Sylhet Today 24 PRINT

অনন্ত বিজয় হত্যার এক মাস : এবার টার্গেট কে?

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ১২ জুন, ২০১৫

২৬ ফেব্রুয়ারি, ৩০ মার্চ এবং ১২ মে। বাংলাদেশে উগ্রবাদী খুনিদের আস্ফালনের তিনটি দিন। ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় বইমেলার পাশেই অভিজিৎ রায়, মার্চে রাজধানীর বেগুনবাড়িতে ওয়াশিকুর রহমান বাবু ও মে মাসে সিলেটের সুবিদবাজারে নিজ বাসার সামনে খুন হন অনন্ত বিজয় দাশ। প্রায় তিন মাসে (৭৬ দিন) খুন করা হয় তিনজন লেখক-ব্লগারকে।

আজ ১২ জুন, বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অনন্ত বিজয় হত্যার এক মাস পূর্ণ হচ্ছে। প্রতি মাসে একজন করে ব্লগার খুন হওয়ার প্রেক্ষিতে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে- এবার টার্গেট কে? জঙ্গিদের চাপাতি এবার খোঁজে ফিরছে কাকে? গত তিন মাসে পরপর তিন ব্লগার খুন হওয়ার পরও খুনিদের ধরতে পুলিশের ব্যর্থতা ও এসব হত্যাকান্ডের ঘটনায় কোনো ক্লু উদ্ধারে প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণে এমন প্রশ্ন আরো জোরালো হয়ে দেখা দিয়েছে।

তবে উগ্রবাদী গোষ্টি এবার কেবল ব্লগারদের মধ্যেই তাদের টার্গেট সীমাবদ্ধ রাখেনি। অনন্ত বিজয়কে হত্যা করার পর দায় স্বীকার করে টুইট করা আনসার বাংলা সাম্প্রতিক সময়ে দু'দফায় বেশ ক'জন বিশিষ্টজনকে হত্যার হুমকি প্রদান করেছে। যাদের মধ্যে সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্ঠা এবং সরকারী দলের সাংসদও রয়েছেন।

এর আগে ৮৪ জন ব্লগারের 'হিটলিস্ট' তৈরি করেছিলো উগ্রবাদী গোষ্টি। এরমধ্যে প্রথমেই হত্যা করা হয় ব্লগার রাজীব হায়দারকে। ২০১৩ সালেই হত্যা করা হয় তাকে। রাজীব হায়দার হত্যা মামলা এখন চলছে। লেখক অভিজিৎ রায় হত্যার পর আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই তদন্তে আসলেও সে হত্যার রহস্যও উন্মোচিত হয় নি। গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি কাউকে।

সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক আব্দুল বাতেন বলেন, একের পর এক লেখক-ব্লগারদের হত্যা করা হচ্ছে। অথচ খুনিরা গ্রেফতার বা সনাক্ত হচ্ছে না। খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ার কারণেই তারা আরেও বেপোরোয়া হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ব্লগার হত্যাকারীদের সনাক্ত করে গ্রেফতার ও এই উগ্রবাদী সমূলে উৎপাটন করার দাবি জানান তিনি।

সর্বশেষ ১২ মে সিলেট নগরীর সুবিদবাজারে নিজ বাসার সমানে খুন হন লেখক-ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ। সকালে বাসা থেকে নিজ কর্মস্থলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন পূবালী ব্যাংকের এই কর্মকর্তা ও বিজ্ঞান লেখক। বাসার সামনেই চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করে ৪ জঙ্গি খুনি। এরআগে খুন হওয়া ব্লগারদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছিলো ঠিক একই কায়দায় মগজে আঘাত করে খুন করা হয় অনন্তকেও।

অনন্ত বিজয় হত্যার একমাস পূর্তিতে ব্লগার মাহমুদুল হক মুন্সী তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন-

