Sylhet Today 24 PRINT

সিসিকের ময়লাবাহী গাড়িতে আড়াল নগরীর ঐতিহ্য

শাহ শরীফ উদ্দিন |  ২৭ জানুয়ারী, ২০১৯

"সিলেটে ঘুরতে আসার আগে শুনে এসেছিলাম শহরের মধ্যেই রয়েছে বেশ কয়েকটি ঐতিহ্য। তার মধ্যে আলী আমজাদের ঘড়িটি নাকি অন্যতম। তাই স্ব পরিবারে চলে আসলাম ঘড়িটিকে দেখতে। কিন্তু এখানে এসে ঘড়িটি আর নজরে পড়ছিলো না। ভাবলাম রিকশা চালক হয়তো আমাদের বোকা বানিয়েছে। পরে স্থানীয় কয়েকজনকে জিজ্ঞাস করতেই একটু উঁকি দিয়ে বলেন ঐ যে আলী আমজাদের ঘড়ি। ঠিক তখনই তাকিতে দেখি টক আমরা পেছনেই ঘড়িটি। অথচ সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়িগুলো এমন ভাবে রাখা হয়েছে তাতে এখানে যে ঘড়িঘর হবে এটা কল্পনাও করা যায়নি। পরে আমার ছোট্ট মেয়েটাকে কোলে করে শুধু ঘড়িটাই কোনমতে দেখালাম।"

কথাগুলো শনিবার (২৬ জানুয়ারি) বিকালে সিলেটের চাঁদনীঘাট এলাকায় চট্টগ্রাম থেকে বেড়াতে আসা আলাউদ্দিনের (৫৫)।

আলাউদ্দিন স্ব পরিবার নিয়ে সিলেটে এসেছেন ঘুরতে। তাঁর সাথে আছেন মেয়ে মাইশা (১১) ও তাঁর স্ত্রী। তাদেরকে নিয়ে ঐতিহ্যের নিদর্শন 'আলী আমজাদের ঘড়ি' দেখতে এসে অনেকটা হতাশ তিনি। এই হতাশা নিয়ে তিনি বললেন, 'এই ঘড়ির অনেক গল্প শুনেছি। কিন্তু বাস্তবে কখনো দেখা হয়নি। তাই অনেক আগ্রহ নিয়েই এসেছিলাম দেখতে। কিন্তু এরকম একটি ঐতিহ্যবাহী জিনিস এভাবে অবহেলায় অযত্নে পড়ে থাকবে তা কখনোই ভাবিনি।'

কেবল আলাউদ্দিনই নয়, একই অভিযোগ যশোর জেলার মইনুল ইসলাম (৩৫) ও তাঁর বন্ধুদের। ৫ জন বন্ধু মিলে এসেছেন সিলেটে। তাঁরা বলেন, "সিলেটে আসার আগে গুগল থেকে সিলেটের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী জায়গা এবং দর্শনীয় স্থানের ধারণা নিয়ে এসেছি। দিনের বেলা জাফলং ভ্রমণ করে এখন ভাবলাম আলী আমজাদের ঘড়ি দেখে যাই। কিন্তু ঘড়ি দেখতে এসে কেন জানি মনে হচ্ছে ময়লার গাড়ি দেখতেই এসেছি। তাছাড়া এসব গাড়ি থেকে গন্ধও ছড়াচ্ছে। গণমাধ্যমে সিলেটের মেয়রের অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড দেখি। কিন্তু এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গার এমন পরিবেশ দেখে অবাক লাগছে।"

শনিবার বিকালে সরেজমিনে সুরমা নদীর পাড়স্থ সার্কিট হাউস এলাকার চাঁদনী ঘাট ঘুরে দেখা যায় ক্বিন ব্রিজের প্রবেশ মুখ থেকে নদীর পাড় পর্যন্ত দুই পাশেই অসংখ্য ময়লার গাড়ি এবং সিসিকের বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয় এমন অনেক ধরণের গাড়ি রাখা রয়েছে সেখানে। আর এসব গাড়ির কারণে 'আলী আমজাদের ঘড়িঘর' ঢাকা পড়েছে। কেবল তাই না সিসিকের গাড়ির সাথে যত্রতত্র রাখা হয়েছে কালীঘাটে আসা বিভিন্ন পণ্যপরিবহন। এতে যেমন ঢাকা পড়েছে সৌন্দর্য তেমনই পার্কিং করা এসব গাড়িতে আড়াল করে থাকা অংশে চলে মাদক সেবন।

