সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৮ মার্চ, ২০১৮
বাঙ্গালি জাতির ইতিহাস স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। অধিকারহীন মানুষের অধিকার আদায়ে যে সকল সংগ্রাম হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম একটি ১৯৪৯ সালের নানকার বিদ্রোহ। সেই নানকার বিদ্রোহ শহীদের বিপ্লবী চেতনা ধারণ করে নানকার বিদ্রোহের কেন্দ্রভুমি বিয়ানীবাজার উপজেলায়, উলুউরি গ্রামের তরুণদের উদ্যোগে গঠিত "নানকার বিদ্রোহ স্মৃতি পাঠাগার " যাত্রা শুরু করে।
২৬ মার্চ দুপুর ১২টায় পাঠাগারের যাত্রা শুরু অনুষ্ঠানে নানকার বিদ্রোহে শহীদ বজ্রনাথ দাসের পুত্র বরদা প্রসাদ দাস, শহীদ পবিত্র দাসের পুত্রবধু বাণী বালা দাস এবং নানকার বিদ্রোহ সংগঠক পরিবারের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এ উপলক্ষে স্থানীয় নন্দকিশোর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের চিত্রাঙ্কন, কুইজ প্রতিযোগিতা,আলোচনা সভা,পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়াও শিশুদের মধ্যে শিক্ষা-উপকরণ বিতরণ করা হয়। উদ্বোধন পরবর্তী আলোচনায় নন্দকিশোর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রনথ চন্দ্র শীলের সভাপতিত্বে ও শিক্ষক মিন্টু দাসের পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন নানকার বিদ্রোহ স্মৃতি পাঠাগারের সদস্য গোপাল দাস, সপ্তর্ষি দাস, নানাকার আন্দোলনের শহীদ পরিবারের সদস্য বাণী বালা দাস।
প্রসঙ্গত ১৯৩৭ সালের ঘৃণ্য নানকার প্রথা রদ ও জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সানেশ্বর উলুউরি গ্রামের সুনাই নদীর তীরে পাকিস্থান ইপিআরের ছোড়া গুলিতে প্রাণ দেন ব্রজনাথ দাস (৫০), কুটুমনি দাস (৪৭), প্রসন্ন কুমার দাস (৫০), পবিত্র কুমার দাস (৪৫) ও অমুল্য কুমার দাস (১৭) নামের পাঁচজন কৃষক। উর্দু-ফার্সি শব্দ নান-এর বাংলা প্রতি শব্দ রুটি। আর রুটি বা ভাতের বিনিময়ে যারা কাজ করতেন তাদেরকে বলা হতো নানকার প্রজা। তাই নানকার আন্দোলন নামেই এটি দেশবাসীর কাছে পরিচিত।
এর প্রায় ১৫ দিন আগে সানেশ্বরে সুনাই নদীর বুকে জমিদারের লাঠিয়ালদের হাতে শহিদ হন রজনী দাস। এ নিয়ে নানকার আন্দোলনে মোট শহিদের সংখ্যা হয় ছয়জন। তাদের এই আত্মত্যাগের ফলেই ১৯৫০ সালে তৎকালীন পাকিস্থান সরকার জমিদারি ব্যবস্থা বাতিল ও নানকার প্রথা রদ করে কৃষকদের জমির মালিকানার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। তাই বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাসে, বিশেষ করে অধিকারহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে সকল গৌরবান্বিত আন্দোলন বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কৃষক বিদ্রোহ বা নানকার আন্দোলন। বৃটিশ আমলে সামন্তবাদী ব্যবস্থার সবচেয়ে নিকৃষ্ট শোষণ পদ্ধতি ছিল এই নানকার প্রথা। নানকার প্রজারা জমিদারের দেয়া বাড়ি ও সামান্য কৃষি জমি ভোগ করতেন, কিন্তু ওই জমি বা বাড়ির উপর তাদের মালিকানা ছিল না। তারা বিনা মজুরিতে জমিদার বাড়িতে বেগার খাটতো। চুন থেকে পান খসলেই তাদের উপর চলতো অমানুষিক নির্যাতন।
নানকার আন্দোলনের সংগঠক কমরেড অজয় ভট্টচার্যের দেয়া তথ্যমতে, সে সময় বৃহত্তর সিলেটের ৩০ লাখ জনসংখ্যার ১০ ভাগ ছিল নানকার এবং নানকার প্রথা মূলত বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ বৃহত্তর সিলেট জেলায় চালু ছিল। ১৯২২ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির সহযোগিতায় বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া, বালাগঞ্জ, ধর্মপাশা থানায় নানকার আন্দোলন গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিক নানকার বিদ্রোহের সুতিকাগার ছিল বিয়ানীবাজার উপজেলা। সামন্তবাদী শোষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিয়ানীবাজার অঞ্চলের নানকার কৃষকরা সর্বপ্রথম বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।