নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৪ এপ্রিল, ২০১৮
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বিস্তৃর্ণ এলাকাজুড়ে নলুয়ার হাওর। বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্তের সাধনক্ষেত্র এই হাওরের বুকে এখন হলদে সবুজের সমারোহ। সবুজ ধান পেকে হলদে রং ধারণ করেছে। রং লেগেছে হাওড়ের কৃষকের মনেও। এই রং উৎসবের, আনন্দের।
গত মৌসুমের বন্যায় কেড়ে নিয়ে হাওরের সব বোরো ধান। স্বর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন কৃষক। এবারও হাওরের বাঁধ নিয়ে নানা শঙ্কা দেখা দিয়েছিলো। সঠিক সময়ে বাঁধ নির্মান কাজ শুরু না হওয়ায় এই শঙ্কা আরও জোড়ালো হয়েছিলো। তবে সব শঙ্কা কাটিয়ে এবার নতুন স্বপ্নে বিভোর হাওরের কৃষক। প্রকৃতির আনুকুল্যে হাওরে এবার ফসল হয়েছে ভালো। এবছর রেকর্ড উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। আর কৃষকদের আশা গত মৌসুমের ক্ষতি পুষিয়ে এবার গোলা ভরে উঠবে ধানে।
ইতোমধ্যে হাওরের অনেক উপজেলায় ধান কাটা শুরু হয়েছে। আরও সপ্তাহখানেক পর পূর্ণউদ্যোমে ধান কাটা শুরু হবে। তবে শ্রমিক সঙ্কটের কারণে ধান কাটা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া ব্লাস্টের সংক্রমনেও কিছু এলাকায় উৎপাদন কমার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তবে এসব সমস্যা সত্ত্বেও এবার গত দশবছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফসল উৎপাদন হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সুনামগঞ্জের উপ পরিচাপলক স্বপন কুমার সাহা বলেন, এ বছর সুনামগঞ্জের ২ লক্ষ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এবছর প্রায় ১৩ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি আমরা। এওখন পর্যন্ত যে অবস্থা তাতে আশা করছি এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন হবে। এমনটি হলে এবচল গত ১০ বছরের চেয়ে বেশি উৎপাদন হবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি হাওরেই এবার প্রচুর ফলন হয়েছে। যেখানে আগের বছরগুলোতে তেমন ধান হতোই না, সেসব এলাকায়ও এবার ভালো ফলন হয়েছে।
ভালো ফলনের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, গত মৌসুমে দীর্ঘ বন্যার কারণে পলি জমে মাটির উবর্রতা বেড়েছে। গত বছররের বন্যার পর থেকে কৃষি পুণবার্সন প্রকল্পের আওতায় হাওড়ের কৃষকদের প্রচুর পরিমান সার ও উন্নতজাতের বীজ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া টানা কয়েকবছর পর এবার প্রকৃতিও ছিলো অনুকুলে। যথেষ্ট পরিমান বৃষ্টি হয়েছে কিন্তু বন্যা হয়নি।
নলুয়ার হাওরের কৃষক সুলতান মিয়া। বন্যার কারণে গত বছর একটি ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। খেয়ে না খেয়ে কেটেছে পুরো বছর। সরকারি সয়াহতা আর ধারকর্য করে এবারও ছাষাবাদ করেছিলেন। তবে এবারের মাঠের ফসল দেখে টানা একবছরের দুঃখ ভুলে গেছেন সুলতান মিয়া। তিনি বলেন, গত বছর হাওরের ফসলহানির কারনে এক ছটাক ধানও পাইনি। সম্পূর্ণ ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ি। এ বছর ৫০ কেদার জমিতে চাষাবাদ করি। এবার ফলন খুব ভালো হয়েছে। ইতোমধো ধান কাটা শুরু করেছি। বুধবার পর্যন্ত ১২ কেদার জমির ধান কাটা শেষ করেছেন বলে জানান তিনি।
উপজেলার মইয়ার হাওরের কৃষক ভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা আফসর মিয়াও ধান কাটা শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ৫০ কেদারা জমিতে ফলন করেছি। গত দুইদিন ধরে শ্রমিকরা পাকা ধান কাটছেন। এবার ফলন ভাল হওয়ায় গত বছরের ফসলহানির দূর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শওকত ওসমান মজুমদার বলেন, এবছর উপজেলার ছোট বড় ১৫টি হাওড়ে ২২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ফসল আবাদ করা হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু হাওড়ে কৃষকরা ধান কাটা শুরু করেছেন। এখনও উপজেলার বিভিন্ন হাওড়ের ফসল কাচাঁ আধা পাকা রয়েছে। আরো দুই এক দিন পর পূর্ণোদ্যোমে ধান কাটা শুরু হবে।
ছাতক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কেএম বদরুল হক বলেন, চলতি মৌসুমে বোরোর ফলন ভাল হয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে কৃষকদের। এক বিঘা জমি চাষাবাদের জন্য কৃষি পুনর্বাসনের আওতায় উপজেলার ১৮ হাজার ৭৬৬ জন কৃষককে বীজ, সার ও নগদ ১হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে। এবছর হাওড়ে ১৩হাজার ৭৯৮ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, এখন পর্যন্ত আগাম জাতের ধানগুলো কাটা হচ্ছে। সপ্তাহখানেক পর থেকে সব ধান কাটা শুরু হবে। সুনামগঞ্জের ছাতক, জগন্নাথপুর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুরসহ কয়েকটি এলাকায় আগাম জাতের ধান কাটা চলছে। তবে ছত্রাকজনিত ব্লাস্ট রোগের সংক্রামণের কারণে কিছু এলাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
তাহিরপুরের বাদাঘাট এলাকার কৃষক মকদ্দস আলী বলেন, ব্লাস্টের কারণে ধানের শীষ শুকিয়ে চিটা হয়ে যাচ্ছে। ধান পাকার আগেই গাছ মরে যাচ্ছে।
কিছু এলাকায় ব্লাস্টের প্রকোপ থাকলেও তা খুব বেশি নয় বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের উপ পরিচালক স্বপন কুমার বর্মন। তিনি বলেন, সবমিলিয়ে ৭০ হেক্টও জমিতে ব্লাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে এমনটি হতে পারে। তবে এতে উৎপাদনে খুব একটা প্রভাব পড়বে না।
শ্রমিক সঙ্কটের কারণেও হাওড়ে ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে। জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওড়ের কৃষক আজিম উদ্দিন বলেন, প্রতি বছর বৈশাখ মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে ধান কাটার শ্রমিকরা আসেন। এবার তারা খুব একটা আসেননি। ফলে শ্রমিক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এতে হাওড়ে পাকা ধান থাকলেও তা কেটে বাড়িতে আনা সম্ভব হচ্ছে না। দৈনিক ৫ থেকে ৬শ টাকা মজুরী দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
উল্লেখ্য, গত মৌসুমে হাওড়ের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মানে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে গত মার্চ-এপ্রিলের অকাল বন্যায় বাঁধ ভেঙ্গে তলিয়ে যায় বিস্তৃর্ণ বোরো ফসল। সরকারী হিসেবে, ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ১৫৪ হাওড়ের ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমির বোরো ফসল তলিয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১ লাখ ৬১ হাজার হেক্টর জমির ফসল। তবে কৃষকদের হিসাবে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ ছিল।
এবছর কিছুটা বিলম্ব হলেও ইতোমধ্যে সকল বাঁধ নির্মান কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এবছর ৯৮৭টি পিআইসি’র মাধ্যমে হাওড়ে বাঁধের কাজ করা হয়েছে।