Sylhet Today 24 PRINT

জীবনই চলে না, তবু রিকশা চালাতে হয়

শাহ শরীফ উদ্দিন |  ০৬ অক্টোবর, ২০১৭

আমার খবর কেউ রাখে না। বয়স বেশি তাই মানুষজন রিকশায়ও উঠতে চায় না। কুলির কাম কইরা, রিকশা চালাইয়া ছেলে বড় করছি হেই ছেলেও এখন বিয়া কইরা আলগ হইগেছে।” কথাগুলো বলেন  মো.রেজাউন নবী।

সত্তরোর্ধ্ব রেজাউন নবী এখনো রিকশা চালিয়ে নিজের আহার যোগান। প্রখর রোদের তীব্রতায় যখন মানুষ নাকাল তখন সত্তর ঊর্ধ্ব রেজাউন নবী দু পায়ে রিকশা চালিয়ে শহরের অলিগলি ছুটে চলছেন জীবিকার সন্ধানে।

বুধবার দুপুরে নগরীর রিকাবিবাজারে কথা হয় তাঁর সাথে। প্রখর রোদে ক্লান্ত রেজাউন নবীর সাথে কথা বলে জানা যায়, গাইবান্ধা জেলার বাংলাবাজার উপজেলার খোলাহাটি গ্রামের মৃত- ফজির উদ্দিন সরকার এর ছেলে মো. রেজাউন নবী। পাঁচ ভাইয়ে ও এক বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। সংসারের অভাব অনটনের কারণে পড়ালেখা ছেড়ে ছোটবেলা থেকেই সংসারের হাল ধরেছেন। সকল ভাইরা পড়ালেখা করে ভাল অবস্থানে থাকলেও তিনি এই বয়সেও রিকশা চালিয়ে আহার যোগাচ্ছেন। বড়ভাই ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত অবস্থায় পঞ্চগড়ে ট্রাক চাপায় মারা যান, এক ভাই সরকারী চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় নিজে ফ্লাট কিনে বসবাস করছেন, ৪র্থ ভাই ট্রাক চালক, ছোট ভাইও ঢাকায় সরকারী চাকরি করছেন। অথচ রেজাউন নবী এখনো রিকশা চালাচ্ছেন। সকল ভাইয়েরা যখন বিয়ে করে আলাদা হয়ে-গেলেন তখন প্রথমে নিজের এলাকায় ট্রাক্টর চালানো ও পরে মজুরের কাজ করেন। এসব করে যখন পুষাচ্ছিলো না তখন ভালো কোন কাজের সন্ধানে সিলেটে আসেন রেজাউন নবী।  প্রায় ৪৫ বছর আগে সিলেটে এসে রিকশা চালানো শুরু করেন। এখনো তিনি সিলেটেই রিকশা চালাচ্ছেন। ৪৫ বছরের দীর্ঘ রিকশা চালানোর সময়ে ২ মেয়ে রিনা বেগম ও রেবা খাতুনকে বিয়ে দিয়েছেন একই সাথে ছেলে আসাদুজ্জামান বাবুকে রাজমিস্ত্রি কাজ শিখিয়েছেন। পরে ছেলেকেও বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পরেই ছেলে স্ত্রীর কথায় বাবা মাকে ছেড়ে চলে যায়।

তবু রেজাউন নবী থেমে থাকেননি। এই বৃদ্ধ বয়সেও রিকশা চালিয়েই নিজের ও নিজের স্ত্রীর আহার যোগাচ্ছেন।

জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ৪৫ বছর আগে সিলেটে এসে প্রথমে নগরীর কাজল শাহ এলাকায় শাহ জাহান মিয়া নামের একজনের গ্যারেজের রিকশা চালানো শুরু করেন। প্রায় ৪৪ বছর তিনি একই গেরেজে রিকশা চালিয়েছেন। এর মধ্যে তিনি  সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১১ নং ওয়ার্ডের ভোটারও হয়েছেন। গত এক বছর থেকে বাগবাড়ি এলাকার বর্ণমালা মোড়ের হেকমত মিয়া নামের একজনের গ্যারেজের রিকশা চালাচ্ছেন।

