Sylhet Today 24 PRINT

সাতছড়িতে অস্ত্র উদ্ধারের ১ বছর : ৬ মামলার কোন অগ্রগতি নেই

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি  |  ০১ জুন, ২০১৫

আজ (১ জুন) সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে র‌্যাবের অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের ১ বছর পূর্ণ হচ্ছে। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার এ উদ্যানটি দেশের অন্যতম বৃহত্তম সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেই পরিচিত। চারিদিকে বিশাল বৃক্ষরাজি, পশু-পাখির কলকাকলি আর টিপরা পল্লীসমৃদ্ধ ভারতীয় সীমান্তবর্তী এ বনাঞ্চলে ১ বছর আগে শত শত কালো পোষাকধারী র‌্যাবের পদচারণায় মূখরিত হয়ে উঠেছিল।

২০১৪ সালের ১ জুন কঠোর গোপনীয়তায় র‌্যাব সদস্যরা সাতছড়ির গভীর বনে শুরু করে অভিযান। আর ৩ জুন ১ম দফায় র‌্যাব কয়েকটি ব্যাংকার থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে।

পরে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৪ দফায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। এসব অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ৬টি মামলা দায়ের করা হলেও ১ বছরে কোন মামলারই অগ্রগতি নেই।

সাতছড়ির সেই অভিযান : ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী সাতছড়ির গভীর অরণ্যে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ১ জুন রাত থেকে র‌্যাব অভিযান চালায়। র‌্যাব ওই এলাকায় সেই অভিযানে ২টি পাহাড়ের একটিতে ২টি এবং অপরটিতে ৩টি বাংকারের সন্ধান পায়। এর মধ্যে ৩ জুন দুপুর পর্যন্ত একটি বাংকার থেকে শতাধিক মর্টার সেল, রকেট লাঞ্চার, রকেট লাঞ্চার এর চার্জার, অয়েলসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করে।

প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে র‌্যাব হেডকোয়ার্টার ও র‌্যাব-৯ এর আড়াই শতাধিক জোয়ান এ অভিযান পরিচালনা করে। বাংকারে ৩০ থেকে ৩৫ ফুট গভীর গর্ত করে এসব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। বাংকারগুলোর উপর আরসিসি ঢালাই করা ছিল। মই এর মাধ্যমে অক্সিজেন মাক্স পরে র‌্যাব এর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ সদস্যরা নিচে নেমে এসব অস্ত্র তুলে আনেন। যে পাহাড়ে বাংকার ছিল, সেগুলোতে উঠার কোন রাস্তা ছিল না।

র‌্যাব সদস্যারা স্ক্রলিং করে সেখানে যান। আবার নামার সময় দড়ি ব্যবহার করেন। ৩ জুনের সফলতার পর র‌্যাব সেখানে অভিযান অব্যাহত রাখে। ৪ জুন পায় আরও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ। পরে পাওয়া যায় আরও ব্যাংকার, ভারতের নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠনের বই ও কাগজপত্র এবং তাদের ক্যাম্প। ১ম দফা ১৯ দিন অভিযানের পর আরও ৪ দফা অভিযান পরিচালনা করে ৬ বারে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে র‌্যাব।

৪ দফা অভিযানে উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ : সাতছড়িতে ৪ দফায় ৬ বার অস্ত্র ও গোলাবারুদ পায় র‌্যাব। ১ জুন থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ দফায় ৩৩৪টি কামান বিধ্বংসী রকেট, ২৯৬টি রকেট চার্জার, ১টি রকেট লঞ্চার, ১৬টি মেশিনগান, ১টি বেটাগান, ৬টি এসএলআর, ১টি অটো রাইফেল, ৫টি মেশিন গানের অতিরিক্ত খালি ব্যারেল, প্রায় ১৬ হাজার রাউন্ড বুলেটসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করে র‌্যাব। ১৬ অক্টোবর থেকে ৪র্থ দফার ১ম পর্যায়ে ৩টি মেশিনগান, ৪টি ব্যারেল, ৮টি ম্যাগজিন, ২৫০ গুলির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ৮টি বেল্ট ও উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন একটি রেডিও উদ্ধার করা হয়।

