নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৩ জুলাই, ২০১৮
সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের শেষসময়ে এসে ভোটার আর প্রার্থীদের ছাপিয়ে প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠেছে পুলিশ। পুলিশের কিছু ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। পুলিশ বাড়াবাড়ি করে নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করছে বলেও অভিযোগ তাঁর।
রোববার রাতে সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির সভাপতি, সম্পাদক, আরিফুল হকের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়কসহ বিএনপির ৩৯ নেতার বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে। এতে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগ আনা হয়। রোববার রাতেই জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতিসহ তিন নেতাকে বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন কিছু ভূমিকার কারণে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের নেতারাও।
তবে পুলিশের দাবি, নির্বাচন উপলক্ষে কাউকে হয়রানি বা গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের দাবি, পুলিশ এখন নির্বাচন কমিশনের অধীনে। কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন।
পুলিশের কিছু ভূমিকা আর প্রধান দুই প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে শেষ সময়ে উত্তাপ ছড়াচ্ছে সিলেট সিটি নির্বাচনে। রোববার ভোরে নগরীর টুলটিকর এলাকার কামরানের একটি নির্বাচনী কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া শনিবার রাতে সুবিদবাজার এলাকায় শিবির সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে যুবলীগ নেতা আব্দুল হান্নানের মালিকানাধীন একটি রেস্টুরেন্টে।
নির্বাচনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে পুলিশের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য নির্বাচনী পরিবেশ উত্তপ্ত করা হচ্ছে। মানুষকে ভোটবিমুখ করতেই এমনটি করা হচ্ছে। আমরা চাই উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হোক।
তবে এ ব্যাপারে মহানগর পুলিশের পক্ষে উপ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. আজবাহার আলী শেখ বলেন, পুলিশ কাউকে অযথা হয়রানি বা মামলা ছাড়া গ্রেপ্তার করছে না। যারা বিভিন্ন মামলার ওয়ারেন্ট বা এজাহারভূক্ত আসামী তাদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
এদিকে, সোমবার দুপুরে নিজের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আরিফুল হক চৌধুরী।
সিলেটে রাজনৈতিক সম্প্রীতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছুসংখ্যক পুলিশ সদস্য এই সম্প্রীতি নষ্ট করছে। তারা অতি উৎসাহি হয়ে আমাদের দলীয় নেতাকর্মী ও অনুসারীদের গ্রেপ্তার করছে ও মধ্যরাতে বাসাবাড়িতে তল্লাশির নামে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
আরিফ জানান, রোববার রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সাঈদ আহমদ, আরিফুল হকের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে রোম্মান রাজ্জাক ও ছাত্রদল নেতা এনামুল হককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তিনি নেতাকর্মীদের হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে ঢাকায় গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে প্রতিবাদ জানাব। অবস্থা এমন চলতে থাকলে আমাদের বাধ্য করা হবে রাজপথে নামতে।
সংবাদ সম্মেলনে আরিফুল হক চৌধুরী হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রতিবারই সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসন থেকে যে প্রার্থী জয় লাভ করেন তাঁর দলই সরকার গঠন করে। এ পুণ্যভূমি সিলেটে কোন প্রহসনের নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহ হয়ে প্রহসনের নির্বাচন করলে এর প্রভাব আগামী সংসদ নির্বাচনে পড়বে।
ছাত্রদলের দুই নেতা ও এক বিএনপি নেতার ছেলেকে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশাররফ হোসেন বলেন, ছাত্রদল নেতাদের বিরুদ্ধে আগের মামলা ছিলো। আর আরেকটি মামলায় বিএনপি নেতা রাজ্জাককে গ্রেপ্তারে গেলে তাঁর ছেলে পুলিশকে বাধা দেয়। তাই তাকে আটক করা হয়।
৩৯ নেতার নামে মামলা: প্রচারকাজে নিয়োজিত দুই কর্মীকে আটকের অভিযোগ এনে গত ২১ জুলাই মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (দক্ষিণ)-এর কার্যালয়ের সামনে দলবল নিয়ে বসে পড়েন আরিফুল হক চৌধুরী। প্রায় তিনঘণ্টা কার্যালয়ের সামনের সড়কে অবস্থানের পর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পুরোনো একটি মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ কার্যালয়ের সামনে অবস্থানের ঘটনায় রোববার রাতে বিএনপির ৩৯ নেতার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। নগরীর শাহপরান থানায় গোয়েন্দা পুলিশের উপ পরিদর্শক ফয়েজ আহমেদ বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন। মামলায় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাঁধা প্রদানের অভিযোগ আনা হয়।
এতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা খন্দকার মুক্তাদির আহমদ, জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, আরিফুল হকের নির্বাচন কমিটির আহ্বায়ক আব্দুল রাজ্জাক, সদস্য সচিব আলী আহমদ, মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী, সহ-সভাপতি সালেহ আহমদ খসরু, জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আজমল বখত সাদেক, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এমরান আহমদসহ ২১ জুলাই আরিফের সাথে অবস্থান নেওয়া সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির ৩৯ শীর্ষ নেতাদের আসামী করা হয়। তবে সেদিন আরিফুল হকের নেতৃত্বে অবস্থান নিলেও মামলায় তাকে অভিযুক্ত করেনি পুলিশ।
শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতার হোসেন মামলা দায়েরের তথ্য জানিয়ে বলেন, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. আজবাহার আলী শেখ বলেন, আসামীকে গ্রেপ্তার করায় পুলিশ কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখা বেআইনি ও পুলিশের কাজে বাধা। তাই মামলা হয়েছে। তবে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় আরিফুল হক চৌধুরীকে এই মামলার আসামী করা হয়নি।
এসব ব্যাপারে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, আমি এই নগরীর একজন সাধারণ নাগরিক। সরকারের কোনো অংশ নই। তাছাড়া এখন পুলিশও সরকারের নয়, নির্বাচন কমিশনের অধীনে।
তিনি বলেন, খামাখা অভিযোগ করে বিএনপিই নির্বাচনী মাঠকে উত্তপ্ত করে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে।