Sylhet Today 24 PRINT

একটি সেতুর জন্য আর কত অপেক্ষা!

সেলিম আহমেদ, কুলাউড়া |  ০২ আগস্ট, ২০১৫

“দাদারে, ওনো (এখানে) একটা পুল (ব্রীজ) না থাকায় হামরা কত কষ্টর মাঝে আছি। একটা পুলর লাগি (ব্রীজের জন্য) কত নেতার গালায় গালায় (দ্বারে দ্বারে) ঘুরেছি, কত আন্দোলন করেছি। ভোটের (নির্বাচনের) সময় এলে সব এমপি প্রার্থীরা আসেন, পুল বানাইয়া (ব্রীজ নির্মাণ করার) দেয়ার আশা (আশ্বাস) দেইন, কিন্তু এমপি আইগেলেও (নির্বাচিত হওয়ার পর) কেউ আর কথাগুলা মনে রাখইন না, আমাদের এ দুঃখর কথা তুমি সারা দেশবাসীর সামনে তুলে ধর”।
এ কথাগুলো বললেন কুলাউড়ার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের মনুনদী তীরের ষাঠোর্ধ্ব কামাল মিয়া।

এ দুঃখ শুধু কামাল মিয়ার নয়, কুলাউড়া উপজেলার দক্ষিণ লংলার লক্ষাধিক মানুষের। তাদের ধারণা কুলাউড়া-পৃথিমপাশা-হাজীপুর-শরিফপুর সড়কের পৃথিমপাশা ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের রাজাপুর খেয়াঘাঠে মনু নদীর উপর একটি ব্রীজ বদলে দিতে পারে এ এলাকার লক্ষাধিক মানুষের ভাগ্য।

সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে নদী তীরবর্তী পৃথিমপাশা ও হাজীপুর ইউনিয়নের মধ্যবর্তী রাজাপুর নামক স্থানে সর্বস্তরের জনসাধারণ একটি সেতু নির্মাণের দাবী জানিয়ে আসছিলেন। একাধিকবার মৌলভীবাজার সড়ক বিভাগ সেতু নির্মাণের লক্ষে জরিপ কাজ চালায়। কিন্তু পরবর্তীতে তা থমকে যায়।

এই খেয়াঘাঠ দিয়ে শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাকো দিয়ে যাতায়াত করলেও, বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে যাতায়াত করতে হয় নৌকা দিয়ে। অনেক সময় নৌকা ডুবে ঘটে দূর্ঘটনা।

এই খেয়াঘাঠ দিয়েই যাতায়াত করতে হয় সুখনাভি, মাদানগর, আলীনগর, আলীপুর, ভূইগাঁও, নিশ্চিন্তপুর, দত্তগ্রাম, সুলতানপুরসহ পৃথিমপাশা, হাজীপুর, শরিফপুর ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষকে।

২০১২ সালে নিশ্চিনন্তপুর গ্রামের এক রোগীকে নিয়ে রবিরবাজারে ডাক্তারে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে আসা হলে খেয়াঘাঠে নৌকা না পাওয়ার কারণে খেয়াঘাটেই তার মৃত্যু হয়।

জানা যায়, মৌলভীবাজার সড়ক বিভাগের আওতাধীন কুলাউড়া উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণাঞ্চলের রাউৎগাঁও, পৃথিমপাশা, হাজীপুর হয়ে শরীফপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চাতলাপুর চেকপোষ্ট পর্যন্ত প্রধান এ সড়কের দৈর্ঘ্য ২৮.৫০কিলোমিটার।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে বয়ে আসা খরস্রোতা মনুনদী প্রবাহমান। নদীটি মৌলভীবাজারের শেরপুরে গিয়ে কুশিয়ারা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। কিন্তুু সড়কের ১৪ কিলোমিটার এলাকায় রাজাপুর নামক স্থানে সেতু না থাকায় উপজেলা সদর থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হাজীপুর ও শরীফপুর ইউনিয়ন। একদিকে সেতু নেই, অন্যদিকে ওই পারের ৮.৫০ কিলোমিটার সড়ক কাঁচা রয়েছে। তাই এ দুই ইউনিয়নের জনসাধারণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় অনেক পিছিয়ে পড়েছে। যার প্রভাব শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক ভাবে পড়েছে বলে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন।

হাজীপুর ইউনিয়নের মাদানগরের জুনেদ আহমদ (৩২), মিফতাউর রহমান (২৯), ফরিদ উদ্দিন (৫৫) বলেন, অন্যান্য সমস্যাগুলো সমাধান সম্ভব, তবে একটি সেতু নির্মান না হওয়ায় আমরা উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ করতে পার্শ্ববর্তী কমলগঞ্জ উপজেলা হয়ে কুলাউড়া সদরে যেতে হয়। এতে আমাদের সময়, অর্থ ও শ্রম বেশি দিতে হয়। অন্য ইউনিয়নের চাইতে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ছি।

পৃথিমপাশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ ও হাজীপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা কুলাউড়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি তালুকদার আব্দুল বাছিত বাচ্চু বলেন, সেতু হলে শুধু হাজীপুর পৃথিমপাশা নয় পার্শ্ববর্তী টিলাগাঁও, কর্মধা, রাউৎগাঁও এর সাথে অন্ত যোগাযোগ বৃদ্ধি হবে। পানসহ কৃষি পণ্য সহজে জেলা সদরে বাজারজাত করন সম্ভব হবে।

২০১১ সালে হাজীপুরে একটি জনসভায় তৎকালীন চিফ হুইপ আব্দুস শহীদ এমপি সেতু নির্মানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর পূর্বে তৎকালীন স্থানীয় এমপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ ও নওয়াব আলী আব্বাছ খান প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

হাজীপুরের ইউপি সদস্য হেলাল আহমদ, শরীফপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য গনেশ লাল গোয়ালা, দত্তগ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক চিনু মিয়া, রবিরবাজারের ব্যবসায়ী বুরহান উদ্দিন, মনুনদী তীরবর্তী কলিরকোনা গ্রামের বাসিন্দা ক্ষেতমজুর নেতা সৈয়দ মোশারফ আলী বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুুন্নত থাকায় কৃষকের উৎপাদিত পন্য সহজে বাজারজাত হয় না। জরুরী চিকিৎসা সেবা নিতে আমাদের বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সেতু নির্মান হলে ১৫/২০ কিলোমিটার দূরবর্তী উপজেলা সদরে সহজেই যাওয়া যেত, সেতু না থাকায় ৩৫/৩৮ কিলোমিটার সড়ক ঘুরে যেতে হয়।

শিক্ষার্থী ফয়জুল হক, আবুল কালাম, শেখ সেজি, পিংকু দে, নওশাদ, অরূপ দে বলেন, নদীর উপর বাঁশের সাঁকো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হই। অনেকবার পাঁ ফসকে নদীতে পড়ে বই খাতা হয় না। সেতু হলে ৫/৭ কিলোমিটার দূরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহজে যাওয়া যেত।

এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী উৎপল সামন্ত জানান, সেতুটি নির্মানের লক্ষে হাইড্রোলজি ও মরফোলজি স্টাডির জরিপ কাজ চলছে। সেপ্টেম্বরে রিপোর্ট আসার পর একনেকের অনুমোদন সাপেক্ষে সেতুটি নির্মানের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক ধারনায় প্রায় ২৭০মিটার দৈর্ঘ্য সেতুটি নির্মানে দেড়’শ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.