Sylhet Today 24 PRINT

একবছরেও পুরো সুস্থ হতে পারেননি খাদিজা, প্রয়োজন আরেকটি অস্ত্রোপচার

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ০৩ অক্টোবর, ২০১৭

সেই বর্বরোচিত ঘটনার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। গত বছরের এই দিনে সিলেটে হামলার শিকার হয়েছিলেন কলেজ ছাত্রী খাদিজা বেগম। একবছর পেরোলেও এখন পূর্ণ সুস্থ হতে পারেননি তিনি।

সোমবার দুপুরে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ থানার হাউসা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় খাদিজা ও তাঁর পরিবারের সাথে। এখনো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন খাদিজা। বাঁ হাতের আঙ্গুলগুলো সোজা করতে পারেন না। এই হাত দিয়ে কোনো কাজও করতে পারেন না। মাথায় ব্যথা লেগে থাকে সর্বক্ষণ। প্রায়ই স্মৃতিবিভ্রাট ঘটে। পুরনো কথা মনে করতে পারেন না। তবু তাঁর দু’চোখ ভরা স্বপ্ন। আবার কলেজে ভর্তি হতে চান। ব্যাংকার হতে চান। নারীদের কাজ করতে চান।

গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর সিলেট এমসি কলেজে ক্যম্পাসে কুপিয়ে আহত করা হয় সিলেট সরকারী মহিলা কলেজের স্নাতক শ্রেণীর ছাত্রী খাদিজাকে। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন তিনি। তাকে কুপানোর ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় তুলে। আদালতের রায়ে শাস্তিও হয় হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমের। তবে খাদিজা এখনো ফিরে পান নি স্বাভাবিক জীবন।
 
নিজের শারিরীক অবস্থা সম্পর্কে সোমবার সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে খাদিজা বলেন, মাথায় সবসময় ব্যথা করে। একএক সময় প্রচন্ড ব্যথা হয়। বাঁ পা ও হাতে শক্তি পাই না। ফলে স্বাভাবিক হাঁটা চলাও করতে পারি না। তবে আগে থেকে এখন অনেক সুস্থ হয়েছি। আশা করছি ধীরে ধীরে পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবো।

খাদিজার উপর হামলার ঘটনায় মামলা করেছিলেন খাদিজা বেগমের চাচা আব্দুল কুদ্দুস। সোমবার তিনি বলেন, স্কয়ার হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন খাদিজা বাঁ হাতে একটা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। এজন্য ৫ লাখ টাকার মতো লাগবে। টাকা জোগাড় করতে না পারায় এখনো অস্ত্রোপচার করাতে পারছি না। নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে করানো হবে।

খাদিজার চিকিৎসায় সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ও যে আমাদের মাঝে ফিরে তা-ই তো ভাবিনি। তাকে যে ফিরে পেয়েছি এতেই আমরা সন্তুষ্ট। তবে এখনও তার মস্তিষ্ক পুরোপুরি কাজ করে না। অনেক কিছু ভুলে যায়। তালগোল পাকিয়ে ফেলে। আজকের কথা কালকে মনে রাখতে পারে না। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, পুরো সুস্থ হতে বছর তিনেক লাগবে।

হামলাকারী বদরুলের যাবজ্জীবন কারাদন্ডেরর রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে আব্দুল কুদুস বলেন, আশা করছী উচ্চ আদালতেও বদরুলের দণ্ড বহাল থাকবে

তবে কুদ্দুসের অভিযোগ, বদরুলের ভাই এখনো আমাদের পরিবারের সদস্যদের হুমকি প্রদান করছে। বদরুলও জেলের ভেতরে খাদিজার নামে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে শুনেছি।

পক্ষাঘাতগ্রস্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি)-এর সিলেট কার্যালয়ে নিয়মিত থেরাপি নিচ্ছেন খাদিজা।

এই সেন্টারের ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. কামরুল হাসান সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, খাদিজার শারিরীক উন্নতিতে আমরা খুবই আশাবাদি। দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠছে সে। আশা করছি আরো মাস ছয়েকের মধ্যে সে পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে। আর হাতের আঙ্গুলগুলোর জন্য তাকে আরেকটা অস্ত্রোপচার করাতে হবে।

গত বছরের ৩ অক্টোবর সিলেটের এমসি কলেজ কেন্দ্রে স্নাতক পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন খাদিজা বেগম নার্গিস। তিনি সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক (পাস) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। পরীক্ষা শেষে বেরোনোর সময় কলেজ ক্যাম্পাসেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হন খাদিজা। হামলায় তার মাথার খুলি ভেদে করে মস্তিষ্কও জখম হয়।

খাদিজাকে কোপানোর একটি ভিডিওক্লিপ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। হামলার বিচার দাবিতে আন্দোলনে নামে বিভিন্ন সংগঠন।

হামলার পর খাদিজাকে উদ্ধার করে প্রথমে সিলেট ওসমানী মেযিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ওই রাতেই নিয়ে যায় হয় ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে। সেখানে গত বছরের ৪ অক্টোবর বিকালে অস্ত্রোপচার করে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাকে। পরে ১৩ অক্টোবর তার লাইফ সাপোর্ট খোলার পর ‘মাসল চেইন’ কেটে যাওয়া তার ডান হাতে অস্ত্রোপচার করা হয়। তিন দফা অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন খাদিজা। তবে শরীরের বাঁ পাশ স্বাভাবিক সাড়া না দেওয়ায় তাকে সাভারের সিআরপিতেও তিন মাস চিকিৎসা নিতে হয়। সিআরপিতে তিন মাসের চিকিৎসা শেষে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বাড়ি ফেরেন এই কলেজছাত্রী।

গত ৮ মার্চ খাদিজা বেগম হত্যাচেষ্টা মামলায় ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালত। ওই আদালতের বিচারক আকবর হোসেন মৃধা এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের পাশপাশি ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো দুই মাসের কারাদন্ড প্রদান করা হয়।

দ্রুততম সময়ে প্রদান করা ওই রায়ের পর্যবেক্ষনে আদালত বলেছিলেন, এখনো নারীরা অনেকটা অরক্ষিত। খাদিজার ঘটনা তাই প্রমাণ করে। নারীরা পদেপদে নিগৃহিত, নির্যাতিত, হত্যা ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এজন্য আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও মানসিকতা দায়ী।

আদালত বলেন, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত পাষন্ড প্রেমিকের চাপাতির নৃশংস আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত খাদিজা দীর্ঘদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে মৃত্যুর কাছে হেরে না যাওয়া সমগ্র বিশ্ব নারী সমাজের প্রতিভূ, বিজয়িনী, প্রতিবাদকারিনী।

আদালত বলেন, আমার বিশ্বাস আসামীর উপর সর্বোচ্চ শাস্তি আরোপের মাধ্যমে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হাজার হাজার বদরুলরা (উত্যক্তকারীরা) ভবিষ্যতে এমন কান্ড থেকে বিরত থাকবে এবং নারী সমাজ সুরক্ষিত হবে।

রায়ে আরও বলা হয়, মানব-মানবীর মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা চিরন্তন। প্রেম-ভালোবাসায় মিলন, বিরহ থাকবেই। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হলে এমন পৈশাচিক, নৃশংস আচরণ মোটেই কাম্য ও আইন সমর্থিত নয়।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.