Sylhet Today 24 PRINT

টার্কি মুরগী পালন করে সফল জৈন্তাপুরের মোহাম্মদ আলী

মিনহাজ উদ্দিন, গোয়াইনঘাট |  ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা সদর থেকে উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত গৌরি শংকর গ্রাম। গ্রামীণ পাকা সড়ক দিয়ে এগুতেই চোখে পড়বে পাহাড়-টিলাময় একটি কাচা সড়কও। একটু একটু করে এগোলে দেখা যাবে চারদিকে শুধু সবুজের আস্তরণ। পাহাড়ি পাথর আর কষ্টসাধ্য পথ বেয়ে উপরে ওঠে আরেকটু আগালেই দেখা মেলবে একটি বাড়ির। বাড়ি নয় যেন একটি চোখ জুড়ানো খামারের।

বাড়িটিতে প্রবেশকালে চোখে পড়বে হরেক রকমের গাছপালা আর সবুজ বৃক্ষরাজি। বাড়ির উঠান ও আশেপাশে কয়েকটি শেড থেকে বেরিয়ে আসবে কা, কুহু, কাউ, কথসহ নানা সুর। বিভিন্ন সুরের মিতালিতে মুখরিত ঘরগুলো ভরে ওঠছে একটি সফলতার গল্পগাথায়।

সফল এবং কর্মঠ একজন মানুষ সেখানে গড়ে তুলেছেন একটি টার্কি মুরগির খামার। জৈন্তাপুরের ভারতীয় সীমান্তঘেষা গ্রাম গৌরি শংকর গ্রামের সেই সফল খামারির নাম মোহাম্মদ আলী মাক্কু। জৈন্তাপুরে টার্কি মুরগি পালন করে তিনি এখন পুরো উপজেলার পাশাপাশি জেলাজুড়েই আলোচিত।

সংবাদপত্র, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল আর সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা ফেসবুকের কল্যাণে সফল খামারি মাক্কু এখন উপজেলার কৃষি সম্ভাবনার আদর্শ। পাহাড়ের উপরের সবুজের নীলিমায় ঘেরা ২৩ একর (৬৯ বিঘা) ভূমির উপর তার বসতবাড়িসহ এই টিলাটিকে স্থানীয় গ্রামবাসীরা মাক্কুর টিলা বলেই সম্বোধন করেন। তার গড়ে তুলা এ খামার দর্শনে আসেন সর্বস্তরের মানুষজন।

সরেজমিনে শনিবার জৈন্তাপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলামকে সাথে নিয়ে গেলে দেখা যায় মাক্কু মিয়ার সফলতার চিহৃগুলো। সাংবাদিক পরিচয় জানানোর পর ছুটে আসলেন মাক্কু। ঘুরিয়ে দেখালেন তার হাতে গড়া স্বপ্নের টার্কির খামার। চোখে পড়লো বাড়ির দুটি ঘরে কয়েকশত ছোট বড় টার্কি মুরগি। খাবার নিয়ে খামারি মাক্কু টার্কির মুরগির থাকার ঘরে প্রবেশ করতে মুরগীগুলো নানা সুরে হাক ডাক শুরু করে। নানা অঙ্গভঙ্গিমায় মেতে ওঠে রঙবেরঙের এসব মোরগ-মুরগি।

একান্ত আলাপচারিতায় মোহাম্মদ আলী মাক্কু জানান, ২২ বছর আগেকার কথা। একদিন বিটিভিতে সিএনএনের খবর দেখছিলাম। খবরে টার্কি মুরগির পালন ও তার লাভজনক দিকগুলো তুলে ধরা হচ্ছিল। সেই থেকেই মাথায় ঢুকে এ মুরগি পালনের ইচ্ছে। দিন যায় বছর যায় কোন দিকেই এই মুরগির কোন খবর পাই না। অবশেষে গত বছর এ মুরগির সন্ধান পাই। বাংলাদেশে আমদানি ও পালনে মানুষজন উৎসাহিত হলে আস্তে আস্তে বাজারজাত হতে শুরু হয় এসব টার্কি মুরগির বাচ্চা।