আরেকজন ব্লগারের মরার সময় হয়ে গেছে। আনসারুল্লাহ্‌ বলেছে, দ্যা ডাস্ট উইল নেভার সেটেল...। তারা রক্তরাঙ্গা রাজপথে ধুলো জমতে দেবেনা। থিকথিকে রক্তাক্ত পিচ্ছিল পথে দিন গুনে গুনে পা ফেলা।
প্রতিটা দিনই ভাবি, আচ্ছা আজ আমি মরে গেলে আম্মু কি করবে? কাঁদবে। এসব করিস না, বার বার বলে... হয়তো কাঁদতে কাঁদতে সেগুলিই বলবে। আব্বুও কাঁদবে। তবে গর্ব ভরে। যে আদর্শ নিয়ে আব্বু দেশটাকে স্বাধীন করেছিলো, সেই আদর্শ আঁকড়ে ধরে ছিলাম, এটা ভেবেই হয়তো গর্ব করবে।
আর আমার অর্ধাঙ্গীনির? নিজের জীবনের ঠিক নাই, একটা নতুন প্রাণ আনতে ভয় পাই... ও কি নিয়ে থাকবে?
আচ্ছা, যারা মারা গেছেন, খোঁজ নিয়েছে কি কেউ তাঁদের পরিবারগুলি কেমন আছে?
কেউ খোঁজ নেয়না। বছরান্তে শোকসভা, দুইটা মাইক, তিনটা সেলিব্রেটি... রক্ত বৃথা যেতে দেবো না...
পরিবারের যে রক্তটুকু মুছে গেলো নিঃশেষে তার ভার শুধু পরিবারই বহন করে।
এটাই বাস্তবতা। এটাই বেঁচে থাকার মতো চরম অশ্লীল সত্য।

অনন্তকে হত্যার পর তাঁর বড় ভাই রত্নেশ্বর দাশ বাদী হয়ে সিলেট মহানগরীর বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। দিনদুপুরে প্রকাশ্যে খুন করা হলেও পুলিশ এ হত্যার ঘটনার কোনো ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি। তদন্তে ব্যর্থ পুলিশ মামলাটি হস্তান্তর করে সিআইডিতে। তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে সিআইডি গত ৯ জুন ইদ্রিস আলী নামে সিলেটের একটি স্থানীয় পত্রিকার এক ফটো সাংবাদিককে গ্রেফতার করে। আদালতের মাধ্যমে তাকে ওইদিনই রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ডে তিনদিন জিজ্ঞাসবাদ শেষে তার কাছে থেকে এখন পর্যন্ত তেমন কিছু উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

অনন্ত বিজয় হত্যার তদন্তে অগ্রগতি বলতে আপাতত এটুকুই। এরআগে ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে হত্যার সময় প্রত্যক্ষদর্শীরা দু'জনকে হাতে নাতে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করলেও তাদের কাছ থেকেও তেমন কিছু উদ্ধার করতে পারে নি পুলিশ। ফলে খুনি আর খুনের নির্দেশদাতারা থেকেই যাচ্ছে আড়ালে।

তারা প্রতি মাসে একটি করে খুন করেই চলছে। এরপর নতুন কাউকে খুনের পরিকল্পনা আঁটছে। এ অবস্থায় ব্লগার, মুক্তমান ও বিজ্ঞান লেখকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।

অনন্ত বিজয় হত্যার পর তাঁর বিজ্ঞান চর্চার সংগঠন বিজ্ঞান ও যুক্তবাদী কাউন্সিলের আরো দুই সদস্যকেও প্রাণনাশের হুমকী দেওয়া হয়। ফলে এই সংগঠনের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।

অনন্ত বিজয় হত্যর পর সিলেটের ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকদের তালিকা করতে মাঠে নামে পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব তালিকা করা হচ্ছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত নিরাপত্তামূলক দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন সিলেটের কয়েকজন ব্লগার-এক্টিভিস্ট।

অনন্ত বিজয় দাশ হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক আরমান আলী বলেন, অনন্ত বিজয় হত্যার ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আশা করছি তার কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে খুন হয়েছেন আটজন ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, অ্যাক্টিভিস্টদের সমর্থক ও সহযোগী। এর মধ্যে সাতজন সরাসরি ব্লগিংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে সবাই কোনো না কোনোভাবে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সবার মৃত্যু হয়েছে মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে।

জানা যায়, বাংলাদেশে ব্লগে লেখার সূত্র ধরে উগ্রবাদীদের হিটলিস্টে থাকাদের মধ্যে প্রথমবারের মতো খুনের ঘটনা ঘটে ২০১৩ সালে। ১৫ ফেব্রুয়ারি খুন হন ব্লগার রাজীব হায়দার শোভন। তিনি 'থাবা বাবা' নামের ব্লগে লেখালেখি করতেন। খুনের কয়েক দিন আগে জামায়াত-শিবির সমর্থিত 'সোনার বাংলা ব্লগে' তাকে ‘কতল’ করার হুমকি প্রচার করা হয়। পরে তিনি ঢাকার মিরপুরে বাসার সামনে নৃশংসভাবে খুন হন।

