জাহিদ আহমদ, গোলাপগঞ্জ | ১৮ মার্চ, ২০১৮
'হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙ্গে আমার। চোখ খুলতে দেখি চারিদিকে আগুন আর আগুন। পাশে শুয়ে আছেন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সেবু বেগম। তাকে আমি ঘুম থেকে টেনে তুলি। কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। পাশের ঘর থেকেও চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে।'
কান্না জড়িত কন্ঠে রোববার ভোররাতের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের বিবরণ দেন মছকন্দর আলী। গোলাপগঞ্জের লক্ষণাবন্দে এই অগ্নিকান্ডে মারা গেছেন ৫ জন। নিহতদের মধ্যে আছেন মছকন্দরের স্ত্রী সেবু বেগমও। দগ্ধ হলেও কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে যান মছকন্দর।
বেঁচে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'চারদিকে আগুন দেখে আমার স্ত্রী (সেবু বেগম) আমাকে টিনে উপর দিয়ে ঘর থেকে বের হতে সাহায্য করেন। কিন্তু আমি তিনবার চেষ্টা করেও আমার স্ত্রীকে বাঁচাতে পারিনি। আমি হতভাগা এক স্বামী, যে নিজের স্ত্রীকে চোখের সামনেই আগুনে জ্বলে মারা যেতে দেখেছি।'
গোলাপগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মনাবন্দের ক্লাববাজার সংলগ্ন (টিল্লা বাড়ি) ছোট একটি কলোনী। কলোনীর মালিক লয়লু মিয়া নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি। এই কলোনীতে দুই পরিবারের ৭ সদস্যের বসবাস। রোববার ভোররাত ৩ টার দিকে বজ্রপাতে ওই কলোনীর গ্যাস সিলিন্ডারে আগুন লেগে যায়। মূহূর্তেই কলোনীতে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। আগুনে পুড়ে কলোনীর সাত জনের মধ্যে ৫ জনই মারা যান। বেঁচে আছেন কেবল মছকন্দর আলী আর বাবুল মিয়া। তবে শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে যাওয়া বাবুল মিয়ার (৩৫) অবস্থাও আংমঙ্কাজনক। তাকে সিলেট ওসমানী হাসপাতাল থেকে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে।
বাবুল মিয়া এখনো বেঁচে থাকলেও বাঁচতে পারেননি তাঁর স্ত্রী তাহমিনা বেগম ও ছেলে তাহসিন আহমদ।
তাহমিনা বেগমের বাবা কনাই মিয়া বলেন, মেয়ে ও নাতি আগুনে পুড়ে মারা গেছে এ খবর সকালে শুনেই মাথায় আসমান ভেঙ্গে পড়ে। আমার মেয়ে ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। মেয়ের স্বামীর (বাবুল মিয়া) অবস্থাও ভালো না। ওই ঘর থেকে তাকে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় দমকল বাহিনী উদ্ধার করেছে। শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে যাওয়ায় সিলেট থেকে ঢাকায় প্রেরণ করা হচ্ছে।
তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলেন, মেয়ে ও নাতির আগুনে পুড়া মুখ দেখে নিজে ঠিক রাখতে পারছি না।
মাতম করছেন নিহত ইয়া উদ্দিনের পিতা শাহাব উদ্দিন মাতম যোনো কিছুতেই করতে করতে বলেন, আমার ছেলের সাথে রাতে কথা হয় আমার। সে আমায় বলেছিল বাবা আজ বেতনের টাকা পাবো। আমাকে আসার জন্যও বলেছিল সে। সকালে ছেলের সাথে ঠিকই দেখা হয়েছে। কিন্তু সে আর আমার সাথে কথা বলছে না।
এ ঘটনায় নিহতরা হলেন- গোলাপগঞ্জ উপজেলার শরিফগঞ্জ ইউনিয়নের পনাইরচক গ্রামের মছকন্দর আলীর স্ত্রী সেবু বেগম (২২), সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার খালেরমুখ গ্রামের বাবলু মিয়ার স্ত্রী তাহমিনা বেগম (৩০) তার শিশু সন্তান তাহসিন আহমদ (২), গোলাপগঞ্জের নোয়াই দক্ষিণভাগ এলাকার মৃত ইসরাইল আলীর পুত্র সেবুল মিয়া (১৬), ও একই এলাকার শাহাব উদ্দিনের পুত্র ইয়া উদ্দিন (১৮)। নিহতদের মধ্যে দুই নারীই অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট প্রায় ২ ঘন্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।