দেবকল্যাণ ধর বাপন | ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৭
এখনো তফসিল ঘোষিত হয়নি। তবে আগামী বছরের প্রথমে দিকেই যে সিলেট কর্পোরেশন নির্বাচন হচ্ছে তা ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তবে নির্বাচন কমিশনের এমন ঘোষণার আগেই মাঠে নেমে পড়েছেন সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা। প্রধান দুই দলেই একাধিক নেতা দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। নাগরিকদের মন জয়ের চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন যাত্রা শুরু করে ২০০১ সালের ৩১ জুলাই। তবে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৩ সালে। আর সর্বশেষ সিসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের ১৫ জুন।
আগামী বছর মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে চতুর্থবারের মতো সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। এবারই প্রথম দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে সিসিকের নির্বাচন। এখনো তফশিল ঘোষণা না হলেও দীর্ঘ হচ্ছে প্রার্থীর তালিকা।
মনোনয়ন দৌড়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে সাবেক ও বর্তমান মেয়রকে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সামনে রেখে সিসিকের বর্তমান ও সাবেক দুই মেয়রই দলীয় হাইকমান্ড থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছেন এমন খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ দুই নেতার দাবির সাথে একমত নন প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীরা।
তাদের মতে, দুজনই হারিয়েছেন তাদের জনপ্রিয়তা, তাই আগামী সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় দলেই নতুন মুখ দেখা যাবে বলে তাদের আশা।
মাস তিনেক আগে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ বিষয়টি জানিয়েছিলেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। বিগত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিপুল ভোটে হেরে সিলেট নগরভবনের প্রায় ১৮ বছরের টানা কর্তৃত্ব হারান মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এই নেতা।
চলতি বছরের জুলাই মাসে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা শেষে কামরান ও রাজশাহীর সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠক শেষে নেত্রীর পক্ষ থেকে তাকে সিটি নির্বাচনের জন্য ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দেওয়া হয়েছে বলে জানান কামরান।
এ নিয়ে নগরীতে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। বিরূপ মন্তব্য আসে আওয়ামী লীগের অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছ থেকে। সর্বশেষ ২১ অক্টোবর সিলেটে সদস্য সংগ্রহ কর্মসূচিতে এসে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ বিষয়টি বাতিল করে বলেন, মনোনয়নের মাঠ উম্মুক্ত। সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতাকেই মেয়র পদে মনোনয়ন দিবে আওয়ামী লীগ।
এদিকে নভেম্বরে এসে সাবেক এ মেয়রের পথ অনুসরণ করেন বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীও। সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) আগামী নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী হিসেবে দলীয় ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়েছেন বলে দাবি করেন আরিফ। ১৪ নভেম্বর আরিফুল হক চৌধুরী বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানেই নেত্রী তাকে এমন নির্দেশনা দেন বলে দাবি করেন। তার এই দাবি মেনে নিতে পারেননি স্থানীয় বিএনপির নেতারাও। তাদের মতে, দলবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় আরিফুল হক বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।
গ্রিন সিগন্যাল ফ্যাক্টর বাদ দিলে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের মেয়র পদে এবার সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা বেশ লম্বা। আওয়ামী লীগ থেকে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ চাইছেন মনোনয়ন। সাথে আছেন অর্থমন্ত্রীর প্রিয়ভাজন হিসেবে পরিচিত ক্রিড়া সংগঠক, বাফুফের সদস্য মাহি উদ্দিন আহমদ সেলিম। এই ব্যাবসায়ি এবং ক্রীড়া সংগঠকও এবার আওয়ামী লীগ থেকে মেয়র পদে মনোনয়ন চান।
বিএনপির মনোনয়ন পাবার দৌড়ে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রিয় নির্বাহি কমিটির সদস্য ও বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, বিএনপির মহানগর কমিটির সভাপতি নাসিম হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম।
গত নির্বাচনে মেয়র পদে জামায়াতের কোনো প্রার্থী না থাকলেও আগামী নির্বাচনে প্রার্থী দেয়ার আভাস দিয়েছে দলটি। দলীয়ভাবে জামায়াত নির্বাচন করতে না পারলে তাদের হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমির অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যদের নিয়ে সম্প্রতি তিনি নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। তার সাথে ছিলেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ লালা।
জাতীয় পার্টি ও বামদলগুলো থেকে এখনো কোনো প্রার্থীর নাম প্রচারে নেই।
নির্বাচন বিষয়ে সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, এই প্রথম সিলেট সিটি কর্পোরেশনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন নিয়ে নগরবাসীর মনে উৎসাহ উদ্দীপনা রয়েছে। স্থানীয় এ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের পাশাপাশি ব্যক্তিও এখানে একটা ব্যাপার। নগরবাসী আমাকে ভালোবাসে, আগামী নির্বাচনে আমি অবশ্যই বিজয়ী হব। গত নির্বাচনে ফলাফল আমাদের পক্ষে আসেনি। এবার সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে অবশ্যই ফলাফল আওয়ামী লীগের পক্ষে আসবে।
