Sylhet Today 24 PRINT

৫৫ জনকে পুলিশে নিয়োগ দিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর সুপারিশ, ঘুষ নেন এপিএস!

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ১৩ জুলাই, ২০১৫

মৌলভীবাজারে পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে ৫৫ জনের তালিকা পাঠিয়েছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। তাঁর দেওয়া তালিকার ১৫ জনের চাকরি হয়েছে। অন্যদের চাকরি না হওয়ায় মন্ত্রী পুলিশের ওপর খেপেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে মন্ত্রীর সই করা ওই তালিকায় নাম তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কারও কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) শ্রীকান্ত সূত্রধরের বিরুদ্ধে। নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে ছয়জন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে মন্ত্রীর এপিএস ও দেহরক্ষী ১০ লাখ টাকা ‘উৎকোচ’ গ্রহণ করেছেন বলে পুলিশের বিশেষ শাখার এক প্রতিবেদনেও উল্লেখ রয়েছে।

তবে এপিএস শ্রীকান্ত সূত্রধর মন্ত্রীর সই করা তালিকা মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপারকে পৌঁছে দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও উৎকোচ নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, ‘ছয় উপজেলার নেতাদের অনুরোধে মন্ত্রীর সুপারিশ করা ৫৫ জনের একটা তালিকা দিয়েছিলাম। পরে দেখছি বিচ্ছিন্ন কয়েকজনের মাত্র চাকরি হয়েছে। আমরা বেশ খাটাখাটি করে তালিকাটা করেছিলাম। পুরো তালিকা না হোক, অধিকাংশের চাকরি হয়নি বলে আমরা স্বাভাবিকভাবে ক্ষুব্ধ। মন্ত্রীও ক্ষুব্ধ।’

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই ক্ষোভেরই জের ধরে ১০ জুন মৌলভীবাজারে জেলা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটির মাসিক সভায় সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। এ ছাড়া পুলিশের সিলেট অঞ্চলের

উপমহাপরিদর্শককে (ডিআইজি) ‘দুর্নীতিবাজ’ বলে মন্তব্য করেন। মন্ত্রীর অশোভন আচরণের কথা ওই সভায় উপস্থিত থাকা মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার লিখিতভাবে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছেন।

পুলিশ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সিলেট অঞ্চলের অধীন মৌলভীবাজারে কনস্টেবল পদে লোক নিয়োগ দেওয়া হয় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি। এর দুই দিন আগে ২১ ফেব্রুয়ারি সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলীর সই করা ৫৫ জনের একটি তালিকা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তাতে লেখা হয়, ‘নিম্নবর্ণিত ব্যক্তিদের পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগে জোর সুপারিশ করা হলো।’

তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জনের বাড়ি মৌলভীবাজার সদর উপজেলায়, ১৫ জন রাজনগরের, ১৫ জন কমলগঞ্জের, ছয়জন শ্রীমঙ্গলের, আটজন কুলাউড়ার ও পাঁচজনের বাড়ি জুড়ী উপজেলায়। এঁদের মধ্যে ১৫ জনের চাকরি হয়েছে।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলীর নির্বাচনী এলাকা হচ্ছে মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলা। তালিকার ৫৫ জনের মধ্যে ২১ জন তাঁর নির্বাচনী এলাকার।

সমাজকল্যাণমন্ত্রীর সই করা এ তালিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশের সিলেট অঞ্চলের ডিআইজি মো. মিজানুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রীর বক্তব্য জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে তাঁর মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, তিনি দেশের বাইরে আছেন।

সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মন্ত্রীর সুপারিশের এই তালিকা তৈরি করেন এপিএস শ্রীকান্তসহ তাঁর আস্থাভাজন আরও ছয়জন। এ সাতজনই পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ সামনে রেখে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এলাকায় প্রচারণা চালান। তালিকায় নাম ছিল কিন্তু চাকরি হয়নি—এমন তিনজন চাকরিপ্রার্থী ও সাতজন চাকরিপ্রার্থীর অভিভাবকের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়।

তাঁরা বলেন, চাকরি নয়, কেবল মন্ত্রীর সুপারিশের তালিকায় নাম ওঠাতে তাঁদের কাছ থেকে ১৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের বলা হয়েছিল, চাকরি হলে পরে জনপ্রতি দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা দিতে হবে। তাতে তাঁরা রাজি হয়েছিলেন।

একজন চাকরিপ্রার্থীর বাবার অভিযোগ, তালিকায় নাম থাকলেই চাকরি হবে, নয়তো হবে না—এমন আশ্বাস দিয়ে তাঁর কাছ থেকে দুই দফায় ২৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এ টাকা নিয়েছেন মন্ত্রীর এপিএসের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি। শেষ পর্যন্ত ছেলের চাকরি না হওয়ায় তিনি সরাসরি এপিএসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

তিনি বলেন, ‘এপিএস শ্রীকান্ত বলেন যে এবার চাকরি হয়নি, পরেরবার হবে। টাকা জোগাড় রাইখেন।’

এ বিষয়ে পুলিশের বিশেষ শাখা মাঠপর্যায় থেকে ঢাকা সদর দপ্তরে একটি প্রতিবেদন পাঠায়। তাতে বলা হয়, গোপন অনুসন্ধানে জানা যায়, মৌলভীবাজারে পুলিশে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে ছয় ব্যক্তির কাছ থেকে সমাজকল্যাণমন্ত্রীর এপিএস শ্রীকান্ত ও দেহরক্ষী আমিনুল ‘উৎকোচের বিনিময়ে চুক্তি করেন’।

প্রতিবেদনে ছয়জনের পূর্ণ নাম-ঠিকানা উল্লেখ করা হয়। এঁদের মধ্যে চারজনের কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা করে, একজনের কাছ থেকে তিন লাখ ও একজনের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। ওই ছয়জনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁরা টাকা লেনদেন বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি।

কমলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁর ইউনিয়নের দুজনের সঙ্গে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আর্থিক লেনদেন হওয়ার কথা শুনেছেন। টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে হয়তো ওই ব্যক্তিরা মুখ খুলছেন না।

অবশ্য এপিএস শ্রীকান্ত সূত্রধর টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। কমলগঞ্জে ছয়জনের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা উৎকোচ নিয়েছেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘এটা ভুয়া। আমারও কানে এসেছে। কিন্তু বিশ্বাস করেন, আমরা কেউ-ই একটা কানাকড়িও কারও কাছ থেকে নিইনি।’

তাহলে অভিযোগ উঠল কেন—এ প্রশ্নের জবাবে শ্রীকান্ত বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রী সম্পর্কে তো জানেন। তিনি কোনো টাকা নেন না, বরং উল্টো দেন। কিছু বাটপার লোক আছে, তারা মন্ত্রীর রিকোয়েস্ট তালিকার নাম দেখে হয়তো ওই সব লোকের কাছ থেকে চাকরি হবে বলে টাকা নিয়ে নিয়েছে। বিষয়টা আমরাও খোঁজ নিচ্ছি।’ সূত্র : প্রথম আলো। 

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.