কামরুল ইসলাম মাহি, জগন্নাথপুর | ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮
‘পুঁথি পাঠ হতো। হতো পালা গান। বাদ যেত না কোনো উৎসব। কেউ এসে না খেয়ে ফিরে যেতে পারত না। দরিদ্রদের জন্য সহায়তার হাত সর্বদা খোলা ছিল এখানে।' সুনামগঞ্জ পুরাকীর্তির অন্যতম নিদর্শন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও'র জমিদার বাড়ি সম্পর্কে এমনটিই বলছিলেন ৭০ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধা।
প্রাচীন পুরাকীর্তির অন্যতম নিদর্শন হিসেবে সুপরিচিত সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও'র জমিদার বাড়ি। প্রায় সাড়ে ৫ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত তিন শত বছরেরও বেশি পুরানো এ জমিদার বাড়িটি এ অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন। আর এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্যমণ্ডিত বিশাল অট্টালিকাবহ জমিদার বাড়ির দক্ষিণ দিকে বহমান রয়েছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কুশিয়ারা নদী।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, প্রায় দেড়শ বছর পূর্বে এ অঞ্চলে জমিদারী শাসনামলের পতন ঘটে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় জমিদারগণ ভারতে চলে যান। তারপর থেকে পরিত্যক্ত এই জমিদার বাড়ি।
যদিও এ জমিদার বাড়িটি এখন অযত্ন অবহেলায় ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে তবুও নতুন প্রজন্মের তরুণরা বেশ মনোযোগ সহকারেই বাড়িটি ঘুরে আসেন। কেউ কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরে আসেন এই তিনশত বছরের পুরনো এই জমিদার বাড়িটি। পর্যটকরা বেশীর ভাগই এ বাড়িতে অবস্থিত দুইটি বিশাল শান বাঁধানো দিঘী, একটি সুন্দর কাছারিঘর যেখানে জমিদার বাবু প্রজাদের বিচার কাজ পরিচালনা করতেন এবং সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের রাখার জন্য কারাগারটি দেখে আকৃষ্ট হন।
কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী রাশিম উদ্দিন বলেন, আমাদের জমিদার বাড়িটি ভ্রমণ পিপাসুদের মনের খোরাক জুগিয়ে আনন্দ দিয়ে আসছে। সংরক্ষণের অভাবে বাড়িটি তার জৌলুস হারাতে বসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাংবাদিক মুহাম্মদ মুন্না মিয়া জানান, এই জমিদার বাড়িটি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সংস্কার করে জরুরী ভিত্তিতে অবমুক্ত করে দেওয়া হোক। তা না হলে হারিয়ে যেতে পারে ইতিহাস ঐতিহ্যের লালিত এই জমিদারি প্রাসাদ।
এ ব্যাপারে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ্ সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, পাইলগাঁও জমিদার বাড়ি সংস্কারের জন্য যাবতীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, জমিদার বাড়ির প্রবেশ দোয়ার জমিদার পরিবারের দেব ভোগ মন্দির জমিদারদের পারিবারিক মহল। এ জমিদার পরিবারের শেষ জমিদার ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন সিলেট বিভাগের কংগ্রেস পার্টির সভাপতি এবং আসাম আইন পরিষদের সদস্য।
জমিদার বংশের কথা প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অচ্যূতচরণ চৌধুরী পাইলগাঁও'র জমিদার বংশের 'রসময় বা রাসমোহন চৌধুরী' হতে প্রাপ্ত সূত্রে লিখেছেন, পাইলগাঁওয়ে বহু পূর্বকালে পাল বংশীয় লোক বসবাস করত। এ গোষ্ঠীয় পদ্মলোচন নামক ব্যক্তির এক কন্যার নাম ছিল রোহিণী। কোন এক কারণে রাঢ় দেশের মঙ্গলকোট হতে আগত গৌতম গোত্রীয় কানাইলাল ধর রোহিণীকে বিবাহ করত গৃহ-জামাতা হয়ে এখানেই বসবাস শুরু করেন।
কানাইলাল ধরের আট পুরুষ পরে বালক দাস নামের এক ব্যক্তির উদ্ভব হয়। এ বালক দাস থেকে এ বংশ বিস্তৃত হয়। বালক দাসের কয়েক পুরুষ পর উমানন্দ ধর ওরফে বিনোদ রায় দিল্লীর মোহাম্মদ শাহ বাদশা কর্তৃক চৌধুরী সনদপ্রাপ্ত হন। বিনোদ রায়ের মাধব রাম ও শ্রীরাম নামে দুই পুত্রের জন্ম হয়। তার মধ্যে মাধব রাম জনহিতকর কর্ম পালনে নিজ গ্রাম পাইলগাঁওয়ে এক বিরাট দীঘি খনন করে সুনাম অর্জন করেন। তার খনন করা দীঘি আজও ঐ অঞ্চলে মাধব রামের তালাব হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। মাধব রামের দুই পুত্র মদনরাম ও মোহনরাম। মোহনরামের ঘরে দুর্লভরাম, রামজীবন, হুলাসরাম ও যোগজীবন নামে চার পুত্রের জন্ম হয়। এই চার ভাই দশসনা বন্দোবস্তের সময় কিসম আতোয়াজানের ১ থেকে ৪নং তালুকের যথাক্রমে বন্দোবস্ত গ্রহণ করে তালুকদার নাম ধারণ করে। এদের মধ্যে হুলাসরাম বানিয়াচং রাজ্যের দেওয়ানি কার্যালয়ে উচ্চ পদের কর্মচারী নিযুক্ত হন। হুলাসরাম চৌধুরী বানিয়াচং রাজ্যের রাজা দেওয়ান উমেদ রাজার অনুগ্রহে আতুয়াজান পরগণায় কতক ভূমি দান প্রাপ্ত হন। হুলাসরামের প্রাপ্ত ভূমীর কিছু কিছু চাষযোগ্য ও কিছু ভূমি চাষঅযোগ্য ছিল। পরবর্তীতে হুলাসরাম চাষঅযোগ্য ভূমিগুলোকে চাষযোগ্যা করে তুললে এগুলোই এক বিরাট জমিদারীতে পরিণত হয়ে উঠে।
হুলাস রামের ভ্রাতুষ্পুত্র বিজয়নারায়ণের একমাত্র পুত্র ব্রজনাথ চৌধুরী জমিদারি বর্ধিত করে এক প্রভাবশালী জমিদারে পরিণত হন। ব্রজনাথ চৌধুরীর দুই পুত্র রসময় ও সুখময় চৌধুরী। রসময় চৌধুরীর পুত্র ব্রজেন্দ্র নারায়নই ছিলেন এ বংশের শেষ জমিদার।