বড়লেখা প্রতিনিধি | ০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯
মাস দেড়েক আগে বড়লেখায় এক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হন তানভীর রানা ফয়েজ নামের এক আরোহী। এ ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর মোটরসাইকেলের চালকের বিরুদ্ধে আদালতে মারামারির অভিযোগ দিয়েছেন আহত আরোহীর পরিবার।
গত রোববার (৩ ফেব্রুয়ারি) বড়লেখার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম হারিদাস কুমারের আদালতে এই অভিযোগ করেন আহত আরোহী তানভির রানা ফয়েজের বড় ভাই কবির আহমদ। আদালত বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) অভিযোগটি মামলা হিসেবে গ্রহণ ও ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের পাতন গ্রামের আপ্তাব আলীর ছেলে জুয়েল আহমদের নাম উল্লেখ করে ও ৪ থেকে ৫ জনকে অজ্ঞাতনামা করা হয়েছে অভিযোগে।
গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর দুপরে উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের ভট্টশ্রী গ্রামের মুরগীয়া বাড়ী এলাকায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। এই ঘটনায় তানভির রানা ফয়েজ গুরুতর আহত হন। ২৫ ডিসেম্বর রানার ভাই অভিযোগের ২ নম্বর সাক্ষী জুবের আহমদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ব্যক্তিগত আইডিতে তাঁর ভাই বাইক এক্সিডেন্ট করেছে বলে পোষ্ট দেন। দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় রানা সিলেট ও ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
কিন্তু হঠাৎ করে এই ঘটনায় আদালতে মারামারির অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
মোটরসাইকেল চালক জুয়েলের পরিবারের দাবি, কারো প্ররোচনায় দুর্ঘটনাটিকে তানভির রানা ফয়েজের পরিবার মারামারির ঘটনা বলে আদালতে অভিযোগ দিয়েছেন। তবে রানার পরিবারের দাবি, প্রথমে তাঁরা দুর্ঘটনা মনে করেছিলেন। পরবর্তীতে আহত রানার জ্ঞান ফিরে আসলে তার কাছ থেকে প্রকৃত ঘটনা জেনে আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর দুপরে উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের ভট্টশ্রী গ্রামের মুরগীয়া বাড়ী এলাকায় একটি বিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে জুয়েলের মোটরসাইকেলে উঠেন তানভির রানা ফয়েজ। বিয়ে বাড়ির অদূরে মুরগীয়া বাড়ী এলাকায় যাবার পর একটি গাভীকে বাঁচতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারান মোটরসাইকেল চালক জুয়েল আহমদ। এতে তিনিসহ গুরুতর আহত হন আরোহী তানভির রানা ফয়েজ। স্থানীয়রা তখন মোটরসাইকেল চালক ও গুরুতর আহত আরোহীকে উদ্ধার করে বিয়ানীবাজার হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তানভিরের অবস্থার অবনতি হওয়ায় থাকে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেলে নেওয়া হয়। এই মেডিকেলে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। পরে রানার স্বজনরা তাকে ঢাকা মেডিকেলসহ একটি বেসরকারি মেডিকেলে চিকিৎসা করান। পরে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ি তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন তার স্বজনরা।
আদালতে দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর শাহবাজপুর ইউপির সায়পুর গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে তানভির রানা ফয়েজ বিয়ানীবাজার সরকারী ডিগ্রী কলেজের এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ২৪ ডিসেম্বর ফরম ফিলাপ করতে কলেজের উদ্দেশ্যে সে শাহবাজপুর বাজারে গাড়ির অপেক্ষা করছিলেন। এসময় পাতন গ্রামের আপ্তাব আলীর ছেলে পূর্বপরিচিত জুয়েল আহমদ বিয়ানীবাজার যাচ্ছে জানিয়ে তার পালসার মোটর সাইকেলে পরীক্ষার্থী রানাকে তুলে রওয়ানা দেয়। কিন্তু জুয়েল সোজা রাস্তায় বিয়ানীবাজার না গিয়ে গ্রামের রাস্তায় ঢুকে মুরগীয়া বাড়ির রাস্তার সম্মুখে হঠাৎ মোটরসাইকেল থামিয়ে দিলে অজ্ঞাত ৪-৫ দুর্বৃত্তসহ জুয়েল কিল-ঘুষি ও লাথি মেরে রানার সাথে থাকা প্রায় ৭ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। বাড়িতে ফোন করে ২ লাখ টাকা মুক্তিপন আদায় করে দিতে চাপ প্রয়োগ করে। রাজি না হওয়ায় লোহার রড় দিয়ে পিটিয়ে তানভির রানা ফয়েজের মেরুদন্ডসহ হাড়গোড় ভেঙ্গে মৃত ভেবে অভিযুক্তসহ অজ্ঞাতরা রাস্তায় ফেলে চলে যায়।
অভিযোগের বিষয়ে বিবাদী জুয়েলের ভাই কবির হোসেন বলেন, ‘অভিযোগ যা উল্লেখ করা হয়েছে সব মিথ্যা। রানা একটি বিয়ে বাড়ি থেকে আমার ভাইয়ের গাড়িতে ওঠে। গাড়িতে উঠতে জুয়েল রানা প্রথমে না করেছে। কারণ সে বলেছে আমি তিনজন নিয়ে চালাতে পারিনা। কিন্তু রানা কোনো বাধা না মেয়ে জোর করে মোটরসাইকেলে উঠেছে। এরপর কিছু দূর যাবার পর একটি গাভীকে বাঁচাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। সবাই জানে এটা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এইটাই সত্য। কিন্তু হঠাৎ করে শুনি আদালতে আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। এটা সাজানো। কারো প্ররোচনা পেয়ে ওই অভিযোগ করা হয়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে তানভির রানা ফয়েজের ভাই বাদী কবির আহমদ বলেন, ‘আদালতে দেওয়া অভিযোগ সব সত্য। ঘটনার পর পর আমরা কিছু বুঝতে পারিনি। তার অবস্থা গুরুতর ছিল। দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় চিকিৎসা নিয়ে আমরা ব্যস্ত ছিলাম। বড় অপারেশ হয়েছে কয়েকটি। চিকিৎসক জানিয়েছেন, তার সুস্থ্য হওয়ার সম্ভাবনা ১০ ভাগ। বাড়িতে আনার পর তার সাথে কথা বলে প্রকৃত ঘটনা জানতে পারি। পরীক্ষার ফি দিতে যাবার সময় জুয়েল তাকে মোটরসাইকেলে তুলে নেয়। কিছু দূর যাবার পর আক্রমণের ঘটনা ঘটে।’
এই বিষয়ে বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াছিনুল হক মঙ্গলবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টায় বলেন, ‘সন্ধ্যায় আদালতের আদেশর কপি পেয়েছি। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশ মোতাবেক মামলা রেকর্ড করাসহ পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।’