সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি | ১৮ এপ্রিল, ২০১৯
সুনামগঞ্জে ধোপাজান নদীর পূর্বপাড়ে পূর্ব সদরগড় এলাকায় বালু মহালে চাঁদাবাজি নিয়ে বিরোধের জের ধরে এক যুবক খুন হয়েছেন। নিহতের নাম মিজানুর রহমান (২৫)। তিনি সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের ইব্রাহিমপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে। বৃহস্পতিবার সকালে এই প্রতিপক্ষের হামলায় তিনি নিহত হন।
এসময় নিহতের মামা রেজা উদ্দিন (৩২) নামে আরেকজন আহত হয়েছেন। মিজানুর রহমান বালু ব্যবসায়ী ছিলেন। পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশ ও এলাকাবাসী জানান, ধোপাজান বালু পাথর মহালে বাংলাদেশ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ), সুরমা ইউনিয়ন ট্যাক্স, চলতি নদী উজানভাটি, এমনকি বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের রশিদে বালু-পাথর বহনকারী বাল্কহেড, কার্গো, ট্রলার এবং বারকী শ্রমিকদের কাছ থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয়। নদীর বাঁকে বাঁকে, গ্রামে-গ্রামে রয়েছে চাঁদা আদায়কারী গ্রুপ। চাঁদাবাজির এই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেঘরিয়া, অলিরবাজার ও পশ্চিম সদরগড়ের কিছু তরুণের সঙ্গে ইব্রাহিমপুর ও পূর্ব সদরগড়ের কিছু যুবকের বিরোধ ছিল বহুদিনের।
এই বিরোধের জের ধরে বৃহস্পতিবার সকালে প্রতিপক্ষের ১০-১২ জনের সশস্ত্র আক্রমনে খুন হন মিজানুর রহমান। এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মিজানের এক হাত কেটে নেওয়া হয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও কোপানো হয়। এসময় মিজানের সঙ্গে থাকা তার মামা ও ব্যবসায়িক সহযোগি রেজা উদ্দিন আহত হন। তাকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলেই মারা যান মিজানুর।
পুলিশ এ ঘটনায় পশ্চিম সদরগড়ের সজ্জাদ আলীর ছেলে আব্দুল মালেক (৬২), মাছিম আলী’র ছেলে আব্দুল হাই (৫৮), গুলজার আহমদের ছেলে মো. ছাত্তার হোসেন (৪০), শেরগুল আলীর ছেলে কামাল (৫৩), রুনু মিয়ার ছেলে সাইফুল ইসলাম (৩৫)কে আটক করেছে।
মিজানের মামা আহত রেজা উদ্দিন জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৭ টায় ভাগ্নে মিজানুর রহমান তাকে ফোন দিয়ে নদীর পাড়ের আব্দুন নূরের চায়ের দোকানে নিয়ে যায়। ওখানে চা খাওয়ার সময় নদীতে নানা রশিদে টাকা উত্তোলনকারী পশ্চিম সদরগড়ের আব্দুন নূর, নূর জামাল, রোকন মিয়া, খোকন মিয়া ও তেঘরিয়ার বশির আহমদ এসে ঢুকে এবং দুই পক্ষে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। এক পর্যায়ে তার (রেজা উদ্দিন) মাথায় ঘুষি মারে ওরা। মিজান এতে ক্ষুব্দ হয়।
চায়ের দোকান থেকে বের হবার পরই তারা (মিজান ও রেজা) দেখতে পায় দা, রামদা নিয়ে ১০-১২ জন তাদের আক্রমন করার জন্য অগ্রসর হচ্ছে। এসময় পালানোর জন্য দৌড় দেয় তারা। এক পর্যায়ে নদীর পাড়ে হোচট খেয়ে পড়ে যায় মিজান। রেজা সাঁতার কেটে নদীর পূর্বপাড়ে আসার চেষ্টা করে। মিজানকে প্রতিপক্ষের লোকজন এলোপাতাড়ি কোপায়। পরে মিজানকে হাসপাতালে নেবার সময় শহরের চাঁদনীঘাট এলাকায় তার মৃত্যু ঘটে।
ইব্রাহিমপুরের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘মিজান একজন ব্যবসায়ী, বালু-পাথরের ব্যবসা ছাড়াও তার মোরগের বড় ফার্ম রয়েছে।’ ৩ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে দ্বিতীয় মিজানের মৃত্যুতে কেবল পরিবারের সদস্য নয়। পুরো গ্রামেই শোকের মাতম বিরাজ করছে।
মিজানের বড় ভাই জুনায়েদ আহমদ বলেন, ‘আমার ভাই ব্যবসায়ী, সে চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত নয়। গ্রামের জামে মসজিদের পক্ষ থেকে তাকে ( মিজান)সহ কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ধোপাজান বালু পাথর মহাল থেকে জামে মসজিদের সহায়তার অর্থ তুলতে। বৃহস্পতিবারও নদীতে মসজিদের অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়েছিল মিজান। সে সমাজের কাজ করতো, নিজের জন্য বা টাকা রোজগারের জন্য নদীতে যায়নি।’
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া আব্দুল মালেকের ছেলে তানভির হোসেন বলেন, ‘আমার বাবা হৃদরোগী, ওপেন হার্ট সার্জারী হয়েছে তার। ঘুম থেকে ওঠেন ১০ টায়। এ ঘটনায় জড়িত থাকলে তিনি পালিয়ে যেতেন। আমার ভাই সিলেটে থাকে। আমরা কোন চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত নই। নদীতে আমাদের দুটি বালু-পাথর বহনকারী ট্রলার আছে, এগুলো ভাড়ায় চলে। ২০১১ সালে আরেকবার গ্রামে খুন হয়েছিল এবং আমাদের পরিবারকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছিল।’
সুনামগঞ্জ সদর থানার মো. শহীদুল্লাহ্ বলেন, ‘ঘটনায় জড়িত ৫ জনকে পুলিশ তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করেছে। বিকালে নিহতের লাশের ময়না তদন্ত শেষে পরিবারের কাছে দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে এঁরা দুই পক্ষই বিভিন্ন রশিদে ধোপাজান বা সুরমা নদীতে চাঁদা তোলে। ইউনিয়ন ট্যাক্স’এর কথা বলেও চাঁদা তোলে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে জবাব চাওয়া হবে। বিষয়টি পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, চাঁদাবাজি এবং খুনের ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস ছাত্তার বলেন, ‘আমরা নদী থেকে টোল আদায়ের জন্য কোন ইজারা দেইনি। আমাদের নামে রশিদ ব্যবহার করলে সেটি ভুয়া রশিদ হবে।’