নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৮ আগস্ট, ২০১৫
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাড়িতে গিয়ে আশ্বাস দিয়েছিলেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে খুনিদের বিচার হবে। একই আশ্বাস দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রীও। আর নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকী ঘোষণা দিয়েছিলেন, মামলাটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করতে প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে।
সিলেটে নিমর্মন নির্যাতনে খুন হওয়া শিশু সামিউল আলম রাজনের বাড়িতে গিয়ে এসব আশ্বাস দিয়েছিলেন মন্ত্রীরা। রাজন হত্যার এক মাস পূর্তি হচ্ছে আজ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার বিচার দূরে থাক একমাসের মধ্যে তদন্তকাজই শেষ করতে পারেনি পুলিশ।
তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল হয়েছেন। পুলিশের কাছ থেকে ডিবির হাতে গেছে তদন্তভার। তবু একমাসেও তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয়নি।
একই অবস্থা এই হত্যা মামলার প্রধান আসামী সৌদি আরবে আটক কামরুল ইসলামকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও। ঈদের পরপরই কামরুলকে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছিলেন সংশ্লিস্ট মন্ত্রীরা। তবে এখন পর্যন্ত কামরুলকে ফেরাতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এখনো অনিশ্চিত কামরুলকে দেশে ফেরানো।
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদউল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহিন বলেন, কোন ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার হবে সেটা নির্ধারণ করার আগে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিস্ট মন্ত্রনালয় কিংবা জেলা প্রশাসকও চাইলে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে স্থানান্তর করতে পারেন। কিন্তু একমাসেও তদন্ত কাজ শেষ না হওয়ায় মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির সম্ভাবনা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।
কামরুলকে দেশে ফেরাতে সরকারের গাফিলতি রয়েছে উল্লেখ করে শাহীন বলেন, সৌদি আরবের সাথে আমাদের বন্দিবিনিময় চুক্তিও নেই। এছাড়া কামরুলকে ফেরত পাঠানোর আবেদন জানিয়ে মামলার যে এজাহারটি সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে, সে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে, ‘চোর সন্দেহে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়’। এখন চোর পিটিয়ে মেরেছে বলে সৌদি আরব কাউকে ফেরত দেবে কী না সেটাও ভাবার বিষয়। এজাহারের এই দূর্বলতার কারনেও কামরুলকে ফেরত আনা কষ্টকর হবে।
গত ৮ জুলাই সকালে সিলেটের কুমারগাওয়ে পৈশাচিক নির্যাতন করে ১৩ বছরের শিশু সামিউল আলম রাজনকে হত্যা করা হয়। নিহত রাজন কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী ভাইয়ারপাড় গ্রামের মাইক্রোবাস চালক শেখ আজিজুর রহমানের ছেলে।
শিশু রাজনকে পেটানোর ভিডিও ফুটেজ ধারণ করে নির্যাতনকারীরাই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। ২৮ মিনিটের ওই ভিডিও দেশ-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়।
সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ার পর এই হত্যা মামলার আসামীদের ধরতে উদ্যোগী হয় প্রশাসন। মামলার এজাহারভুক্ত আসামীদের জনতা আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। সৌদি আরবেও কামরুলকে আটক করে জনতা। এ পর্যন্ত এ ঘটনায় কামরুলসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ৮ জন।
এ ঘটনায় আসামীদের পালাতে সহযোগীতা, দূর্বল এজাহারের মাধ্যমে খুনের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা ও রাজনের বাবার সাথে দূর্ব্যবহারের দায়ে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে। সিলেট জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) আলমগীর হোসেন, উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম ও জাকির হোসেনকে সাময়িক বহিস্কার করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক সুরঞ্জিত তালুকদার জানান, এ ঘটনায় মুহিত আলম, ময়না, দুলাল আহমদ ও নুর মিয়া, ইসমাইল হোসেন আবলুস, আলী হায়দার, রুহুল আমিন, বাদল, আয়াজ আলী, লিপি বেগম, ফিরোজ ও আছমত আলী নামে ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সৌদিতে আটক আছে কামরুল। এদের মধ্যে ৮ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে।
মামলার তদন্ত কাজ এখনো শেষ না হওয়া প্রসঙ্গে সিলেট মহানগর পুলিশের মুখপাত্র রহমতউল্লাহ বলেন, তদন্ত কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। সবকিছু গুছিয়ে আনা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে কামরুলকে ফেরত আনার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
তবে রাজনের বারা আজিজুর রহমান তদন্তে ধীরগতি ও কামরুলকে ফেরাতে ব্যর্থতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ছেলে হত্যার পর প্রথমে পুলিশ আসামীদের সাথে আঁতাত করে ঘটনা ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করে। এরপর সরকারের উচ্চমহলের তোড়জোড়ে ন্যায় বিচার পাওয়ার আশা করেছিলাম। এখন আবার মনে হচ্ছে, প্রশাসন অযথা সময়ক্ষেপন করছে।