Sylhet Today 24 PRINT

বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করায় রহিমপুর ইউপি চেয়ারম্যানকে সম্মাননা

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি |  ০২ মে, ২০১৮

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের দেওড়াছড়া বধ্যভূমি সংরক্ষণ করে সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করায় রহিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ বদরুলকে সম্মাননা প্রদান করেছে মৌলভীবাজার মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র প্রদর্শন পরিষদ।

সোমবার (৩০ এপ্রিল) বিকেলে শ্রীমঙ্গল গ্র্যান্ড সেলিম অডিটোরিয়ামে সাংবাদিক বিকুল চক্রবর্তীর সংগৃহীত মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র ও স্মারক প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এ সম্মাননা তুলে দেন বিজিবি শ্রীমঙ্গল সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. জাহিদ হোসেন।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রাক্তন কমান্ডার কুমদ রঞ্জন দেব, মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক ফোরকান উদ্দিন, ডা. হরিপদ রায়, লে. কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেন প্রমুখ।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের দেওড়াছড়া চা বাগানে প্রবেশ করে পাকিস্তানী সেনা সদস্যরা অসহায় গরীব চা শ্রমিকদেরকে রেশন দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সবাইকে জমা করে। পরে সাথে করে নিয়ে আসা একটি বেসামরিক বাসে শ্রমিকদের উঠতে নির্দেশ দেয়া হয়। প্রায় ৭০ জন শ্রমিককে বাসে ভর্তি করে মৌলভীবাজার শহরের দিকে যাত্রা শুরু করে। সেদিন বাসটি একটু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরই একটি খাদে পড়ে যায়। শ্রমিকদের তখন বাধ্য করা হয় বাসটি টেনে তুলতে। সে সময় ঘটনাস্থলেই আরেক পাকিস্তানী মেজরের নির্দেশে চা বাগানের কয়েকটি টিলার পাদদেশে নিচু জায়গায় সবাইকে বিবস্ত্র করে তাদের পরিধেয় বস্ত্র দিয়ে হাত পা বেঁধে ফেলা হয়। তারপর শুরু করে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ। গুলিতে শহীদ হন উমেশ সবর, হেমলাল কর্মকার, লক্ষনমূড়া, বিজয় ভূমিক, আকুল রায় ঘাটুয়ার, মাহীলাল রায় ঘাটুয়ার, বিনোদ নায়েক, সুনারাম গোয়ালা, প্রহ্লাদ নায়েক, মংরু বড়াইক, বিশ্বনাথ ভুঁইয়া, শাহজাহান ভুইয়া, ভাদো ভুইয়া, আগুন ভুইয়া, জহন গোয়ালা সহ ৫৭ জন নিরীহ শ্রমিক। তবে সেদিন মোহিনী গোয়ালা, রবি গোয়ালা, মহেশ কানু, নারাইল কুর্মী সহ ১২ জন সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান। আহত অবস্থায় ভারতে গিয়ে তারা চিকিৎসা করান। তাদের কাছ থেকেই জানা যায় এই নির্মম হত্যকান্ডের খবর।

তারা জানান, পাকিস্তানি আর্মির সাথে এ ঘটনায় স্থানীয় দালালরা সক্রিয় ছিল। এই দালালরা সেদিন শ্রমিকদের বাড়িঘরে লুটপাট চালায়। তাদের দ্বারা চা শ্রমিক নারীরাও নির্যাতনের স্বীকার হন।

দেওড়াছড়া চা বাগানের এই স্থানটি সরকার কিংবা চা বাগান কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘদিনেও কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় স্থানটি অরক্ষিত হয়ে পড়েছিলো। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় এই স্থানটি সংরক্ষণ করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহকারীদের পক্ষ থেকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ বদরুলকে অনুরোধ জানালে ২০১০ সালে তিনি প্রথমে মাটি দিয়ে পরে ২০১৪ সালে ডিসেম্বর মাসে নিজের, সরকারি অনুদান ও দেওড়াছড়া চা বাগান কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় সেখানে একটি ইট-সিমেন্টের স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেন।

আলাপকালে রহিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ বদরুল জানান, স্মৃতিস্তম্ভটির নকশা তিনি নিজেই করেছেন। এ স্মৃতিস্তম্ভে তিনি তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে করেছেন। এর মধ্যে গোল অংশটি বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের প্রতিক, বা পাশে ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসের প্রতীক ও ডান পাশে ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের প্রতীক। এটি স্থাপন করার পর থেকে ওই এলাকার মানুষ প্রতিটি দিবসে সেখানে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

ইফতেখার আহমেদ বদরুল এই মহতি উদ্যোগ নেয়ায় তাকে এই সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র প্রদর্শন পরিষদ থেকে তার কাছে অনুরোধ রাখা হয় দেওড়াছড়া স্মৃতিস্তম্ভের পাশে শহীদদের নামের একটি তালিকা ও রাস্তার পাশে বধ্যভুমির একটি সাইনবোর্ড স্থাপন এবং তাঁর ইউনিয়নের চৈত্রঘাট বধ্যভুমিটি যেন তিনি সংরক্ষণ করেন ।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.