Sylhet Today 24 PRINT

‘বন্দি’ করেও রক্ষা পাচ্ছে না শাহ আরেফিন টিলা

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ২১ জানুয়ারী, ২০১৮

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলা ধসে একের পর এক প্রাণহানির পর এই টিলায় যান চলাচলের তিনটি পথে বাঁশের বেড়া দিয়ে রেখেছিল প্রশাসন। কিন্তু সেই বেড়া ডিঙিয়ে পাথর পরিবহনের ট্রাক চলাচল করত।

এরপর বাঁশের বেড়া তুলে নির্মাণ করা হয় পাকা পিলার। গত টিলার সঙ্গে সরাসরি পরিবহন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে নির্মাণ করা হয় পাকা পিলার। কার্যত বন্দি করে ফেলা হয় এই টিলাকে। এত কিছুর পরও রক্ষা পাচ্ছে না শাহ আরেফিন টিলা। এখনও চলছে এই টিলা কেটে পাথর উত্তোলন। বন্ধ হয়নি টিলা ধসে প্রাণহানিও।

শনিবার দুপুরে ওই টিলা ধসে মাটি চাপা পড়ে মারা যান সাদেক মিয়া (২০) নামের পাথর শ্রমিক।  বেলা ৩টায় পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার টিলা ধসের ঘটনায় মারা গেছেন ৩ শ্রমিক।

গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ওই টিলার ভূমিধসে একসঙ্গে ছয়জন পাথরশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর আরো তিন দফা এই টিলা ধসে মারা যান একাধিক শ্রমিক। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে টিলা ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুর রহমান খান জানান, শনিবার পুলিশ সাদেক নামের এক শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করেছে।

তিনি বলেন, টিলায় যাওয়ার সবগুলো পথ পাকা পিলার দিয়ে বন্ধ করার পরও রাতের আঁধারে পাথর উত্তোলন করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। এর সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

গত ৪ বছরে এই টিলা ধ্বসে অন্তত ১৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। আর গত ২ জানুয়ারি গোয়াইনঘাটের জাফলংয়ের মন্দিরের জুম এলাকায় পাথর উত্তোলনকালে মাটি চাপা পড়ে মারা যান ৪ শ্রমিক। গত এক বছরে সিলেটের বিভিন্ন কোয়ারিতে মাটি চাপা পড়ে অন্তত ৩৬ শ্রমিক নিহত হন।
 
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নে সরকারি খাস খতিয়ানের ১৩৭ দশমিক ৫০ একর জায়গায় শাহ আরেফিন টিলা। লালচে, বাদামি ও আঠালো মাটির এ টিলার নিচে রয়েছে বড় বড় পাথর খণ্ড। এসব পাথর উত্তোলন করতেই চলে টিলা কাটা।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সিলেটের সকল পাথর কোয়ারিতে সব ধরণের যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আদালত। এছাড়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে শাহ আরেফিন টিলাসহ তিনটি কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। তবে এসব নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কোম্পানীগঞ্জের সীমান্তবর্তী বিশাল পাহাড় শাহ আরেফিন টিলা কেটে বোমা মেশিন দিয়ে চলছে পাথর উত্তোলন।

গত বছর শাহ আরেফিন টিলা ধসে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিলো। এই কমিটি শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসন ও পুলিশের গাফিলতি রয়েছে বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে। এই প্রতিবেদনে টিলা কাটার জন্য ৪৭ ‘পাথরখেকো’কে চিহ্নিত করা হয়। এদের সঙ্গে পরোক্ষভাবে সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে গণমাধ্যমকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।  প্রতিবেদনে বলা হয়, থানা-পুলিশের সঙ্গে পাথর ব্যবসায়ীদের সুসম্পর্কের কারণেই ভোলাগঞ্জ ও শাহ আরেফিন টিলায় ‘বোমা মেশিন’ দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না।

তবে প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় টিলা কেটে পাথর উত্তোলন চলছেই।

সিলেটের একটি বৃহৎ টিলা কেটে ধ্বংস করার পেছনে পুলিশ ও প্রশাসন ‘পরোক্ষভাবে জড়িত’ থাকার তথ্য মিলেছে। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলা ধ্বসে পাঁচ শ্রমিক নিহতের তদন্তে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ওঠে এসেছে। ইজারাদার এই টিলার মাত্র ২৫ একর ভ’মি লিজ নিয়ে ১৩৭ একরের পুরো টিলাটি ধ্বংস করে দিয়েছে বলেও ওঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শাহ আরেফিন টিলার কিছু জমি খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষ ২০০৯ সাল থেকে টিলা কেটে পাথর উত্তোলন করছে। টিলা কাটা আইনত নিষিদ্ধ থাকায় বেলা পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিটির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে। গত বছর শাহ আরেফিন টিলা থেকে পাথর উত্তোলনেও নিষেধাজ্ঞা জারি করে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। তবু বন্ধ হয়নি অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.