Sylhet Today 24 PRINT

নির্ঘুম শ্রমিকের ঘামে পরিচ্ছন্ন নগর

শাকিলা ববি |  ০১ মে, ২০১৮

নগরবাসী যখন গভীর ঘুমে, তখন একদল শ্রমিক নগরী পরিস্কারে কাটান নির্ঘুম রাত। সারা দিনে নগরীর বিভিন্ন সড়কে ফেলা রাখা ময়লা আবর্জনা পরিস্কার করেই কাটে এই পরিচ্ছন্নতা শ্রমিকদের রাত। প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠেই নাগরিকরা যে সুন্দর ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন রাস্তা ব্যবহার করেন, সেই সুন্দর ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন রাস্তার পেছনের কারিগরদের কথা বলছি।

সিলেট নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হাতে ঝাড়– ও ককশিটের বক্সে দড়ি বেঁধে হেঁটে-হেঁটে সড়ক ঝাড়ু দিচ্ছেন। ময়লাগুলো ককশিটের বক্সে তুলে নিয়ে ফেলছেন আবর্জনা বহনকারী গাড়িতে। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে নগরীর বিভিন্ন সড়কে দেখা মেলে সিলেট সিটি কর্পোরেশন এর এক ঝাঁক পরিচ্ছন্ন শ্রমিকের। তারাই প্রতিদিন রাত ১১ টা থেকে ভোর পর্যন্ত পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করে সবাইকে উপহার দিচ্ছেন পরিচ্ছন্ন নগরী।

রাত সাড়ে বারোটা। নগরীর ব্যস্ততম এলাকা জিন্দাবাজারে নেই মানুষের ঢল। ঝাড়– হাতে কাজ করছেন পরিচ্ছন্নতা শ্রমিক বাপ্পারাজ। প্রায় ৭ বছর যাবত তিনি এই পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন। মুখে মাস্ক হাতে গ্লাভস পরে ঝটপট সেরে ফেলছেন আবর্জনা পরিস্কারের কাজ।

বাপ্পারাজ বলেন, ‘এই ময়লার মধ্যেই আমাদের রুটি-রুজি। আমরা এই অপরিচ্ছন্ন কাজ করি আমাদের পরিবারের সদস্যদের পরিচ্ছন্ন জীবন দেয়ার জন্য। কিন্তু এই কম বেতনে পরিবার নিয়ে চলা অনেক কষ্টকর। তারপরও এই কাজ করছি জীবিকার তাগিদে।

আজ মহান মে দিবস। মাঠে-ঘাটে, কলকারখানায়, সর্বত্র খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে গৌরবময় ইতিহাস সৃষ্টির দিন। শ্রমিকরা বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ১৮৮৬ সালের এদিন ঝরিয়েছিলেন তাদের বুকের তাজা রক্ত।

সিলেট নগরী পরিচ্ছন্নতার জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৫৪৩ জন শ্রমিক নিয়োজিত আছেন পরিচ্ছন্নতার কাজে। দৈনিক ৩০০ টাকা করে মজুরি মাস্টাররোলে কাজ করেন তারা। রাস্তার ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করতে গিয়ে নিজেরাই প্রতিনিয়ত পরছেন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। প্রায় প্রতিদিনই কোননাকোন রোগে আক্রান্ত হন তারা। ঘরের স্বাভাবিক খরচের সাথে প্রতিদিনই অতিরিক্ত যোগ করতে হয় ঔষধের খরচ।

পরিচ্ছন্নতা শ্রমিক মনির হোসেন বলেন, ‘সারা রাত এই ময়লা ওঠানোর কাজ করি। এই দুর্গন্ধ ময়লা আবর্জনায় কাজ আমি মেনে নিয়েছি ঠিকই কিন্তু আমার শরীর ত আর এই জুলুম সহ্য করে না।’ একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলেন,‘ মাস শেষে যে টাকা পাই তা দিয়ে সংসার চালানো দায়। তার উপর এই মরার শরীরে রোগের শেষ নেই। শরীরে রোগ বাড়ে, চাল ডালের দাম বাড়ে কিন্তু আমাদের বেতন ত বাড়ে না।’

সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মো. হানিফুর রহমান বলেন, ‘ভোর ৫টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত সিলেট মহানগরের রূপ থাকে পরিচ্ছন্ন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে হারিয়ে যেতে থাকে নগরীর এই রূপ-লাবণ্য। আমরা যারা এই নগরীর বাসিন্দা তাদের একটু সচেতনতাই পারে নগরীর সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী করতে।’

পরিচ্ছন্নতা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় আমরা পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সচেতনতামূলক ব্রিফ দিয়ে থাকি। তারা যেন নিরাপদে ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করতে পারেন এই জন্য তাদেরকে মাস্ক, গামবোট, গ্লাভস সহ বিভিন্ন সেফটি সামগ্রী দেয়া হয়।’

তিনি বলেন, এই সিলেট নগরীর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এত সহজ কাজ না। সচেতন জনগণ, ওয়ার্ড কাউন্সিলারবৃন্দ ও একঝাঁক পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আমরা পাই এই সুন্দর পরিচ্ছন্ন নগরী। আপনারা যেখানে রাস্তার পাশে ময়লা দেখে মুখে কাপড় দিয়ে চলে যান, সেখানে ওই পরিচ্ছন্নতা শ্রমিকরাই হাত দিয়ে সেই ময়লা পরিষ্কার করে। তাই এই পরিচ্ছন্নতা শ্রমিকদের কষ্টের কথা চিন্তা করে হলেও আপনার একটু সচেতন হোন। আপনার যদি যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলেন তাহলে এই পরিচ্ছন্নতা শ্রমিকদের কষ্ট অনেক কমে যাবে।’

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.