মৌলভীবাজার প্রতিনিধি | ০৬ জুন, ২০১৮
নীতিমালার তোয়াক্কা না করে মৌলভীবাজারের আবাসিক এলাকার আশপাশ ও কৃষিজমিতে যত্রতত্র গড়ে তোলা হচ্ছে ইটভাটা। এতে কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে বিপর্যস্ত হচ্ছে এলাকার পরিবেশ। এছাড়া ইট তৈরিতে জমির উপরিভাগের (টপ সয়েল) মাটি ব্যবহার করায় দিন দিন কমছে ফসল উৎপাদন ক্ষমতা। ফসলি জমির পাশে এমনকি স্কুল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অনেক ইটভাটা। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চললেও তা বন্ধে সংশ্লিষ্টদের কোনও তৎপরতা নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে মৌলভীবাজারে একের পর এক ইটভাটা গড়ে উঠেছে। যদিও ইট পুড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাহাড়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং লোকালয় থেকে ৩ কি.মি. দূরত্বের মধ্যে কোনো ইটভাটা নির্মাণ করা যাবে না বলে নির্দেশ থাকলেও মানছেন না কেউই।
এছাড়াও কৃষিজমিতে ইটভাটা তৈরির আইনগত নিষেধ থাকলেও কোনও নিয়ম না মেনে কৃষিজমি, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বনাঞ্চলের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত ভাবে এসব ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ৭০টি ইটভাটার মধ্যে অর্ধেক ইটভাটায় কোনো ধরনের অনুমতি নেই। ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে কঠিন আইন থাকা সত্ত্বেও কিছুই বাস্তবায়ন হচ্ছে না। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাংলা ড্রাম চিমনির মাধ্যমে কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হয়। এমনকি কোনো ধরনের চিমনি ছাড়াও পাঁজা করেই ইট পোড়ানো হয়। বেশিরভাগ জায়গায় কৃষি জমি নষ্ট করে গড়ে উঠছে ইটভাটা। যার কারণে পার্শ্ববর্তী কৃষকরা পড়েছেন বড় বিপাকে।
এদিকে জেলার রাজনগর উপজেলার বেশীরভাগ ইটভাটা জনবসতির ২০০ হাতের ভিতরে এবং পাশেই আছে ফসলি জমি। ইটভাটার কারণে ফসলি জমিতে ফসল হচ্ছেনা, বসতবাড়ি ঢাকা পরে ছাই এবং ধুলোবালিতে।
ইটভাটার পাশেই ফসলের জমিতে কাছ করছিলেন কৃষক আব্দুল মতিন তিনি জানান, ইটভাটার কারণে ফসল হচ্ছেনা। অনেকের আবার চর্মসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিচ্ছে।
রাজনগর উপজেলার কর্নিগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে এস.কে ব্রিকস নামের ইটভাটা। এ সম্পর্কে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিমল চন্দ্র দে জানান, ইটভাটায় যে ক্ষতি হয় তা আপনি আমিসহ সব সচেতন মানুষ জানি। কিন্তু জানলে কি হবে মানতে তো হবে। আমার স্কুলের শ্রেণীকক্ষ ধুলোবালিতে একাকার হয়ে যায়।
অন্যদিকে জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় স্কুলের পাশে ইটভাটা তৈরির হিড়িক পরেছে।
সরজমিনে উপজেলায় ঘুরে দেখা যায়, উপজেলা সদরে কমলগঞ্জ বহুমুখী মডেল উচ্চবিদ্যালয় ও কমলগঞ্জ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সীমানা ঘেঁষা কৃষিজমির উপর একটি, জালালিয়া এলাকায় বেগম জেবুন্নেছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানার দুপাশ ঘেঁষে কৃষিজমির উপর একটি, লংঙ্গুর পার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অদূরে একটি ও মুন্সীবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কালিপ্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয় এবং সাজেদা বারি কিন্ডার গার্টেন স্কুলের পার্শ্ববর্তী কৃষিজমির উপর গড়ে উঠেছে বিশালাকৃতির আরও একটি ইটভাটা।
এছাড়াও উপজেলার ফসলি জমিতে রয়েছে আরো ১০টি ইটভাটা। বিদ্যালয় ঘেঁষা ইটভাটা সমূহের প্রায় ১০ সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ছাড়াও হাটবাজার, লোকালয়ের কয়েক হাজার লোক ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন, ইটভাটায় কৃষকদের ফসল বিনষ্টের একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাছাড়া ইটভাটা সমূহের কার্যক্রম বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে অনেক ইটভাটার পরিবেশের ছাড়পত্র নেই। ছাড়পত্র কেন নেই জানতে চাইলে একটি ইটভাটার ম্যানেজার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তাদের ব্যবসা করতে সমস্যা হচ্ছেনা।
এভাবেই আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভাটার মালিকরা ব্যবসা করে যাচ্ছেন পরিবেশের ক্ষতি করে।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এ (যা ১ জুলাই ২০১৪ থেকে কার্যকর) বলা হয়েছে, পরিবেশ ও জৈববৈচিত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। কৃষি জমি, পাহাড়, টিলা থেকে মাটি কেটে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতেও নিষেধ রয়েছে।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইন-২০১৩ এর ৮ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, আবাসিক, সংরক্ষিত বা বাণিজ্যিক এলাকা; কৃষি জমি, পরিবেশ বিপর্যয়, ফসলের ক্ষতি সাধন, ব্যক্তি মালিকানাধীন বাগান দখল করে কোন ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। ভাটা মালিকগণ এ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একের পর এক ইটভাটা স্থাপন করে চলেছেন।
যাদেরকে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিচ্ছে তাদের বেলায়ও মানা হচ্ছেনা আইনের বিধান। পরিবেশ অধিদপ্তরে ইটভাটার ছাড়পত্র দেয়ার ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের মতামত নেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু তারা তা কখনও নেয় না। এদিকে জেলার রাজনগর উপজেলায় কৃষি জমি নষ্ট করে ইটভাটা তৈরির প্রবণতা বেশি।
এ বিষয়ে রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌসি আক্তার জানান, ইটভাটা পরিচালনার আইন ও নীতিমালা অনেকেই মেনে ভাটা পরিচালনা করছেন না। খুব শীঘ্রই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।
জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহজাহান কৃষি জমি নষ্ট হওয়ার সত্যতা স্বীকার করে জানান, নির্দিষ্ট আইন থাকার পরেও আইন মানা হচ্ছেনা যার ফলে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। সামাজিক সচেতনতা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ একমাত্র সমাধান হতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজারের সমন্বয়ক আসম সালেহ সোহেল জানান, এ জেলায় প্রায় সত্তরটি ইটভাটা রয়েছে এদের অনেকের আইনি বৈধতা নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই, এদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসা উচিত।