সর্বশেষ ১৭ অক্টোবর দুপুরে এসএমজি ও এলএমজি’র ৮ হাজার ৩৬০ রাউন্ড, ত্রি নট ত্রি রাইফেলের ১৫২ রাউন্ড, পিস্তলের ৫১৭ রাউন্ড, মেশিনগানের ৪২৫ রাউন্ডসহ মোট ৯ হাজার ৪৫৪ রাউন্ড বুলেট উদ্ধার করা হয়। এছাড়া এসএমজি’র ২০টি, এলএমজি’র ৫টি, এসএলআর-এর ৬টি, ত্রি নট ত্রি’র ৪টি, এমএমজি ২টি, পিস্তলের ২৯টি ও জিথ্রি’র ১২টিসহ মোট ৮০টি ম্যাগজিন, ৫টি ওয়াকিটকি ও উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন একটি রেডিও সেট উদ্ধার করা হয়।

আলোচনায় কাহালু ও চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র : ২০০৩ সালের ২৭ জুন বগুড়ার কাহালু উপজেলায় আনারসের ট্রাকে ১৭৪ কেজি বিস্ফোরক এবং প্রায় ১ লাখ রাউন্ড গুলি ও অস্ত্র উদ্ধারের পর সাতছড়ি আলোচনায় আসে। তদন্তে উঠে আসে সাতছড়ি থেকেই এসব গোলাবারুদ ও অস্ত্র পাচার হয়ে গিয়েছিল। কাহালুতে গুলাবারুদ উদ্ধারের পর সাতছড়ি থেকে ভারতীয় নিষিদ্ধষোষিত এটিটিএফ ও এনএলএফটি জঙ্গী সংগঠনের ক্যাম্প গুটিয়ে নেয় তারা। চলে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে। ধারণা করা হয়, ওই সময় পুলিশের হাতে গোলাবারুদ ও অস্ত্র আটকের পর অবশিষ্ট এসব অস্ত্র থেকে গিয়েছিল।

পরবর্তীতে সুযোগ না থাকায় এসব অস্ত্র তারা সরিয়ে নিতে পারেনি। চট্টগ্রামে আটককৃত ১০ টাক অস্ত্রের সাথে এই অস্ত্রের সাদৃশ্য রয়েছে বলে র‌্যাব জানায়।

এটিটিএফ এর অর্থের ফাঁদে সাতছড়ির টিপরারা : ১৯৯০ সালের দিকে ত্রিপুরাকে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে পেতে এটিটিএফসহ বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের জন্ম। ভারত সরকারের ভয়ে তখন এই বিদ্রোহীরা লোকালয় ছেড়ে বনে আশ্রয় নিয়েছিল। তখন ভারতের সাথে বাংলাদেশের সীমান্তে কাটা তাঁরের বেড়া ছিল না। ফলে বিদ্রোহীরা সহজেই বন দিয়ে বাংলাদেশে চলে আসত।

চুনারুঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে তারা রীতিমত ঘরবাড়ি বানিয়ে বসবাস করত। দিনের বেলায় তারা প্রকাশ্যেই লোকালয়ে চলাফেরা করত। চুনারুঘাটের প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, বাজারে তারা আসত এবং বড় মাছটি কিনে নিত। তারা বেবি ট্যাক্সি নিয়ে চলাফরা করত। তখনকার সময়ে সেই পরিবহনটি ছিল ব্যয়বহুল। এখানকার সাধারণ লোকজনের সাথে তাদের তেমন সম্পর্ক স্থাপন না হলেও টিপরা সম্প্রদায়ের সাথে তাদের একটি ভাল সম্পর্ক হয়ে যায়। কারণ টিপরাদের আদীনিবাস ত্রিপুরায় এবং উভয়ই একই সম্প্রদায়ের লোক। কৌশলগত কারণেই সাতছড়িকে টার্গেট করে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। তখন সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ছিল না, ছিল গভীর বন। আবার সীমান্ত থেকে খুবই কাছে।

