Sylhet Today 24 PRINT

হাকালুকিতে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২০ শতাংশ

দেখা মিলছে বিপন্ন প্রজাতির মাছও

রিপন দে, মৌলভীবাজার |  ০৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

২০১৭ সালের দীর্ঘ মেয়াদী বন্যায় ফসল হারিয়ে হাকালুকি পাড়ে ছিল হাহাকার। হাকালুকিকে ঘিরে যাদের জীবন জীবিকা তারা সব হারিয়ে হয়েছিলেন নি:স্ব। কিন্তু মাছের সাথে যাদের জীবিকা জড়িত তাদের কাছে এই বন্যা বছর শেষে হয়ে গেছে আশীর্বাদ। এ বছর হাকালুকিতে মাছের উৎপাদন ২০ শতাংশ বেড়ে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজার মেট্রিক টন। দেখা মিলছে প্রায় বিপন্ন অনেক প্রজাতির মাছ। এদের মধ্যে সংকটাপন্ন ১৩ প্রজাতির মাছ এবং চরম বিপন্ন ৮ প্রজাতির মাছ।

জেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের বন্যায় ধান পচে অ্যামোনিয়া গ্যাসে হাকালুকি হাওরে প্রায় ২৫ মেট্রিক টন মাছ মারা মায়। তার পরেও এ বছরে মাছের বাম্পার উৎপাদন হয়েছে। এ বছর হাকালুকিতে ১৭ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে বলে ধারনা করছেন যা বিগত বছরগুলোর গড় ১৪ হাজার মেট্রিক টনের থেকে ২০ শতাংশ বেশী। প্রতি বছর ১৪ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয় হাকালুকিতে। এ বছর বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা অবমুক্ত ও বিল নার্সারি স্থাপনসহ নানা উদ্যোগের ফলে উৎপাদন ২০ শতাংশ মাছ বেশি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

সরেজমিনে হাকালুকি ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন সাইজের মাছের পাশাপাশি ২০ থেকে ৩০ কেজি ওজনের মাছও ধরা পড়ছে। এ বছর দীর্ঘদিন বন্যা থাকায় মাছ বড়ও হয়েছে দ্রুত।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন ঘাট থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা কিনছেন লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ । ব্যবসায়ীরা জানালেন, এর মোট পরিমাণ কোটি টাকার উপরে।

স্থানীয় জেলে মুকিদ মিয়া, জিলা মিয়া সহ অনেকের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এ বছর বড় বড় রুই, বোয়াল, আইড়, কমন কার্প, মৃগেল মাছের আধিক্য বেশি হলেও অন্য জাতের দেশী মাছও ধরা পড়ছে। আর চাপিলা, টেংরা, মলা চিংড়িসহ বিভিন্ন জাতের ছোট মাছ প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ছে। ছোট ও বড় মাছ আলাদা আলাদা করে বিক্রি করা হচ্ছে ঘাটে। আছে বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ।

এ বছর উৎপাদন বেড়েছে বিপন্ন প্রজাতির মাছের। বিপন্ন প্রজাতির মাছ পাবদা, ফলি, চিতল, আইড়, কালবাউস ও গুলশা এবার বেশি দেখা যাচ্ছে (আগেও ছিলো তবে কম)। এছাড়া রাণী মাছ, কাকিলা, ছোট চিংড়ি, কাজলি, মলা, পুঁটি, টেংরা, পটকা, ভেদা, গনিয়া, কানি পাবদা, ইত্যাদি গত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর অনেক বেশী দেখা মিলছে হাকালুকিতে।

 

এছাড়া বিপন্ন প্রজাতির মাছ চিতল, টিলা, খোকশা, অ্যালং, কাশ খাইরা, চরম বিপন্ন প্রজাতির মধ্যে আছে ভাঙন, বাটা, নান্দিনা, ঘোড়া মুইখ্যা, সরপুঁটি। সংকটাপন্ন মাছের মধ্যে আছে ফলি, বামোশ, টাটকিনি, তিতপুঁটি মাছের দেখা মিলছে হাকালুকিতে, যা জেলা ও উপজেলার কার্যালয়ের সঠিক উদ্যোগের ফসল বলে মনে করছেন এর সাথে যুক্ত মৎস্য কর্মকর্তারা।

বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ ফিরে আসা প্রসঙ্গে কুলাউড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ বলেন, ’খুশির খবর হচ্ছে এ বছর বিপন্ন প্রজাতির অনেক মাছ ফিরে এসেছে। কঠোরভাবে মৎস্য আইন প্রয়োগের ফলে মাছের উৎপাদন বেড়েছে। প্রতি বছর ১৪ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয় হাকালুকিতে। এ বছর বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা অবমুক্ত ও বিল নার্সারি স্থাপনসহ নানা উদ্যোগের ফলে ২০ শতাংশ মাছ বেশি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

হাকালুকির মিঠাপানির তাজা ও সুস্বাদু মাছের সুনাম রয়েছে দেশে-বিদেশে। চাহিদা বেশি থাকায় দামও ভালো।

বিলের পাড়ে অস্থায়ী নিলাম কেন্দ্র স্থাপন করেছেন বিল ইজারাদাররা। সেখানে ভোর থেকে ব্যবসায়ীরা মাছ কেনার জন্য ভিড় করছেন। ইজারাদারদের অধীনে জেলেরা সারাদিন বিলে জাল ফেলে মাছ ধরছেন। কিছুক্ষণ পর পর সেই মাছ নৌকায় করে ঘাটের নিলাম কেন্দ্রে বিক্রি করা হচ্ছে।

দেশের বৃহত্তর প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর আয়তনের হাকালুকি হাওরের ৮০ ভাগ মৌলভীবাজারে ও ২০ ভাগ সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত।

মৌলভীবাজারের বড়লেখা অংশে ৬০ ভাগ কুলাউড়ায় ১২ ও জুড়ি উপজেলায় ৮ ভাগ রয়েছে। প্রায় ১১২ প্রজাতির মাছের চারণক্ষেত্র হাকালুকি হাওরে ছোট বড় ২৩৮টি বিল রয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার অংশে ২০০টি আর বাকি ৩৮টি সিলেট অংশে। এছাড়া মাছের ১৫টি অভয়াশ্রম আছে হাকালুকিতে। প্রতি বছর শীত মৌসুমে হাওরের পানি কমলে ধরা পড়ে দেশী প্রজাতির মাছ। প্রতিদিন কোটি টাকার মাছ যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কুদ্দুস আকন্দ জানান, হাকালুকি হাওর ছাড়াও জেলার কাউয়াদিঘী, হাইল হাওরসহ বিভিন্ন হাওর-বিলে এই মৌসুমে মাছ ধরা হয়। জেলায় বছরে মাছের চাহিদা প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন। গত বছর জেলায় ৪৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়।

বিগত বছর বন্যায় অ্যামোনিয়া গ্যাসে হাকালুকি হাওরে প্রায় ২৫ মেট্রিক টন মাছ মারা যাওয়ার পর সেই ক্ষতি পোষাতে ২৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে রুই, কাতলা ও মৃগেল জাতীয় ২৬ লাখ ৪০ হাজার পোনা উৎপাদন করে হাওরে ছাড়া হয়। এছাড়া আরো ২৮ লাখ টাকার পোনা মাছ অবমুক্ত করা হয়। তাছাড়া এবারের বন্যা ছিল দীর্ঘ সময়ের। এতে পানি ছিল অন্য সময়ের চেয়ে বেশি তাই মাছ বারংবার প্রজননের সময় ও সুযোগ পেয়েছে।

 

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ [email protected] ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.