হৃদয় দাশ শুভ, শ্রীমঙ্গল | ২৯ জানুয়ারী, ২০১৯
বোরো ধানের ভরা মৌসুমে শ্রীমঙ্গলের কৃষকরা পাচ্ছেন না প্রয়োজনীয় পানি। উপজেলার ইছবপুরে জাগছড়া পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির আওতাধীন হাইল হাওরের পূর্ব পাশের প্রায় ১০ হেক্টর ধানের জমি এখন বিরান ভূমি। উপকারভোগী কৃষকরা সেচের পানি না পেয়ে ফসলের মাঠে বসেই বিলাপ করছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির, নেই তৃণভোজী পশুদের জন্য সবুজ ঘাসও। ধু ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে ফসলের মাঠ। এর কারণ হিসেবে অনুসন্ধানে উঠে আসে জাগছড়া পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির চালনাধীন সরকারীভাবে নির্মিত স্লুইস গেট দিয়ে পানি সরবরাহ বন্ধ করে রাখার কারণ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাগছড়া পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির সদস্যরা সবাই উপকারভোগী কৃষক। কৃষকদের অভিযোগের তীর মূলত জাগছড়া পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির সভাপতি আসাদ মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলীর দিকে। কৃষকরা বলছেন, প্রয়োজনীয় চাঁদার টাকা ইউপি সদস্য’র মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে অপরদিকে সমিতির সভাপতি-সম্পাদক তা নাকচ করে দিয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছেন।
সমিতির সভাপতি আসাদ মিয়া বলেছেন, আমি সমিতির সদস্যদের (কৃষক) কাছ থেকে বিগত দুই বছরের বকেয়া পাওনা টাকা পাইনি। তাই পানি বন্ধ রেখেছি, টাকা (সদস্য চাঁদা) না দিলে পানি কিভাবে দেই! তিনি আরো বলেন, অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক নেই, এরূপ থাকলে অভিযোগকারীদের থাকতে পারে।
উপজেলার ইছবপুর এলাকার কৃষক আব্দুল মতিন খাঁন বলেন, প্রতিবছর বোরো মৌসুমে সুইচ গেইটের পানির মাধ্যমে আমরা কাজ করে থাকি।
হঠাৎ করে এ বছর পানি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন টাকা (চাঁদা) না দেওয়ার অজুহাত তুলে সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক। সমিতির কতিপয় ব্যক্তিদের মিথ্যাচার ও একগুঁয়েমীর কারনে পানির অভাবে বোরো চাষের মৌসুম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ না হলে আমাদের ফসলের বীজতলাসহ পুরো ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পানি না থাকার কারণে ফসল ফলাতে না পারায় আমরা না খেয়ে থাকতে হবে। তার চেয়ে বড় কথা সামগ্রিকভাবে ধানচাষে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন কৃষক বলেন, কৃষকদের বীজতলা ও ফসলের মাঠে পানি না থাকলে চাষাবাদ হবে না। এতে ব্যবস্থাপনা কমিটির কোন মাথাব্যথা নেই। তারা একর প্রতি ৪শ টাকা করে না দিলে কৃষকদের পানি দিবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট আমরা ৫০ জন কৃষক অভিযোগ জানিয়েছি। এখন পর্যন্ত কোন প্রতিকার পাইনি। এছাড়া এখানে প্রভাবশালী বালু ও মাটি ব্যবসায়ীরা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি-সম্পাদকের সাথে সমঝোতা করে এই কাজ করেছে। কারণ ধানক্ষেতে পানি দিলে কৃষকরা ক্ষেতে ফসল ফলায়। ফসল ফলালে তারা খেত থেকে মাটি ও ছড়া থেকে বালু তুলতে পারে না।
শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহজাহান মিয়া বলেন, গতবছর এই এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে আমি প্রায় বিশ হাজার টাকা চাঁদা তুলে সুইচ গেইট সমিতির কাছে দিয়েছিলাম। এবার নানা অজুহাতে পানি দেওয়া বন্ধ রেখেছে। এতে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমরা কৃষকদের নিয়ে সুইচ গেইট সমিতির সাথে সংলাপে বসার কথা বলছি, তারা সময় দিচ্ছে না। এদিকে পানি না থাকায় কৃষকরা ফসল উৎপাদন করতে পারছে না।
এব্যাপারে শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন মোনালিসা সুইটি বলেন, পানি বন্ধ করার এখতিয়ার নেই সমিতির কোন কর্তা - ব্যাক্তির। আমার উপ-সহকারীর মাধ্যমে কৃষকদের সাথে কথা বলে তাদের সাথে বসার জন্য একটি তারিখ চেয়েছি। সমস্যাগুলো জানার জন্য আমরা আগামী সপ্তাহের মধ্যে সব পক্ষকে নিয়ে একসাথে বসতে চাচ্ছি। গত বছরও এরকম একটি সমস্যা হয়েছিলো। একজনের জমির উপর দিয়ে পানি নিতে আর একজন কৃষক বাধা দেয়। সে সময় আমরা জনপ্রতিনিধিসহ সবাইকে নিয়ে বসে সমাধান করেছিলাম।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, কৃষকরা আমার কাছে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। আমি এই বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছি।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলী সঞ্জয় মোহন সরকার বলেন, পানি প্রয়োজনবোধে সংরক্ষণ করা যেতে পারে, কিন্তু পানি প্রদান না করার কোন এখতিয়ার সমিতির নেই। নিয়মানুযায়ী প্রতি বিঘা প্রতি ২০ কেজি ধান বা সমপরিমাণ মূল্যের টাকা প্রদান করতে হয়। এ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা আমার জানা ছিলো না। তিনি অতি দ্রুত এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলবেন বলে জানান।