প্রত্যুষ তালুকদার | ১২ জুন, ২০১৫
ছয় বছরের মাসুম। যে সময়টাতে বইখাতা হাতে নিয়ে বন্ধুদের সাথে স্কুলে যাবার কথা, সেসময়ে নগরীরর কোর্ট পয়েন্টে হিউম্যান হোলারে হেল্পারের দ্বায়িত্ব পালন করতে হয় তাকে। দিন শেষে মজুরির শ’দুয়েক টাকায় মা ও ছোট বোনের সংসারের খরচ মেটায় সে।
শুধু মাসুমই নয়, সিলেটের শিশুদের একটি বড় অংশকেই বাধ্য হয়ে শ্রম বিকোতে হচ্ছে। অভাবের তাড়নায় তাদের অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে।
বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার জরিপ মতে, সিলেটের ত্রিশ শতাংশ শিশুই শিক্ষাবঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক শিশু বাধ্য হয়েই নিয়োজিত হচ্ছে শ্রমে।
আজ বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে দিবসটি। তবে কেবল অানুষ্ঠানিকতার মাধ্যেই সীমাবদ্ধ এ দিবস উদযাপন। সুবিধাবঞ্চিত যে সব শিশু বাধ্য হয়ে যোগ দিতে হচ্ছে কাজে তাদের ফিরিয়ে আনা বা পুণর্বাসনের কোনো উদ্যেগ বা পরিকল্পনা নেই। ফলে পারিবারকি প্রয়োজন, আর্থিক অনটনসহ নানা কারণে প্রতি বছরই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা। একই সঙ্গে বাড়ছে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়ানোর প্রবণতাও।
গত কয়েক বছরে নগরীর গোটাটিকর, কদমতলী, ঝালোপাড়াসহ বেশকয়েকটি স্থানে গড়ে ওঠেছে শতশত ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ। এসব প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়েছে হাজার হাজার শিশু শ্রমিক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিলেও দিনের পর দিন সিলেটে বাড়ছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা। ওয়েল্ডিং কারখানা, ওয়ার্কসপ, বেকারী, হোটেল-রেস্তোরা, যানবাহনে হেল্পারসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রকাশ্যেই ব্যবহার করা হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের। বিশেষ করে বস্তি এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে এসব কাজে।
কেবল আইনের সঠিক প্রয়োগ ও সমাজিক সচেতনা বৃদ্ধির মাধ্যমে শিশুশ্রম অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটে ইউনিসেফের কমিউনিকিশেন ফর ডেভোলাপমেন্ট অফিসার সাঈদুল হক মিল্কি বলেন, ইউনিসেফের তত্বাবধানে পরিচালিত বিশেষ জরিপ অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ সালে সিলেট বিভাগে প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের অন্তর্ভুক্তির হার মাত্র ৬৯.৪ শতাংশ, আর এদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ ঝরে পড়ছে মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছার আগেই। এসব ঝরেপড়া শিশুসহ প্রাথমিক শিক্ষাবঞ্চিত বাকী শিশুদের সিংহভাগই জড়িয়ে পড়ছে ঝুকিঁপূর্ণ বিভিন্ন কাজে।
সিলেট আইনজীবি সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদউল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহিন জানান, ১৮ বছরের নিচে শিশুকে যেকোনো ধরনের শ্রমে বাধ্য করা বেআইনি। এজন্য শাস্তির বিধানও রয়েছে। দেশে শিশুশ্রম বন্ধে কঠোর আইনের প্রচলন থাকলেও প্রশাসনের দায়িত্বহীন ভূমিকার কারনে তা বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ এ্ আইনবিদের।
সিলেটের জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম জানান, সরকার শিশুশ্রম বন্ধে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। তবে ঝুকিঁপূর্ণ শিশুশ্রমের বিষয়টি দেখ-ভালের দ্বায়িত্ব মূলত: শ্রম মন্ত্রনালয়ের হলেও সরকারের অন্যান্য বিভাগ তা বন্ধে কাজ করছে। শিশুশ্রম বন্ধে সরকারের পাশপাশি কাজ করছে বিভিন্ন সামাজিক সংস্থাও। সরকারী-বেসরকারী উদ্যাগে শিশুদের শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত করতে নৈশ বিদ্যালয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চালু আছে।