Sylhet Today 24 PRINT

ইউরোপে প্রদর্শনীতে ধর্মপাশার স্মৃতিসৌধ

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৭

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মহিষখোলায় মহিষখোলা নদীর তীরে একটি টিনের ঘরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রাম নিতেন। পাক হানাদারদের মাঝেসাঝে ধরে নিয়ে বন্দী করেও রাখতেন। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের এক ভয়াল সংঘর্ষ হয়। অনেক যোদ্ধা মারা যান। মহিষখোলা নদীর পাড়ঘেঁষা বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায় তখনই। শহীদ যোদ্ধাদের গণকবর রচিত হয় তারই এদিক-ওদিক। এঘটনার ৪২ বছর পর ২০১৩ সালে ওইস্থানে নির্মিত হয় একটি স্মৃতিসৌধ।

'সব ক'টা জানালা খোলে দাও না'- এই গান থেকে স্থাপত্যভাবনা নিয়ে রাজন দাশ নকশা করেন মহেশখোলার 'লিবারেশন ওয়ার মন্যুমেন্ট'। যেটি চলতি মাস থেকে সুইজারল্যান্ডে শুরু হওয়া একটি প্রদর্শনীতে ঠাঁই পেয়েছে।

বিশ্বসভায় দেশের স্থাপত্যকে তুলে ধরতে ‘বেঙ্গল স্ট্রিম: দ্য ভাইব্র্যান্ট আর্কিটেকচার সিন অব বাংলাদেশ’ নামের এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটেলমেন্ট ও সুইস আর্কিটেকচার মিউজিয়াম।  বাংলাদেশের ৩০ জন স্থপতির কাজ নিয়ে ১ ডিসেম্বর  থেকে এ প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের পর এ প্রদর্শনী হবে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ও ফ্রান্সের প্যারিসে।

দেশের আরো ২৯ জন স্থপতির সাথে এ প্রদর্শনীতে ঠাঁই করে নিয়েছে সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, স্থপতি রাজন দাশের স্থাপত্যশিল্প 'লিবারেশন ওয়ার মন্যুমেন্ট'। ঢাকার বাইরে চর্চারত স্থপতিদের মধ্যে একমাত্র রাজন দাশের স্থাপত্যশিল্পই ঠাঁই পেয়েছে এ প্রদর্শনীতে।  

আয়োজক সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা গেছে। এ প্রদর্শনী চলবে প্রায় আগামী বছরের ৬ মে পর্যন্ত। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে ইউরোপের দর্শকেরা বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্প দেখতে পাবেন।  ২০১৯ সালে প্রদর্শনীটি আসবে ঢাকায়।

প্রদর্শনীর জন্য বাংলাদেশের স্থপতিদের কাজ বাছাই করেছে সুইস আর্কিটেকচার মিউজিয়াম। সুইস স্থপতি নিকলাস গ্রেবার কিউরেটরের দায়িত্ব পালন করছেন। সঙ্গে আছেন সুইস আর্কিটেকচার মিউজিয়ামের আন্দ্রেয়াস রুবি ও ভিভিয়ানা ইওহেনসব্যাগার।

স্থপতি রাজন দাশ জানান, এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পের অতীত, বর্তমান ভবিষ্যত- এই তিন ক্যাটাগরির ৩০টি স্থাপত্যশিল্প ঠাঁই পেয়েছ।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধপূর্ববর্তী স্থাপত্যশিল্পকে অতীত, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময়কালকে বর্তমান আর নগর উন্নয়নকেন্দ্রীক ভবিষ্যতধর্মী স্থাপত্য চিন্তাকে ভবিষ্যত ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়েছে।

প্রদর্শনীতে ঠাঁই পাওয়া স্থাপত্যশিল্প সম্পর্কে রাজন দাশ বলেন, এই স্থাপত্য সৃষ্টির প্রারম্ভে স্থপতি হিসেবে আমার মনে তাই ‘ঘর’ বিষয়টি ক্রিয়াশীল হয়। নদীর পশ্চিম পাড়ে এই ‘বধ্যভূমি’তে বধ-হওয়া শহীদরা ঘুমিয়ে আছেন। ঘুমন্ত এই প্রাণেদের জাগ্রত্য চেতনার ‘আশ্রয়স্থল’ নির্মানই তাই উদ্দিষ্ট হয়ে ওঠে। নদী রূপ নেয় রূপক-এ। সে স্বাধীনতার কথা বলা শুরু করে। পূর্ব-পশ্চিম উন্মক্ত হওয়ায় দুই দেয়ালের ঘর রচিত হয়ে যায়। উত্তর-দক্ষিণের ২৭ ফুট উচু দেয়ালে (দেড় ফুট পুরু) ব্যাকরণ ভেঙ্গে অনেকগুলো ছোট-বড় জানালা আড়াল খুলে আলোর উৎস হয়ে উঠে। ঠিক চোখ-মেলে-তাকানোর মতো। ‘যারা এই দেশটাকে ভালবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ’ , তারা তো বদ্ধ ঘরে থাকে না, যে ঘরে দোর-জানালায় অর্গল টানা, যে ঘরে আলোর ঝলক নেই, দোলা নেই, সে ঘরে স্বাধীনতা প্রবেশ করে না। সেই ঘর অন্ধকারের অধীন। তাই ‘সব কয়টা জানালা’ই খুলে আছে।

তিনি বলেন, ‘জানালা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্তাংশ। এটি আমাদের দর্শনেন্দ্রীয়ের মতো। চোখ দিয়ে যেমন আমাদের দেহ-ঘরে আলো প্রবেশ করে, আমাদের প্রথম অভিজ্ঞতা চোখ দিয়ে হয় (‘জ্ঞান চক্ষু’), তেমনই দেওয়ালকে মুক্তি দেয় জানালা। তবেই দেয়ালের চোখ ফুটে আলো-বাতাস প্রবেশ করে গৃহে প্রাণের সঞ্চার হয়। এজন্যই ‘খোলা জানালা’ আর ‘স্বাধীনতার চেতনা’ সমার্থক হয়ে উঠেছে।

এভাবেই হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে ‘সব ক’টা জানালা’ খুলে আমাদের ডাকছে ওরা,
‘যারা এই দেশটাকে ভালবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ’।

বাংলাদেশের ৬০টি স্থাপত্যশিল্প এই প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হবে। অংশগ্রহণকারী ৩০ জন স্থপতির মধ্যে আরো আছেন- বশিরুল হক, শামসুল ওয়ারেস, নাহাস আহমেদ খলিল, সাইফ উল হক, জালাল আহমেদ, রফিক আজম, এহসান খান, সালাউদ্দিন আহমেদ, মেরিনা তাবাসসুম, কাশেফ মাহবুব চৌধুরীসহ আরও অনেকে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শনগুলোও থাকবে এই প্রদর্শনীতে। বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পের পথিকৃৎ স্থপতি মযহারুল ইসলাম, বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই কান, পল রুডলফ নির্মিত স্থাপত্যের নিদর্শন থাকবে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.