অথচ এ এলাকায়ই রয়েছে সম্মিলিত নাট্য পরিষদের মহড়া কক্ষ, গণপূর্ত কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা পুলিশ সুপারের বাস ভবন, সার্কিট হাউস এবং তোপখানার দিকে আনুমানিক দুইশত গজ আগালে কোতোয়ালী থানা, বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় থাকলেও এদিকে খেয়াল নেই সিসিক কর্তৃপক্ষের।

চাঁদনীঘাট এলাকায় যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের এ অভিযোগ বেশ পুরনো হলেও এবার ২য় মেয়াদে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচিত হলেও চাঁদনীঘাটের দিকে নজর দিবেন এমনটা সকলের প্রত্যাশা থাকলেও চাঁদনীঘাটের অবস্থা এখনো অপরিবর্তিত।

এদিকে নগরীর সৌন্দর্য রক্ষায় মেয়র আরিফের হকার উচ্ছেদ অভিযানসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড প্রশংসা কুড়ালেও চাঁদনীঘাট এলাকায় নজর দেয়াতো দূরের কথা বরং সিটি করপোরেশনের গাড়ি দিয়ে এ এলাকা দখল করে রাখায় অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন জনসাধারণ।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আলী আমজাদের ঘড়ি ঘরের দিকে মেয়র দৃষ্টি দিবেন এটা আমাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। বর্তমানে নগরীর উন্নয়নে মেয়র বিভিন্নরকম কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়াও হকার উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। তাই আমরা আশাবাদী আলী আমজাদের ঘড়িঘরসহ চাঁদনীঘাট একালার সৌন্দর্য রক্ষায় মেয়র দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন।

তবে সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান শোনালেন সেই পুরনো বাণী, তিনি সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, পার্কিং সংকটের কারণে আপাতত গাড়িগুলো এখানে রাখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সিসিকের পার্কিং এর জন্য জেল কর্তৃপক্ষ থেকে কিছু জায়গা নেয়া হয়েছে। তবে এটুকুই যথেষ্ট না। এর জন্য আরো জায়গা প্রয়োজন। এ প্রয়োজন মিটাতে নগরীর ৯নং ওয়ার্ডে ঘাসিটুলা এলাকায়ও কিছু জায়গা নেয়া হয়েছে। এক-দুই বছরের মধ্যে সেখানে গাড়িগুলো রাখা সম্ভব হবে। তখন আর এখানে কোন গাড়ি থাকবে না।'

তিনি আরো বলেন, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য বিভিন্নরকম গাড়ি দিয়েছে। এগুলো যত্রতত্র রাখলে সমস্যা হবে। তাই এখানে রাখা হচ্ছে।' তবে আলী আমজাদের ঘড়িঘরসহ চাঁদনীঘাট এলাকার বিষয়ে সিসিক উদাসীন নয় জানিয়ে তিনি বলেন, কালীঘাটে যেসব পণ্যপরিবহন আসে এগুলোও একময় আর এখানে থাকবে না। ট্রাকস্ট্যান্ড নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়। আগামী জুন মাসে এর কাজ শেষ হবে। তখন পণ্যপরিবহনও এখানে আর থাকবে না বলে জানান তিনি।

সিসিকের এ প্রধান প্রকৌশলী ময়লা পরিষ্কারের কাজে যে গাড়িগুলো ব্যবহার করা হয় তা যদি রাখার জায়গা না থাকে তাহলে নগরী পরিষ্কার হবে কি ভাবে প্রশ্ন করে বলেন, পরিষ্কার না হলেতো নগরীতে কেউ ঢুকতেই পারবে না। তাই সকলের কাছে কাজ করার সময় চেয়ে তিনি বলেন, দ্রুতসময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করা হবে। ময়লার গাড়িও সরে যাবে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, সিলেটের প্রতীক হিসেবে পরিচিত আলী আমজাদের ঘড়িঘর কিন ব্রিজ হয়ে নগরের প্রবেশমুখ সুরমা নদীর চাঁদনি ঘাট এলাকায় অবস্থিত। ১৮৭৪ সালে কুলাউড়ার পৃথিম পাশার জমিদার নবাব আলী আহমদ খানের উদ্যোগে ঘড়িটি স্থাপন করা হয়। আড়াই ফুট ডায়ামিটার ও দুই ফুট লম্বা ঘড়িটির কাঁটা। লোহার খুঁটির ওপর ঢেউটিন দিয়ে সুউচ্চ গম্বুজ আকৃতির ঘড়িটি সিলেটের ঐতিহ্য। নবাব আলী আহমদ ঘড়িটি স্থাপন করলেও এটি পরিচিতি পায় তাঁর ছেলে আলী আমজাদের নামে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.