তিনি জানান, আমি ১৯৫১ সালের একজন ভারত প্রত্যাগত মোহাজের উত্তরাধিকারী। আমার বাবা প্রয়াত মহব্বত আলী সরকার। সরকারের ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এখানে আমাদের বসতি গড়ে উঠে। বাবার ভোগ দখলীয় এ বাড়িতেই স্ত্রী, ৩ মেয়ে, ১ ছেলে নিয়ে বসবাস করে আসছি। ২০১৭ সালে এই বাড়ির দুটি ঘরে মাত্র ১২টি টার্কি মুরগির বাচ্চা দিয়ে যাত্রা শুরু করি। অর্থনৈতিক দৈন্যতায় চলা মোহাম্মদ আলী মাক্কু কোন কিছুতেই টার্কি মুরগির খামার যখন বড় করতে পারছিলেন না তখন তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ান এলাকার আলমাস আলী নামের অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক। ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে যুক্ত এ শিক্ষানুরাগীর আর্থিক সহযোগিতা চলছে তার টার্কি খামার এগিয়ে নেয়ার পালা।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তার খামারে ২ শতাধিক ছোট বড় টার্কি মুরগি আছে। প্রতিটি বড় মুরগি ১৫-১৬ কেজি ওজনের হয়ে থাকে এবং উৎপাদন স্থলে বাজার মূল্য গড় ৪৫০-৫০০ কেজি দরে বিক্রি করা যায়। কখনো কখনো সৌখিন ক্রেতাদের কাছে ১৫-১৬ কেজি ওজনের টার্কি মুরগি ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকাও বিক্রি করা যায়। তার খামারে পালিত এসব টার্কি মুরগি মাসে ২০ থেকে ২৫টি বাচ্চা দিচ্ছে। ১ সপ্তাহ বয়সের টার্কি মুরগির বাচ্চা বর্তমানে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে প্রতি পিস বিক্রি করা যায়। ধান, চাল, গম, ভাত, ভুট্টাসহ পাশাপাশি ঘাস খায় এসব টার্কি মুরগি। রোগবালাই নেই বললেই চলে। বর্তমানে তিনি মেশিন দিয়ে মাসে ৫০ থেকে ৬০টি বাচ্চা ফুটান। তার খামারের এসব টার্কি অত্যন্ত সুন্দর, সুঠাম দেহের অধিকারী।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, তার পুরো বাড়িটিই যেন একটি কৃষি ব্যবস্থাপনার প্রকল্প। বাড়ির চতুর্দিকে সারি সারি কমলা লেবু, জাম্বুরা, বাতাবি লেবু, সাতকরা, জারা লেবু, পেয়ারা, লিচু, আম, আমলকি, কাঁঠাল, আমড়া ড্রাগন ফল, আনারস, পান, সুপারিসহ হরেক প্রজাতির গাছপালা। আছে লাউ, ঢেঁড়স, কাঁচকলা, চাল কুমড়া, মিষ্টি কুমড়া সীম, লাল শাক, ডাটা শাকসহ নানা জাতের শাক সবজি। শুধু কি তাই, তার টার্কি মুরগির ঘরসমূহের মাচাংয়ে আছে শত জোড়া নানান জাতের কবুতর। এছাড়াও খামারে আছে শতাধিক দেশি মুরগি, আছে ৭টি ছোট বড় ফ্রিজিয়ান ছোট গরু। দুধের জন্য তার এসব গরুগুলোও বেড়ে ওঠছে ধীরে ধীরে।

সফল চাষি মাক্কু জানান, স্ত্রী, একমাত্র ছেলে আহসান আর একজন কাজের লোক নিয়ে তিনি এ খামার চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, কৃষি, প্রাণি সম্পদ বিভাগ, গণমাধ্যমকর্মী থেকে শুরু করে প্রতিদিনই এলাকার সিংহভাগ মানুষই তার খামারে আসছেন। এমন মহতি ও লাভজনক উদ্যোগে তাকে উৎসাহিত করে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, সরকারের তরফে যদি এই খাতে অনুদান পাই তাহলে স্থানীয় ডিম, দুধ ও মাংস, শাকসবজি, ফলমূলের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আমি এই এলাকার অর্থনৈতিক পরিবর্তনে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবো।

মাক্কু মিয়া জানান, স্থানীয় মনসুর বাহিনী নামক কিছু শত্রুলোক প্রায়ই তার এ খামারের ক্ষতি সাধন করে থাকে। ইতিপূর্বে তার কয়েকটি গাভী, মুরগি লুট করে নিয়ে গেছে। এ ঘটনায় তিনি থানায় অভিযোগ দিয়ে রেখেছেন।

স্থানীয় গৌরি শংকর গ্রামের নুরুল ইসলাম লেচু জানান, মাক্কু ভাই ছোটবেলা থেকেই কৃষি ও খামার করার মতো কাজে মনোনিবেশি একজন মানুষ। অক্লান্ত পরিশ্রমী এ মানুষ টার্কির এ ফার্ম করে গোটা এলাকায় তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। তার এ মহত উদ্যোগ আমাদের গ্রামের মাঝে একটি দৃষ্টান্তও।

জৈন্তাপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক নুরুল ইসলাম জানান, মোহাম্মদ আলী মাক্কু শুধু একজন খামারি বললে ভুল হবে। তিনি জৈন্তাপুরের কৃষি ও কৃষি ব্যবস্থাপনার জন্য একজন আদর্শ, মেধাবী, বিচক্ষণ ও কাজপাগল মানুষ। তিনি তার টার্কি খামার গড়ে তুলে নিজের পাশাপাশি পুরো জৈন্তাপুরের কৃষি ব্যবস্থাপনা অগ্রগামী করেছেন। এছাড়া তরুণ, যুবক-যুবতীদের বেকারত্ব গোছাতেও তার এ খামার দৃষ্টান্ত হয়ে কাজ করবে। আমি তার সর্বাঙ্গীণ সফলতা কামনা করছি।
 
এ ব্যাপারে জৈন্তাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌরিন করিম জানান, মোহাম্মদ আলী মাক্কু একজন উদ্যমী যুবক ও সফল খামারি। তার এ টার্কি ফার্মের উন্নতি সাধনে আমাদের তদারকি আছে। উপজেলা প্রাণী সম্পদ বিভাগকেও তার খামারের প্রতি সব সময় খেয়াল রাখার নির্দেশনা দিয়েছি। আমি নিজে তার টার্কি ফার্মে গিয়ে তাকে উৎসাহ দিয়েছি। গত কদিন আগে জৈন্তাপুর পরিদর্শনে আসলে আমাদের (সিলেটের) জেলা প্রশাসককেও সেটা ঘুরিয়ে দেখানোর কথা ছিলো। কিন্তু সময় স্বল্পতায় তা সম্ভব হয়নি। তবে আগামী সফরে আমি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে তার খামার পরিদর্শনে নিয়ে যাবো। সরকার তথা প্রশাসনের তরফ থেকে সহজ শর্তে ঋণসহ তার খামার ব্যবস্থাপনায় যে কোন ধরণের সহযোগিতা লাগলে আমরা তা গুরুত্ব সহকারে দেখবো।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.