নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৯ এপ্রিল, ২০১৮
একেককটা গাড়ির দাম কোটি টাকার উপরে। কারনেট সুবিধায় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে দেশে নিয়ে আসা হয়েছিলো এসব গাড়ি। শখের এসব বিলাসবহুল গাড়ি এখন পড়ে আছে অবহেলায়। খোলা আকাশের নিচে।
অযত্নে পড়ে থাকায় কোন কোন গাড়িতে জং ধরে একেবারে নষ্ট হওয়ার পথে। আবার কোন কোন গাড়ির বডি আছে কিন্তু খসে পড়েছে যন্ত্রাংশ। এসব গাড়ির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা থাকায় কোন সুরাহা হচ্ছে না। আর এ কারনে পড়ে আছে থানা কম্পটাউন্ডে নতুবা সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে।
সিলেট কোতোয়ালি থানা কম্পাউন্ডে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায় বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল গাড়ি ফেলে রাখা হয়েছে। বিলাসবহুল এসব গাড়ি দিনের পর দিন পড়ে আছে থানা কম্পাউন্ডে। গাড়িগুলোতে লতাপাতা এমনভাবে ঘিরে ধরেছে দেখলে মনে হবে ছোটোখাটো কোন জঙ্গল। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষের পাশে ও কোতোয়ালি থানার সহকারি পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের সামনে দেখা যায় কোটি কোটি টাকা মূল্যের এসব গাড়ি পড়ে আছে। লেক্স্রাস, প্রাডো, পাজেরো জিপ থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক অনেক গাড়ির দেখা মেলে। প্রতিটি গাড়ি রাখা হয়েছে খোলা আকাশের নিচে।
জানা যায়, গত ১০ বছরে সিলেটে বেশ কিছু গাড়ি আটক করে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী। এসব গাড়ি আটকের পর পরই থানায় নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পর মামলাও হয়। আর মামলার পর পরই এসব গাড়ির ঠিকানা হয় সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর খোলা কম্পাউন্ডে। আর খোলা আকাশের নিচে গাড়ি থাকার কারনে এসব গাড়ি অনেকটা নষ্ট হয়ে পড়েছে। আর কিছুদিন এসব গাড়ি খোলা আকাশের নিচে থাকলে নিলামে কিনবে না বলে অনেকেই জানিয়েছেন।
২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর সিলেটের বিয়ানীবাজারের সুতারকান্দি শুল্ক স্টেশন দিয়ে অবৈধভাবে নিয়ে আসা হয় বিলাসবহুল দুটি পাজেরো গাড়ি। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দুই কোটি টাকা মূল্যের ওই দুটি গাড়ি বিজিবির বাধা উপেক্ষা করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিন ব্রিটিশ নাগরিক ভারত থেকে এদেশে নিয়ে আসেন। পরে পুলিশ ওই রাতেই নগরী থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় গাড়ি দুটি উদ্ধার করে। থানার সামনে খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে গাড়ি দুটি। ফলে চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। পুলিশি তদন্তে ব্রিটিশ নাগরিক কাবুল মিয়া, আসকির আলী ও অন্তর আলী জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ পায়। মামলা থাকায় গাড়ির বিষয়ে কোনো ফয়সালা হচ্ছেনা বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।
সিলেট জেলার বিভিন্ন থানা ছাড়া শুধু কোতোয়ালী ও পুলিশ লাইন মাঠে শতাধিক গাড়ি পড়ে আছে বছরের পর বছর ধরে। ১০/১২ বছর আগে আটক করা এমন গাড়িও আছে। এসব গাড়িতে লতাপাতা গজিয়েছে। অধিকাংশ গাড়ি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এমনও গাড়ি রয়েছে যার ভেতর-বাইরে লতাপাতা বাসা বেধেছে। কোন কোন গাড়ির যন্ত্রাংশ অনেকটা ক্ষয়ে গেছে। গাড়ির কোথাও কোথা যন্ত্রাংশ খসে পড়ছে।
এ ব্যপারে সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আব্দুল ওয়াহাব মিয়া জানান, অনেক যানবাহন আলামত হিসেবে জব্দ আছে। কিছু গাড়ি আছে মালিক নেই কিংবা মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে।
মোগলাবাজার থানায় আটক হওয়া গাড়ি নিলাম করার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানান।
চোরাই মালামাল পরিবহনসহ নানা কারনে বন বিভাগ গত ১০ বছরে শতাধিক যানবাহন আটক করে। এরমধ্যে স্পিডবোটও রয়েছে। সিলেটের বিভিন্ন উপজেলা থেকে বনবিভাগের লোকজন এসব গাড়ি আটক করে। বনবিভাগের সামনে গিয়ে দেখা যায় বেশ কিছু গাড়ি। এসব গাড়ির বিরুদ্ধে সিলেট মেট্রোপলিটন ও চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা চলছে। কোন কোন গাড়ি এক যুগ ধরে আছে বলে জানা গেছে।
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আরএসএম মুনিরুল ইসলাম জানান, বন থেকে গাছ ও কাঠ পরিবহনের সময় এসব গাড়ি জব্দ করা হয়। গাড়িগুলোর মামলা আদালতে বিচারাধীন থাকায় ফেরত কিংবা নিলাম সম্ভব হচ্ছে না।
২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল শুল্ক গোয়েন্দা কার্যালয়ে একটি চিঠি দিয়ে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি একটি লেক্সাস গাড়ি রেখে যান। ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ২০১১ সালে কার্নেট ডি প্যাসেজ সুবিধার আওতায় গাড়িটি এক বছর মেয়াদের জন্য সিলেটে নিয়ে এসেছিলাম। পরবর্তী সময়ে এ সুযোগ আর বৃদ্ধি করতে পারিনি। এমনকি ট্যাক্স পরিশোধের সক্ষমতা না থাকায় গাড়িটিও আর ব্যবহার করিনি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে গাড়িটি শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কাছে হস্তান্তর করলাম। চিঠিতে তিনি কোনো হয়রানির শিকার না হওয়ার আবেদন করেন।
এর আগে নগরীর আম্বরখানা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় তিন কোটি টাকা মূল্যের একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এভাবে গত তিন বছরে সিলেটে বেশ কয়েকটি গাড়ি আটক করা হয়। এসব গাড়ির মালিকদের খোঁজে রয়েছেন গোয়েন্দারা। মামলার পর কোন কোন গাড়ি আলামত হিসাবে সিলেটের বিভিন্ন দফতরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে।