বিকুল চক্রবর্ত্তী, কুলাউড়া থেকে ফিরে | ০৮ আগস্ট, ২০১৫
মৌলভীবাজারের এক দিনমজুর কাঠ শ্রমিক দীর্ঘ ৫বছর পরিশ্রম করে বঙ্গবঙ্গু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য তৈরী করেছেন দশ মণ দশ কেজি ওজনের ব্যতিক্রমী একটি চেয়ার। সে চেয়ারটি এক নজর দেখতে এলাকার মানুষজন ভীড় করছে, কেউ কেউ বসতেও চাচ্ছে সেখানে কিন্তু কাউকে সেখানে বসতে দেওয়া হচ্ছে না। আতিক হাসানের এক কথা- একমাত্র বঙ্গবঙ্গু কন্যা প্রধানমন্ত্রীই বসবেন সে চেয়ারে।
মৌলভীবাজারের কুলাউউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণ বাজার ইউনিয়নের হিঙ্গাজিয়া গ্রামের এক গরিব কাঠ শ্রমিক প্রধানমন্ত্রীর জন্য দীর্ঘ ৫ বছর পরিশ্রম করে তৈরী করেছেন বিশাল আকৃতির দৃষ্টিনন্দন একটি চেয়ার। যার ওজন হয়েছে দশ মন দশ কেজি।
এদিকে দীর্ঘদিন পর প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৈরী এই চেয়ারের কাজ শেষ হয়েছে শুনে উৎসুক জনতা ভীড় জমিয়েছেন আলোচিত সে চেয়ার একনজর দেখতে।
জানা যায়, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হিঙ্গাজিয়া গ্রামের এক গরীব মায়ের ছেলে আতিক হাসান। তার বয়স যখন ৮ বছর তখন সহায় সম্পদ বিক্রি করে তার বাবা সৌদি আরবে পাড়ি জমান। কিন্তু বিধি বাম সৌদি আরবে যাওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি নিখোঁজ তার বাবা।
জীবিকার অন্বেষণে বাধ্য হয়ে কৈশোরেই আতিক বের হন কাজের সন্ধানে। আর ভাগ্যে জুটে গ্রামেরই এক কাঠমিস্ত্রি রিপন সূত্র ধরের জোগালী/হেলপার হিসেবে। শিখতে থাকেন কাজ।
এরপর এক সময় সিদ্ধান্ত নেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার জন্য একটি চেয়ার তৈরী করবেন। আর তার অদম্য ইচ্ছা শক্তির বলে নিজের চরম দারিদ্রতার মাঝেও ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে শুরু করেন সে চেয়ার তৈরির কাজ। ক্রমে টাকা যোগাড় করে তিল তিল করে এক সময় তৈরী হয়ে যায় সাড়ে ৭ফুট উচ্চতা ও তিন ফুট ৪ ইঞ্চি প্রস্তের অপূর্ব সে চেয়ার।
এ চেয়ার আতিক আট ফুট একাশী ও ৯ ফুট সেগুন কাঠ ব্যবহার করে এর মধ্যে জুড়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, জাতীয় ফুল শাপলা ও আওয়ামী লীগের প্রতিক নৌকা। এ ছাড়াও বিভিন্ন জাতের ফুলের কারুকাজসহ চেয়ারটিতে রয়েছে চা গাছের কুড়ি, মাছের আঁশ, আনারসের চোখ, আঁখের গিট, শংঙ্খ মোড়া, হাতির সুর, কলসী ও মার্বেলসহ অসংখ্য প্রতিকি ডিজাইন।
চেয়ারের সাথে রয়েছে গোলাকৃতির একটি পা-দানিও। এর মধ্যে সোনালী ও বার্নিশ কালার ছাড়াও লাল, কালো সবুজ ও সাদাসহ বিভিন্ন রং এর সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন এই চেয়ারে। আর কাজ শেষ করে যখন চেয়ারটি কাগজে মুড়িয়েছেন এর জন্য তাকে ৫ কেজি গেজেট/পুরতন পেপার ব্যবহার করতে হয়েছে।
এদিকে দীর্ঘ ৫বছর পর চেয়ারের কাজ গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) শেষ হওয়ার খবর প্রচার হলে চেয়ারটি দেখতে দলে দলে লোকজন ভীড় করছেন তার দোকানে। তবে কিভাবে এ চেয়ারটি প্রধানমন্ত্রীকে দিতে হবে এ বিষয়টি এখনও জানেন না আতিক হাসান।
