Sylhet Today 24 PRINT

‘বন্ধু-শিক্ষক’ কর্মসূচিতে পাঠদানে শিক্ষার্থীদের গুণগত পরিবর্তন

কমলগঞ্জের ইউএনও’র এ উদ্যোগ হতে পারে রোল মডেল

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি |  ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

গতানুগতিক পদ্ধতির বাইরে পাঠদানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গুণগত পরিবর্তন আনতে বন্ধু-শিক্ষক কর্মসূচি একটি ছাত্রবান্ধব উদ্যোগ। প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে ও পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে পাঠদানের লক্ষ্যে একটি পাইলট প্রকল্প হিসাবে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকদের নিয়ে বন্ধু-শিক্ষক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

এ কার্যক্রম দেখে উৎসাহ উদ্দীপনায় এখন কমলগঞ্জের স্কুলে স্কুলে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতিটি ক্লাসের ভাল ছাত্র শিক্ষক হিসেবে অপর শিক্ষার্থীদের পড়াবে। বন্ধু-শিক্ষক কার্যক্রম প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এতে বদলে যেতে চলছে কমলগঞ্জ উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম।

বন্ধু শিক্ষক কার্যক্রম শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সচেতন মহলের মতে 'শিক্ষক যদি বন্ধু হয়, তাহলে শিক্ষা সহজ হয়ে যায়।'

কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর তেঁতইগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির ছাত্রী ঋতিষা শর্ম্মা জানায়, ‘আমার সহপাঠীরা পড়া না বুঝলে আমি বুঝিয়ে দেই। আমি না পারলে আবার অন্য সহপাঠীদের থেকে শিখি। কেউ না পারলে আমরা আবার স্যার বা ম্যাডামের কাছে গিয়ে শিখি।’ এভাবেই বন্ধু-শিক্ষক নিয়ে অভিজ্ঞতার কথা জানায় সে।

ছয় থেকে আট জন শিক্ষার্থীর একটি গ্রুপ। গ্রুপে ভালো শিক্ষার্থীকে বন্ধু-শিক্ষক বানিয়ে তদারকি করছেন শিক্ষকরা। শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কমলগঞ্জ উপজেলার দশটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান পদ্ধতিতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। চলতি বছরের শুরু থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এসব বিদ্যালয়ে ‘বন্ধু-শিক্ষক’ দ্বারা পাঠদান পদ্ধতি চালু হয়।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হকের উদ্যোগে পাঠদানের এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশুনায় আগ্রহ ও মনোনিবেশে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।

উপজেলার তেতইগাঁও, গোবর্ধ্বনপুর ও কুমড়াকাপন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে পাঠচক্র তৈরি করেছে। প্রতিটি দলে একজন করে থাকে দলনেতা। সেই হয় বন্ধু-শিক্ষক।

কুমড়াকাপন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সালেহা মাহমুদ জানান, ‘এ বছর জানুয়ারি থেকে ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের আটটি দলে ভাগ করে দলের মধ্যে ভালো আটজনকে বন্ধু শিক্ষক করে পাঠদান শুরু করি। শিক্ষার্থীরা আগে বাংলা ও ইংরেজি ভালোভাবে পড়তে পারত না। দলে বিভক্ত হওয়ার পর থেকে একে অন্যের সহায়তায় ভালো হচ্ছে।’

গোবর্দ্ধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিতা সিনহা বলেন, 'বন্ধু-শিক্ষকের এই পদ্ধতিটি একটি ভালো উদ্যোগ। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার মান বাড়ছে।'

তেঁতইগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূর উদ্দীন বলেন, 'বন্ধু-শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে দুর্বল শিক্ষার্থীদের সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে।

শ্রীসূর্য্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চম্পা রানী নাথ মনে করেন, পরিবারের আর বন্ধুবান্ধবের বাইরের কেউ যদি একজন শিক্ষার্থীর আপনজন হতে পারেন, তিনি তার শিক্ষক। যে শিক্ষকের সঙ্গে তার সম্পর্ক সবচেয়ে সুন্দর, তিনি মা-বাবার বিকল্পও হতে পারেন।

মাইজগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফেরদৌস খাঁন জানান, ‘সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কের কারিগর যে শিক্ষক, তিনি শুধু শিক্ষক নন, বন্ধুও পথ প্রদর্শক।

মঙ্গলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোশাহীদ আলী বলেন, কমলগঞ্জের শিক্ষাবান্ধব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হকের আবিষ্কার হচ্ছে বন্ধু-শিক্ষক কর্মসূচি। শিখনে সহজ ও সফল পদ্ধতি উদ্ভাবন করায় উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে তাঁকে ধন্যবাদ জানান।

হকতিয়ারখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজ্জাদুল হক স্বপন বলেন, কমলগঞ্জ ইউএনও’র শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার বন্ধু শিক্ষক পদ্ধতি, যা বাংলাদেশের রোল মডেল হবে একদিন।

সিলেট বিভাগের সাবেক শ্রেষ্ঠ এসএমসি সভাপতি ও কুমড়াকাপন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি মো. সানোয়ার হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের ভীতি কাটিয়ে বন্ধু-শিক্ষক নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে পূর্বের তুলনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখা গেছে। এই পদ্ধতি অব্যাহত থাকলে পিএসসি ও বার্ষিক পরীক্ষায় ফলাফলে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন বলেন, শিক্ষাবান্ধব উপজেলা নির্বাহী অফিসারের উদ্যোগে শিক্ষার মান উন্নয়নে ও ঝরে পড়া রোধে প্রাথমিকভাবে দশটি বিদ্যালয়ে বন্ধু-শিক্ষক চালু করা হয়েছে। এতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। এই মহতী উদ্যোগে সারা উপজেলায় ছড়িয়ে দিতে আমরা কাজ শুরু করেছি। ইতিমধ্যে একাধিক শিক্ষক সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

কমলগঞ্জে বন্ধু-শিক্ষক পদ্ধতির রুপকার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন, ঝরে পড়া রোধ ও শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে পরীক্ষামূলক ‘বন্ধু শিক্ষক’ উদ্যোগে ইতিবাচক ফলাফল দেখা দিয়েছে। এ কার্যক্রম দেখে কমলগঞ্জ উপজেলার স্কুলে স্কুলে বন্ধু-শিক্ষক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বন্ধু শিক্ষক পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমরা ৫ম শ্রেণিতে এই কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। এখন অন্যান্য ক্লাসেও শিক্ষকরা আগ্রহভরে এই কার্যক্রম চালু করছেন। যা শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত সহজ পাঠদান ও আনন্দদায়ক। এটি সর্বত্র চালু হলে বাংলাদেশের রোল মডেল হতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন হবে বলে আমার বিশ্বাস।

তিনি আরও বলেন, আমার মতে, যদি শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে ভালবাসা দিয়ে বন্ধুসুলভ আচরণের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করে, তাহলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করবে হৃদয় থেকে এবং অঙ্কুরে ঝড়ে যাবার সম্ভাবনাও কমতে থাকবে দিন দিন। আর আমাদের সন্তানরা যদি মানুষের মত মানুষ হয়, তাহলে দেশ ও জাতি উন্নতির চরম শিখায় পৌঁছাতে পারবে অতি দ্রুত।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.