Sylhet Today 24 PRINT

এখনো বেদখলে নগরীর ৬১.৫ কিলোমিটার ছড়া

২৩৬ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েও ছড়া-খাল উদ্ধার করতে পারছে না সিসিক

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ০১ এপ্রিল, ২০১৮

সিলেট নগরীর ছড়া খাল উদ্ধারে এক পর প্রকল্প নিয়েও এগুলো দখলমুক্ত করতে পারছে না সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ছড়া-খাল দখলমুক্ত করতে ২৩৬.৪০ কোটি টাকার বৃহৎ একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। তবে দুই বছর মেয়াদী এই প্রকল্পেও এখন পর্যন্ত আশানুরূপ সাফল্য মিলেনি। নগরীর ৭৩ কিলোমিটার ছড়ার মধ্যে এখনো বেদখলে আছে ৬১.৫ কিলোমিটার।

সিসিক কর্তৃপক্ষ বলছে, ছড়ার দখলদাররা প্রভাবশালী হওয়ায় ও উচ্ছেদ অভিযানে সরকারের অন্যনান্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগীতা না পাওয়ায় উদ্ধার অভিযানে গতি মিলছে না। এছাড়া সিটি করপোরেশনের অনেক কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধের দখলদারদের পক্ষাবলম্বনের অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ছড়া-খাল দখলদারদের একটি তালিকা করা হয়েছে। এতে ২৬৮ জনকে দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দখলদারদের বেশিরভাগই প্রভাবশালী। এছাড়া কয়েকটি সরকারী  প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ছড়া-খাল দখল করে এরা গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন। অনেকে পরিবর্তন করে ফেলেছেন ছড়ার গতি।

সিসিক সূত্রে জানা যায়, সিলেট নগরীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে ছোট বড় প্রায় ২৫ টি প্রাকৃতিক খাল। যা ছড়া নামে পরিচিত। পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ছড়াগুলো গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে। এই ছড়া দিয়েই বর্ষায় পানি নিষ্কাশন হতো। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো না।  দুই তিন দশক আগেও এসব ছড়া দিয়ে নৌকা চলাচল করত। তবে এখন অনেক স্থানে এসব ছড়ার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। ছড়াগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই নগরজুড়ে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা।

সিলেট নগরীর অন্যতম সমস্যা সমাধানে ২০০৯ সালে নগরীর ছড়াগুলো উদ্ধারে ১১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সিলেট সিটি করপোরেশন। এরপর ২০১৩ সালে একই লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয় ২০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প। কেনা হয় আধুনিক যন্ত্রপাতি।

এই দুই প্রকল্পের যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। ছড়া উদ্ধারে দুটি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরও নগরবাসী তেমন সুবিধা পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এঅবস্থায় নগরীর ছড়া খাল উদ্ধারে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে নেওয়া হয় ২৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার মেঘা প্রকল্প। প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়েও সন্তুষ্ট নয় নগরবাসী।

দখলদারদের উচ্ছেদ করতে না পারায় অনেকটাই থমকে আছে এ প্রকল্পের কাজ। এদিকে, ছড়া-খাল উদ্ধারে স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদামতো সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহায়তা চেয়েও চিঠি পাঠিয়েছে সিসিক।
সিসিক সূত্র জানায়. ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সিটি কর্পোরেশনের ১৩টি বড় ছড়া-খালের দু’পাশ দখল করে রেখেছে অবৈধ দখলদাররা। ৩০ ফুট প্রস্থের খাল এখন কোথাও কোথাও ৩ কিংবা ৪ ফুটে পরিণত হয়েছে। কোথাও আবার খালের গতিপথ পরিবর্তন করে গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসিক ভবন। ৭৩ কিলোমিটারের মধ্যে নকশা অনুযায়ী এ পর্যন্ত মাত্র ১১.৫ কিলোমিটার সংরক্ষণ করে দুই পাশে গার্ড ওয়াল তৈরির কাজ হয়েছে।

সর্বশেষ গত ১১ মার্চ নগরীর গাভিয়াল খালে উচ্ছেদ অভিযান চালায় সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এই নিয়ে অন্তত সাতবার এই খালে অভিযান চালিয়েছেন আরিফুল হক চৌধুরী। তবে কুয়ারপাড় হয়ে শেখঘাট, বাঘবাড়ি, কানিশাইল, শামীমাবাদ হয়ে সুরমা নদীতে মেশা এই ছড়ার দুই উৎসমুখ এষনও দখলমুক্ত করা যায়নি। ফলে ছড়াটির মাঝখানে কিছুদিন পরপর উচ্ছেদ অভিযান চাললেও উৎসমুখ বেদখলে থাকায় পানি নিষ্কাষনে প্রতিবন্ধকতা দূর হচ্ছে না।
 
সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, গাভীয়ারখালসহ বিভিন্ন ছড়া উভয়পাশে দখল ও গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। ছড়া-খালের মালিক জেলা প্রশাসন। কিন্তু উচ্ছেদ করতে হচ্ছে সিলেট সিটি কর্পোরেশনকে। জেলা প্রশাসনের তেমন সহযোগিতাও মিলছে না। ফলে সিসিক উদ্ধার অভিযান চালালেও সাফল্য মিলছে না।

তিনি বলেন, ছড়ার গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। মেয়রের নির্দেশে জেলা প্রশাসনের আইন কর্মকর্তাকে করণীয় জানাতে চিঠি দেয়া হয়েছে। তাদের নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত নকশা অনুযায়ী উদ্ধার অভিযান চালানো যাচ্ছে না।

তবে অসহযোগীতার বিষয়টি অস্বীকার করে সিলেটের জেলা প্রশাসক নুমেরী জামান বলেন, প্রায় ১৫ দিন হলো আমি এখানে যোগ দিয়েছি। ছড়া উদ্ধারের বিষয় নিয়ে আমার কাছে কেউ এখন পর্যন্ত আসেনি। লিখিতভাবে এখন পর্যন্ত কোনো সহযোগীতাও চাওয়া হয়নি। ফলে অসহযোগীতার অভিযোগ সঠিক নয়।

সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান আরো বলেন, নকশা অনুযায়ী কোথাও ছড়ার পূর্ণ অস্তিত্ব নেই। নকশা মেনে ছড়া সংরক্ষণ করতে হলে উচ্ছেদ করতে হবে প্রায় হাজারখানেক স্থাপনা। এটা কোনোভাবেই সিটি কর্পোরেশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়।

সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিস্ট একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, সিসিকের কয়েকজন প্রভাবশালী কাউন্সিলরও ছড়া উদ্ধার কার্যক্রমে সহযোগীতা করছেন না। কখনো কখনো উচ্চেদ কার্যক্রমে বাধা দিচ্ছে তারা।

এ প্রসঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন,  নগরীর ছড়া-খাল কাউকে দখল করতে দেয়া হবে না। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কেউ বাধা দিলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। মেয়র অভিযোগ করে বলেন, সামনে সিসিক নির্বাচন। ওই নির্বাচনে আমাকে বিপাকে ফেলতে ছড়া-খালে কৃত্রিমভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে, যাতে নগরীতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ছড়া খাল উদ্ধারে আগেও একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও নগরবাসী তার খুব একটা সুফল পায়নি। প্রকল্পের বাস্তাবায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রকল্পের ব্যাপারে সিটি করপোরেশনও তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেনি। প্রকল্পের অধীনে কি কি কাজ হয়েছে, কতটুকু হয়েছে তা জনগনকে জানানো হয়নি।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.