ওসমানীনগর প্রতিনিধি | ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭
সিলেটের ওসমানীনগরে কুশিয়ারা নদীর ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে সাদীপুর ইউনিয়নের পূর্ব ও লামা তাজপুর গ্রামের ১৪-১৫টি পরিবারের বসত ভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এবং ভাঙনের মুখে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি রয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। আতংকের মধ্যে থেকে দিনরাত কাটছে নদীতীরবর্তী বসবাসকারীদের।
জানা যায়, বিগত বন্যায় কুশিয়ারা নদীর বিপদ সীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় দীর্ঘদিন পানিবন্দি ছিল পূর্ব ও লামা তাজপুর গ্রামবাসী। বর্ষার পানি নামতে শুরু করার সাথে সাথেই নদীর উত্তরপারে অন্তত ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দেখা দেয় ভয়াবহ ভাঙন।
নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় লামা তাজপুর গ্রামের নওশাদ মিয়া, সৈয়দ ফারক, সৈয়দ আঙ্গুর আলী, মাওলানা তাজুল ইসলাম, খিদুর মিয়া, নিজাম উদ্দিন, সৈয়দ লুৎফুর রহমান, পূর্ব তাজপুর গ্রামের আবদুল মানিক, আছন উল্যাসহ অন্তত ১৫টি পরিবারের বসত ভিটা। বর্তমানে ভাঙ্গনের কবলে রয়েছে অর্ধ শতাধিক বসতবাড়ি ও ১টি মসজিদ। যখন তখন এগুলো নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
নদী ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধির জন্য নদীর অপরিকল্পিতভাবে বালি উত্তোলনকে দায়ী করছেন এলাকাবাসী ও জনপ্রতিনিধিরা।
তবে সাদীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুর রব ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধির জন্য বিবিয়ানা পাওয়ার প্ল্যান্ট কর্তৃক নদীগর্ভে স্থাপিত পানির ফিল্টারকে দায়ী করছেন।
তিনি আরো জানান, বিশ্ব ব্যাংকের সার্ভে রিপোর্টে পাওয়ার প্ল্যান্টের তিন কিলোমিটারের মধ্যে শব্দ ও বায়ু দূষণ এবং নদী ভাঙন রোধে প্ল্যান্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়ার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, লামা তাজপুর এলাকায় নদীর বিশাল এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে ভাঙন। তীরবর্তী প্রতিটি বসতভিটা নদীতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম। অনেক পরিবার স্থানান্তরিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এ সময় বয়োবৃদ্ধরা জানান, এক সময় তাজপুরবাসীর সবই ছিল কিন্তু কুশিয়ারার ভাঙন নি:স্ব করে দিয়েছে এলাকাবাসীকে। বিগত প্রায় ৪০-৪৫ বছরের ভাঙ্গনের কবলে পড়ে তাজপুরের একেকটি পরিবার ৫-৬ বার করে ভিটেমাটি ছাড়া হয়েছে। ইতিমধ্যে গ্রামটির অধিকাংশ এলাকা হারিয়ে গেছে নদীর তল দেশে। রাক্ষুসী নদীর তাণ্ডবে প্রায় সহস্রাধিক মানুষ সহায় সম্বল হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিভিন্ন সময়ে এমপি, মন্ত্রীরা এলাকা পরিদর্শন করে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই দেননি।
লামা তাজপুর গ্রামের দিলারা বেগম (৪০) বলেন, দুইদিন আগে আমার দেবরের ভিটা তলিয়ে গেছে এখন আমাদের বসত ঘর ভাঙনের কবলে পড়েছে। আতংকের মধ্যে থেকেই দিনরাত কাটাচ্ছি।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, লামা তাজপুর ও পূর্ব তাজপুর গ্রামের অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ভাঙনের কবলে রয়েছে। গত কয়েকদিনে অন্তত ১৫টি পরিবারের বসতঘর বিলীন হয়ে গেছে। যুগযুগ ধরে গ্রামবাসীকে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন দায়িত্বশীলরা। ৯১ সালে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও কিছু কাজ করার পর অজ্ঞাত কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। গ্রামবাসীকে ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান তিনি।
উপজেলা চেয়ারম্যান ময়নুল হক চৌধুরী বলেন, নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালি উত্তোলকে দায়ী করে ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী (পর্যালোচনা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ) মো. সিরাজুল ইসলাম নদী ভাঙনের জন্য অপরিকল্পিতভাবে বালি উত্তোলনকে দায়ী করে বলেন, নদী ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী বলেন, ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ভাঙন রোধ করতে ব্লক স্থাপনের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে।