জাহাঙ্গীর আলম ভুঁইয়া | ০৮ জুলাই, ২০১৫
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের হাওর পাড়ের দর্জিপাড়া শেষ মুহুর্তে সরগম হয়ে উঠেছে। হাওর পাড়ের দ্বীপসদৃশ গ্রামগুলোর দর্জি পাড়ায় ও বাজারগুলোতে মেশিনের শব্দ যেন জানান দিচ্ছে ঈদ এস গেছে। ঈদের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত চলবে ব্যস্ততা। দর্জি পাড়ায় নোটিশ র্বোড টানানো হয়ে গেছে ‘অর্ডার নেওয়া হবে না’।
রমজানের শুরু থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ সদরসহ তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, বিশ্বাম্ভরপুর, দিরাই, শাল্লাসহ ১১টি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার দর্জিগণ। এ যেন ঈদ উৎসবের পালে ঝড়ো হাওয়া। সবাই যে যার দায়িত্ব নিয়ে বোতাম লাগানো, বোতামের ঘর সেলাই করা, নির্দিষ্ট লোকজনের কাপড় কাটায় ব্যস্ত দর্জি মাষ্টার, কারও গলায় ফিতা, হাতে কাঁচি, কেউ সেলাই করছে, পাশেই জমা হচ্ছে তৈরি পোশাকের স্তুপ,দম ফেলার ফুসরত নেই।
কোন অপ্রয়োজনীয় কথা নেই করো মুখে শুধু কাজ আর কাজ। সুক্ষ্মভাবে কাষ্ট মাড়ের মাপ অনুযায়ী সেলোয়ার, কামিজ, র্শাট, পেন্ট ভালভাবে সময়মত কাপড় সেলাই করে সরবরাহের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করছে প্রধান কাটিং মাষ্টার ও কর্মচারীরা।
রমজানের আগেই শুরু হওয়া এই ব্যস্ততা দিন দিন বেড়েই চলছে। এ যেন পাল তোলা নৌকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়া চিত্র। বিক্রেতারা নানা রকমের মুখরোচক কথা বলে বিক্রি করছে শেষ মুহুর্তে বিভিন্ন রং, ডিজাইনের কাপড়। লং কামিজের সঙ্গে ডোলা সালোয়ার শহরের মেয়েদের পছন্দ না থাকলেও হাওর পাড়ের মেয়েদের খুবই পছন্দ। আর কামিজ বানিয়ে নিজেই সুতা, পুঁতির কাজ করবেন বলে আগেই দর্জিবাড়ি এসেছেন অনেকেই।
আধুনিক সভ্যতার প্রভাব ও কম পড়েনি হাওরাবাসীর মাঝে তাই অনেকেই ছুটছেন গ্রামের হাট বাজার থেকে শহরের নামীদামী দোকানে নতুন ডিজাইনের আকর্ষনীয় পোশাকের খুঁজে। ঈদকে ঘিরে তাহিরপুর উপজেলার টেইলারিং হাউজগুলো এখন দিন রাত পুরো সময়ই খোলা। রাত ৮টার পর সরকারী নিয়ম দোকান বন্দ্ব হয়ে গেলেও পোশাক বানানোর কাজ চলছে মধ্য রাত পর্যন্ত আর দর্জি কারীগরদের ছুটি বন্দ্ব।
দর্জিপাড়ার দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০-২৫০ টাকার মজুরি এখন বেড়ে দাড়িয়েছে ৩০০-৩৫০ টাকার বেশী। এমনিতেই কাপড়ের দাম বেশি তার উপর আবার পোশাক বানানোর মজুরি বৃদ্ধি মরার উপর খাড়ার ঘাঁ। মরা আর বাঁচা যাই হউক ঈদ মানেই আনন্দ, নতুন কাপড়, উল্লাস তাই সব কিছুই যেন হার মানায় সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর কাছে।
নিজের পছন্দের কাপড় কিনে পোশাক বানানোর আনন্দই আলাদা দর্জির কাছে আসা লোকজনেরা জানান। তাহিরপুর বাজার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান-যারা গজের কাপড় কিনে দর্জিবাড়ির ঝামেলায় যেতে চান না তারা ছুটছেন থ্রি পিছ রেডিমেইড কাপড়ের দোকানে।
দর্জিপাড়ার মালিকগণ জানান- সারা বছর যে পরিমাণ কাজ হয় তারচেয়ে দুই ঈদে কাজের পরিমাণ বেশি। দর্জির কাজ করে জীবনে রোজা-ঈদের আনন্দ করার সময় সুযোগ থাকে না কারণ কাষ্ট মারের কাপড় ডেলিভারী দেওয়ার চিন্তায় অস্থির থাকতে হয় সারাক্ষণ। তবে ব্যস্ততা থাকলেও এটাকেই ঈদের আনন্দ মনে হয়।
তাহিরপুর বাজারের টেইলার্স সুফিয়ান মিয়া জানান- বুটিক হাউস বা যে কোন মার্কেট থেকে পোশাক কিনলে অন্যের পোশাকের সাথে মিলে যাবে। তাই অর্ডার দিয়ে নিজের চাহিদামত পোশাক তৈরি করে অনেকে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। রেডিমেইড পোশাকের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রতি মানুষের ঝোঁক থাকলেও আনরেডি কাপড় কিনে তৈরিতে ব্যস্ততার কমতি নেই দর্জি কারিগরদের।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল জানান-হাওরবেষ্টিত তাহিরপুর উপজেলার হাওরাঞ্চলের দর্জিপাড়ায় কর্মরত দর্জিগণ এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। আগে ত সবাই দর্জির উপর নির্ভরশীল ছিলাম। এখন বিভিন্ন ব্রাণ্ডের রেডিমেইড তৈরি কাপড়ের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়েছে তবুও দর্জি কারিগরা তাদের কাজের মাঝে নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।