একই দিন ঢাকায় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন অগ্রণী ব্যাংকের কর্মী জাফর মুন্সি। তিনি এর আগের দিন মতিঝিলে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন। পরে তার ওপর চালানো সংঘবদ্ধ আক্রমণে মাথায় মারাত্মক আঘাতে আহত হন তিনি। পরদিন তার মৃত্যু হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় খুন হন ব্লগার মামুন হোসেন। ১ মার্চ খুন হন সিলেটের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী জগৎজ্যোতি তালুকদার। সেদিন রাত পৌনে ১০টার দিকে জগৎজ্যোতি তালুকদার এক সঙ্গীর সঙ্গে মোটরসাইকেলে নগরীর আখালিয়া বাজারের দিকে যাওয়ার সময় একদল উগ্রপন্থি তাদের কুপিয়ে গুরুতর আহত করে এবং মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে রাতে তার মৃত্যু হয়।

৯ এপ্রিল বুয়েটের শহীদ নজরুল ইসলাম হলে ওই প্রতিষ্ঠানেরই শিক্ষার্থী হেফাজতে ইসলামের সমর্থক মেজবাহ উদ্দিনের চাপাতির কোপে গুরুতর আহত হন আরিফ রায়হান দীপ। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে আমবাগান গ্রামের ফ্ল্যাটে কুপিয়ে এবং গলা কেটে হত্যা করা হয় ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও মুক্তচিন্তার সমর্থক আশরাফুল ইসলামকে। ৯ ডিসেম্বর বগুড়া জেলা সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের যুগ্ম-সম্পাদক ও গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক প্রভাষক জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুকে পেছন থেকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে মাথায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় বিজ্ঞান লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী অভিজিৎ রায়কে। একই সময় আহত হন আরেক ব্লগার ও অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা।

খুনের ঘটনার বাইরে চাপাতি দিয়ে কোপানোও হয়েছে কয়েকজনকে। তারা ভাগ্যগুণে খুন না হলেও দীর্ঘদিনের চিকিৎসার পর সুস্থ হন। এর মধ্যে দুই দফায় কোপানো হয় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনকে। তাকে ২০১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর উত্তরায় নিজ কার্যালয়ের সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। ওই বছরের ৭ মার্চ রাতে মিরপুরের পূরবী সিনেমা হলের কাছে কুপিয়ে জখম করা হয় ব্লগার সানিউর রহমানকে। ২০১৩ সালের জুনে এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় কোপানো হয় গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও ব্লগার রাকিব আল মামুনকে। এর বাইরে উগ্রপন্থিদের হাতে বিভিন্ন সময় খুন হয়েছেন আরও অনেক প্রগতিশীল ব্যক্তি।

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনে হামলার শিকার হন অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ। চাপাতি ও কুড়ালের কোপে মারাত্মক আহত ড. হুমায়ুন আজাদ চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছর ১২ আগস্ট জার্মানির মিউনিখে মারা যান। গেল বছরের ১৫ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও মুক্তচিন্তার লেখক শফিউল ইসলাম লিলনকে বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

ব্লগার ও অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পেছন থেকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিটিতেই টার্গেট ছিল মস্তিষ্ক ও মাথা। কারণ উগ্রপন্থিরা মনে করে, মস্তিষ্কই তাদের মূল আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। পেছন থেকে কোপানো হয়, যেন চেহারা না দেখা যায়।

এদিকে অনলাইন ব্লগারদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ২০১৩ সালে ৮৪ জনের একটি তালিকা দিয়েছিল হেফাজতে ইসলাম। সূত্রমতে, এই তালিকায় থাকা ব্লগার ও নতুন সংযোজিতদেরই হিটলিস্টে রেখেছে উগ্রপন্থিরা। তবে ব্লগ-সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বেশিরভাগ কোনোভাবেই ধর্ম অবমাননার সঙ্গে জড়িত নন। তারা শুধুই মুক্ত ও প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.