সাতছড়িতে ভিলেজার বা বন জায়গীরদার হিসাবে বসবাস করে টিপরারা। দিনে বাধ্যতামুলকভাবে বনে ৮ ঘন্টা কাজ আর রাতে বন পাহারা। বিনিময়ে বসবাস করার সুবিধা এবং কিছু জমিতে আবাদ করতে ক্ষমতা। যখন বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাদেরকে অর্থের লোভ দেখায়, তখন তারা সহজেই রাজি হয়ে যায়। অর্থের বিনিময়ে টিপরারা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিন। এমনকি সেখানকার আশিষ দেব বর্মা এবং সুব্রত দেব বর্মাসহ বেশ কয়েকজন তাদের সাথে অস্ত্র ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। টিপরা পল্লী ও আশেপাশের টিলায় বাংকার তৈরি করে ভারী অস্ত্র মজুদ করে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থে চেহারা পাল্টে যায় টিপরা পল্লীর।

যখন লোকালয়ে তেমন একটা দালান ঘর ছিল না, তখনই তাদের দালান উঠে। ঘরে সুন্দর ফার্নিচারসহ কোন কিছুর কমতি ছিল না তাদের।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম দিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সু-সম্পর্ক রাখলেও এক পর্যায়ে তারা টিপরাদেরকে জিম্মি করে ফেলে। তারা কোন খবর পাচার হলে মেরে ফেলা হবে বলে ভয় দেখালে নিরবেই সব কিছু মেনে নেয় তারা। কয়েকজন বিশ্বস্থ অনুসারী সৃষ্টি করে তারা।

এখনও টিপরা পল্লীতে গেলে দেখা যায়, ঘরে ঘরে সৌর বিদ্যুৎ, জেনারেটর, টিভি, মোটর সাইকেল, ল্যাপটপসহ কিছুরই কমতি নেই সেখানে।

সাতছড়িতে পর্যটক হ্রাস : সাতছড়িতে র‌্যাবের অভিযান চলাকালে পর্যটকদের মাঝে আতংক বিরাজ করে। অভিযান চলাকালে প্রায় দিনই ছিল পর্যটক শূন্য। নামমাত্র কিছু পর্যটক সেখানে যেতেন। সাতছড়ি উদ্যান ব্যবস্থাপনা কমিটির সুপারভাইজার তুহিন জানান, র‌্যাবের অভিযানের সময় পর্যটকরা ভয়ে আসত না। পরে যখন সব কিছু স্বাভাবিক হয়, তখন আবার রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য জানুয়ারী-মার্চ পর্যন্ত ভর মৌসুমে পর্যটক আসেনি। এখন আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে।

১ বছরেও ৬টি মামলার অগ্রগতি নেই : সাতছড়িতে ৪ দফা অভিযানে ৬ বার অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে র‌্যাব। প্রতিবারই অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের পর তারা মামলা দায়ের করে। চুনারুঘাট থানায় অজ্ঞাত আসামী করে এপর্যন্ত বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ৩টি ও অস্ত্র আইনে ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্র আদালতের আদেশের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

৪টি মামলার তদন্তের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন চুনারুঘাট থানার ওসি অমূল্য কুমার চৌধুরী ও দুটি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান চুনারুঘাট থানার ওসি তদন্ত ইকবাল আহমেদ। তদন্তের কাজে তারা একাধিকবার সাতছড়ির টিলায় যান এবং সেখানে গোয়েন্দা নিয়োগ করেন। পরবর্তিতে তারা মামলাগুলো সিআইডিতে হস্তান্তর করেন।

সিআইডির ওসি সাজিদুর রহমান ৬টি মামলার তদন্তের দায়িত্ব নেন। তিনি জানান, মামলাগুলোর কোন আসামী নেই। তদন্তের কাজ চলছে। যেহেতু কোন আসামীর নাম নেই তাই অপেক্ষায় রয়েছি উচ্চ পর্যায় থেকে কোন নির্দেশ আসে কিনা তার জন্য।
র‌্যাবের বড় সফলতা ঃ র‌্যাব-৯ শ্রীমঙ্গলের কোম্পানী কমান্ডার হিসাবে কয়েকদিন আগে যোগ দিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মনিরুজ্জামান।

অভিযান শুরু থেকে এর আগে সেখানে দায়িত্ব পালন করেন সানা শামিনুর রহমান ও স্কোয়াড্রন লিডার মোসাব্বির হোসেন।

কাজী মনিরুজ্জামান জানান, র‌্যাব একটি এলিট ফোর্স। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে র‌্যাব সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে। সাতছড়ির অভিযানে র‌্যাবের একটি বড় সফলতা। র‌্যাব ভবিষ্যতেও এধরনের অভিযান পরিচালনা করবে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.