রেজাউন নবী বলেন, "প্রথমে যখন শরীরে শক্তি ছিলো তখন অনেক টাকা কামাই করেছি। কিন্তু এহন আর তেমন পারি না। ছেলে মেয়ে বিয়া দেওয়ার পর আমার বৌও নিয়া আসছিলাম সিলেটে। কিন্তু এহন যে টাকা কামাই তা দিয়া বাসা ভাড়া, খাওন সব পুষায় না। তাই বৌ বাইততে পাঠাই দিছি। এহন বয়স হইছে। রিকশা বেশি চালাইতে পারি না। তাছাড়া বয়স বেশি দেইখা মানুষজনও আমার রিকশায় উঠতে চায় না। এহন সারা দিনে ৩৫০-৪০০ টাকা কামাই। এত থাইকা থাকা খাওন আর রিকশার ভাড়া সহ প্রতিদিন মহাজন দেই ১৬০ টাকা। আর নিজের আরো খর্চা হয় ধরেন ৫০ টাকার মতো। আর বাকি যা থাকে তা জমাইয়া মাসে আরো ১৫০ টাকা দেই থাকার ভাড়া। আর বাদ বাকি টাকা বাড়িতে বৌয়ের খাওনের লাগি পাঠাই।"

বয়স্ক ভাতা পান কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে রেজাউন নবী বলেন, "'না পাই না'। বাবলু মিয়া( ১১ নং ওয়ার্ড এর সাবেক কাউন্সিলর আব্দুর রকিব বাবলু) বলছিলো এইবার টিকলে একটা ব্যবস্থা করবো। পরে আর টিকলো না। আর ঝলক মিয়ারে ( ১১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর রকিবুল ইসলাম ঝলক) ভোট দেইনি। তাই হের কাছে যাইওনি।"

সিলেট সিটি কর্পোরেশন এর ১১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলার রকিবুল ইসলাম ঝলক বলেন, পিতা-মাতার ভরণপোষণ করা যেমন সন্তানের দায়িত্ব তেমনই প্রবীণ মানুষের প্রতি সম্মান দেখানো এবং তাঁদের যত্ন নেওয়াও আমাদের দায়িত্ব। আমার ওয়ার্ডে প্রায় ৩ শত জন অসচ্ছল প্রবীণ বয়স্ক ভাতা পান। যেহেতু উনি নিজেই বলছেন কোন সময় ভাতার জন্য আমার সাথে যোগাযোগ করেননি তাই উনার বিষয়টা নজরেও আসেনি। তবে উনি যদি আমার সাথে যোগাযোগ করেন তাহলে যতদিন পর্যন্ত সরকারী ভাবে ভাতার ব্যবস্থা না হয় ততদিন আমি ব্যক্তিগত ভাবে উনাকে সহযোগিতা করবো।

এব্যাপারে সিলেট জেলা সমাজ সেবা কার্যালয় এর উপ-পরিচালক নিবাস রঞ্জন দাস বলেন, চলতি বছরে সারা বাংলাদেশে ৩৫ লক্ষ লোক বয়স্ক ভাতা পাবেন যার আর্থিক পরিমাণ ২১ শ কোটি টাকা। যা বিশ্বের প্রায় ৯৭টি দেশের মোট জনসংখ্যার অধিক। যেসকল অসচ্ছল পুরুষের বয়স ৬৫ বছর এবং মহিলার ক্ষেত্রে যাদের বয়স ৬২ বছর তারাই এই ভাতা ভোগ করবেন। সিলেটে এইবার মাথাপিছু ৬০০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা পাবেন মোট ৭৪ হাজার ৭ শত ৩১ জন অসচ্ছল প্রবীণ।

তাছাড়া সিলেটে বাগবাড়িস্থ শিশু নিবাসে (বালক) অসচ্ছল ১০ জন বয়স্ক পুরুষ এবং রায়নগরস্থ  শিশু নিবাসে (বালিকা) ১০জন অসচ্ছল বয়স্ক মহিলা থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাদের সকল রকম ভরণপোষনের দায়িত্ব সরকারি ভাবে গ্রহণ করা হবে।

তবে রেজাউন নবীর ক্ষেত্রে উনি বলেন, উনি যেহেতু অন্য জেলার সেহেতু এখান থেকে ভাতা প্রদানে কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। কারণ এক সময় উনি চলে-গেলে উনার এই ভাতা পড়ে থাকবে। তবে স্থানীয় কাউন্সিলর যদি চান তাহলে উনাকে ভাতা প্রদান করতে কোন সমস্যা নেই। তাছাড়া রেজাউন নবী চাইলে বাগবাড়িস্থ শিশু নিবাসে থাকতে পারবে। একই সাথে দিনের বেলা রিকশা চালিয়ে উনার স্ত্রীর ভরণপোষনের টাকা পাঠাতে পারবেন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.