গ্রিন সিগন্যাল বিষয়ে তিনি বলেন, আমি এটাকে সিগন্যাল বলছি না, তবে আমাকে কেন্দ্র থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। তাই আমি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে জনগণের কাছাকাছি থেকে কাজ করছি। এরপরও দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যদি বদল হয়, অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়া হয় সেখেত্রেও সে সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিয়ে দলের সাথে থেকে দলের পক্ষের কাজ করবো।
আর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশী আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান প্রার্থী হিসেবে জনসমর্থন হারিয়েছেন এটা তো গত নির্বাচনেই প্রমাণিত। তাই নগরভবনে আবারো আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনতে এবার নতুন মুখ প্রয়োজন বলেই আমি মনে করি। মানুষ নতুনত্ব চায় দাবি করে তিনি বলেন, মেয়র পদ পুনরুদ্ধারের জন্য প্রার্থী পরিবর্তন করা দরকার।
তিনি আরো বলেন, আমি এ শহরেরই ছেলে। দলের কর্মীরা আমাকে প্রার্থী হতে বলছেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে অবহিত করেই তিনি মেয়র পদে নির্বাচন করার লক্ষ্যে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। এখন দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আছি। আর দলের সাধারণ সম্পাদকও ইঙ্গিত দিয়েছেন সবকিছু বিবেচনা করেই মনোনয়ন দেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ বলেন, আওয়ামী লীগ এ দেশের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দল। আওয়ামীলীগের মতো এতবড় রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে আছি দীর্ঘ সময় ধরে। দলের যেকোনো নেতাকর্মীর মনোনয়ন চাওয়ার অধিকার রয়েছে। সব মূল্যায়ন করে দলই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে নিজের নগরীর জন্য কাজ করার সুযোগ পাবো। আর যদি আমাকে না দিয়ে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয় তখনও আমি দলের হয়ে কাজ করে যাবো।
ক্রীড়া সংগঠক ও ব্যবসায়ী মাহি উদ্দিন আহমদ সেলিম বলেন, নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন প্রত্যাশা করা একটা নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার। এখানে সকলেরই অধিকার আছে মনোনয়ন প্রত্যাশা করার। তবে এটা দেয়া না দেয়া কেন্দ্রের ব্যাপার। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে যাকে যোগ্য মনে করবেন তিনি তাকেই মনোনয়ন দেবেন বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি আমাকে মনোনয়ন না দিয়ে অন্য কাউকে দেন তা আমি মেনে নেবো এবং দলের হয়ে কাজ করবো।
তিনি আরো বলেন, আমি সিলেটের ক্রীড়া ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। সাথে সাথে ব্যক্তিগত ভাবে সিলেটের উন্নয়নেরও কাজ করছি।
বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রায় সাতাশ মাস আমাকে দায়িত্ব পালন করতে দেয়া হয়নি। বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলাম বলেই আমাকে অকারণে একটি মামলায় জড়িয়ে জেলে পাঠানো হয়েছিল। এর আগেও আমি রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘদিন জেলে ছিলাম। যতটুকু সময় পেয়েছি নগরবাসীর জন্য কাজ করেছি। দলের চেয়াপারসনও আমাকে কাজ করে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন।
দলীয় মনোনয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলীয় মনোনয়ন নিয়ে আমি আত্মবিশ্বাসী। কেন না কাজের মূল্যায়ন করে দল আবার আমাকেই মনোনয়ন দেবে। আমি নগরবাসীকে যে প্রতিশ্রুতি দিইয়েছিলাম মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তা পূরণে শুরু থেকেই আন্তরিকভাবে কাজ শুরু করেছিলেন। তবে দীর্ঘ দিন জেলে বন্দি থাকায় সব কাজ করতে পারেননি। এজন্য আগামী নির্বাচনে তিনি আবারও সুযোগ চান।
মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী বদরুজ্জামান সেলিম বলেন, আমি ৩৮ বছর ধরে বিএনপির জন্য কাজ করে যাচ্ছি। কাউন্সিলরদের ভোটে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করেছি। নেতাকর্মী ও নগরবাসী সকলেই আমাকে প্রার্থী হতে বলছেন। আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে বিএনপির জন্য কাজ করছি। বিএনপির বিজয় ধরে রাখতে প্রয়োজন প্রার্থী বদল করা।
বর্তমান মেয়র আরিফুল হক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি পুরোপুরিই জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন, এজন্যই ‘গ্রিন সিগন্যালের’ বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন। বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সাথে দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীর কোন সম্পর্ক নেই দাবি করে তিনি বলেন, দলীয় কর্মসূচীতেও তাকে দেখা যায় না।
মহানগর বিএনপির সভাপতি ও মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী নাসিম হোসাইন বলেন, আমি দলের হাইকমান্ডের মত নিয়েই নির্বাচনের লক্ষ্যে কাজ করছি। নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে নগরবাসীর সমর্থন আদায়ে কাজ করছেন। বিএনপির বিজয় ধরে রাখতে প্রার্থী পরিবর্তন করা দরকার। আশা করি কেন্দ্র আমাকে মনোনয়ন দেবে।