এ দিকে এলাকাবাসী প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবী রাখেন তিনি যেন এটি সংগ্রহের ব্যবস্থা নেন। হতদরিদ্র আতিকের এই চেয়ারটি প্রধানমন্ত্রী যদি গ্রহণ করেন তা হলে তার কর্মের স্বার্থকতা পাবে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ ব্যাপারে আতিক হাসান এ প্রতিবেদককে জানান, নিজের সংসার দারিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত থাকায় তার মনের ইচ্ছা পোষণের এই চেয়ারটি তৈরী করতে তার সময় লেগেছে ৫ বছর। নিজের কাজের ফাঁকে ফাঁকে অল্প অল্প কাঠ যোগাড় করে তিনি বাড়িতে বসে এই চেয়ারটি তৈরী করেছেন। তবে বেশি ভাগ কাজই তিনি করেছেন রাতে। চেয়ারটিতে তিনি মোট ৮ফুট একাশী ও ৯ফুট সেগুন কাঠ ব্যবহার করেছেন ।
তিনি জানান- ৫ বছর আগে কারিতাস থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে এই কাজের শুরু করেন। বর্তমানে এই টাকাও ফেরত দিয়ে দিয়েছেন।
তিনি আরও জানান- চেয়ারটি তৈরী করার পর যারা জেনেছেন তারা এসে দেখে যাচ্ছেন। অনেকেই এই চেয়ারে বসে ছবি তুলতে চান কিন্তু তিনি তা করতে দেন না। এমনটি এই চেয়ারে তিনি নিজেও কখনও বসেননি। তার মনোবাসনা এই চেয়ারে বসবেন একমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এদিকে চেয়ারটির সৌন্দর্য দেখে সিলেটের এক শিল্পপতি এর জন্য তাকে দুই লক্ষ টাকার প্রস্তাব করেছেন। কিন্তু তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আতিক জানান- এটি দুই লক্ষ নয় ২ কোটি টাকা হলেও বিক্রি করবেন না। এ চেয়ারটি নিয়ে চেখের সামনে একটিই কল্পনা চেয়ারে বসবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জানা যায়, আতিক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে এক সন্তান। সংসারে অভাব অনটনের কারণে সহায় সম্ভল বিক্রি করে তার বাবা মো. রেণু মিয়া প্রায় ২৫ বছর আগে সৌদি আরবে যান। কিন্তু তার বাবা সৌদি আরবে যাওয়ার পর থেকেই তিনি রয়েছেন নিখোঁজ। এর পর থেকে তার মামার বাড়িতে একটি মাটিরর ঘরে তার মা ও দুই বোনকে নিয়ে কোন রকমে জীবনযাপন করে আসছেন তারা।
২০ বছর আগে কাঠ শ্রমিক হিসেবে যে কাজ শুরু করেছিলেন আজও তিনি কাঠ শ্রমিকই আছেন। পুঁজির অভাবে পারেন নি নিজস্ব কোন দোকানের ব্যবস্থা করতে। বর্তমানে স্থানীয় হিঙ্গাজিয়া বাজারে হামিদ ম্যানশনে একটি ঘর ভাড়া নিলেও পুঁজির অভাবে নিজে কোন কাজ করতে পারেনা। কন্টাক্ট রেখে অন্য ফার্নিচার দোকানীর কাজ করে দেন। আর প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৈরী এই চেয়ারটিও এই মার্কেটে মালিককে বলে একটি কক্ষে রেখেছেন।
এদিকে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মুহিবুর রহমান জানান, এত বড় চেয়ার তার জীবনে কোথাও দেখেননি। আতিক তার এলাকার দক্ষিণ হিঙ্গাজিয়া গ্রামের দরিদ্র পরিবারে সহজ- সরল একটি ছেলে। তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু প্রীতি খুব বেশি। বঙ্গবন্ধুকে কল্পনা করে তার সুযোগ্য কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্য সে এই চেয়ারটি তেরী করে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে অবহিত হয়ে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান জানান, বাংলাদেশে অনেক প্রতিভাবান মানুষ রয়েছেন যারা প্রায়ই তাদের মেধা ও মননের পরিচয় দিয়ে থাকেন। তবে কাছাকাছি সময়ে তিনি আতিকের তৈরী ব্যতিক্রমী এই চেয়ারটি দেখতে যাবেন বলে জানান।