ মাতমে প্রকম্পিত কুলাউড়ার নওয়াব বাড়ী

কুলাউড়া প্রতিনিধি |  ০১ অক্টোবর, ২০১৭

কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নে নওয়াব বাড়ির ইমামবাড়া প্রাঙ্গণ ছিলো আজ লোকে লোকারণ্য। চারিদিকে একই তালে জিঞ্জির, ছুরি ও খঞ্জরের আঘাতে আঘাতে মাতম ছিলো ‘হায় হোসেন হায় হোসেন’। আহাজারি আর ক্রন্দনে ইমামবাড়ার আকাশ-বাতাস হয় প্রকম্পিত। ছুরি-খঞ্জরের আঘাতে নিজ শরীরকে রক্তাক্ত করেছেন শিয়া অনুসারীরা।

রোববার (১ অক্টোবর) নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় উপজেলার পৃথিমপাশায় তাজিয়া মিছিলের মাধ্যমে শেষ হলো ১০ দিনব্যাপী চলা ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি।

সিলেট বিভাগের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিয়া সম্প্রদায়ের পরিবারের বসবাস এই পৃথিমপাশায়। যার ফলে প্রায় ৩০০ বছরের অধিক সময় ধরে এখানে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করে আসছে পৃথিমপাশার শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারীরা। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কয়েক হাজার শিয়া মুসল্লিদের অংশগ্রহণে হয়েছে তাজিয়া মিছিল।

পৃথিমপাশা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী নওয়াব বাড়ি, তরফি সাহেব বাড়ি, মনরাজ বাড়ি, ছোট সাহেব বাড়ি, বাঘ বাড়ি, মরহুম শাহাদাত হোসেনের বাড়ি, গোলাম হোসেনের বাড়ি, পাল্লাকান্দি সাহেব বাড়িতে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে শোক অনুষ্ঠানসূচী যেমন মার্সিয়া, মাতম, আহাজারি, ক্রন্দন, নোওয়া, জারি, মিলাদ, তবরুক, জলসা পালিত হয়েছে।

নওয়াব পরিবারের বংশধর সাবেক সংসদ সদস্য নওয়াব আলী আব্বাস খানের নেতৃত্বে মহররমের শোক অনুষ্ঠান মজলিস, মাতম, নোওয়া, জারি এবং বিকাল ৩টার দিকে তাজিয়া শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মিছিলটি পৃথিমপাশা ইউনিয়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে নওয়াব বাড়িতে গিয়ে শেষ হয়। শিয়া মুসলিম ভক্ত অনুসারীরা এ সময় ‘হায় হোসেন হায় হোসেন’ ধনির মধ্যে দিয়ে নিজ শরীরে জিঞ্জির ও ছুরি দিয়ে আঘাত করে হযরত ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগকে স্মরণ করেন। শোক পালনের এমন দৃশ্য দেখতে দেশ বিদেশ থেকে আগত কৌতূহলী লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে নওয়াব বাড়ির ইমামবাড়া প্রাঙ্গণ।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৬১ হিজরিতে মহররম মাসের ১০ তারিখ ফোরাত নদীর তীরে পবিত্র কারবালা প্রান্তরে বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা:) এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা:) ও তাঁর সঙ্গীরা ইসলামের জন্য শাহাদাত বরণ করেন। কারবালায় ঘটে যাওয়া ঘটনাকে লালন করে মুসলিমরা প্রতি বছর মহররম মাসে ইবাদত (দোয়া, দরুদ, শিরনী, সালাত, নফল রোজা, তাসবীহ পালন) বন্দেগী করেন। আর শিয়া সম্প্রদায়ের মুসল্লিরা হৃদয়বিদারক বেদনাবিধুর সেই শোকস্মৃতি স্মরণে তাদের রীতি অনুসারে মহিমান্বিত দিনটি তাৎপর্য, গুরুত্ব ও শিক্ষায় উদ্ভাসিত হয়ে শ্রদ্ধায়, সম্মানে, আবেগে, ক্রন্দনে আর মার্সিয়ায় পালন করেন। যুগ যুগ ধরে এখানে পালিত হচ্ছে এই ধর্মীয় রীতি। লক্ষ্য, উপলক্ষ, স্মরণ, শ্রদ্ধা, শিক্ষা, শোকস্মৃতি যা-ই বলেন না কেন, ইতিহাসলব্ধ জ্ঞান থেকে মুসলিম উম্মাহর জন্য এটা একটা অনুসরনীয় দৃষ্টান্ত।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতি বছর মহররম মাস এলে নওয়াব বাড়ির ইমামবাড়ার প্রাঙ্গণসহ পুরো পৃথিমপাশা ইউনিয়ন লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। এই ১০ দিনের জন্য নওয়াব বাড়ির সামনে দোকান-পাঠের মেলা বসে। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে দেশের নানা প্রান্ত থেকে অনেকেই এখানে আসেন চাকু ও ছুরি দিয়ে শিয়া ভক্তদের শরীরের রক্ত ঝরিয়ে ত্যাগের মহিমায় 'হায় হোসেন হায় হোসেন' মাতমের মাধ্যমে কারবালার সেই শোকস্মৃতি দেখতে।

তাজিয়া মিছিলের মধ্য দিয়ে শেষ হলো এখানকার শিয়া সম্প্রদায়ের আচার অনুষ্ঠান। তবে রীতি অনুযায়ী ৪০ দিন পর্যন্ত চলে এই শোকস্মৃতি স্মরণে বিভিন্ন ইবাদত বন্দেগি।

পৃথিমপাশা ইমাম বাড়ার মোতাওয়াল্লি ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নওয়াব আলী আব্বাছ খান জানান, তাদের এ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সকল ধর্মের লোকজন একত্রিত হন যাতে করে এক অসাম্প্রদায়িক মুহূর্তের অবতারণা হয়। কোন রকম অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া তাজিয়া মিছিল ও ছুরি মাতমসহ পবিত্র আশুরার সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনসাধারণসহ সকলকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম মুসা জানান, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শতাধিক সদস্য মাঠে ছিলেন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.