Sylhet Today 24 PRINT

বছরজুড়েই ভেজাল খাবার, অভিযান কেনো শুধু রমজানেই?

শাকিলা ববি |  ১১ মে, ২০১৯

সিলেট নগরীতে অভিযান চালাচ্ছে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালত (ফাইল ছবি)

‘রোজার প্রথম দিনেই সাড়ে ১২ টন মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর জব্দ, জরিমানা’ ‘স্বাদ ও রাজমহলে মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার, জরিমানা’ ‘বনফুলে মেয়াদোত্তীর্ন রসমালাই, জরিমানা’ ‘অধিক মূল্যে পণ্য বিক্রি, ফিজাকে জরিমানা’- গত কয়েকদিনে সিলেটের গণমাধ্যমগুলোতে আসা সংবাদের শিরোনাম এগুলো।  

রমজানের প্রথম দিন থেকেই সিলেটের বাজার তদারকি নেমেছে কয়েকটি সংস্থা। জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন অধিদপ্তর, সিলেট সিটি করপোরেশন, র‌্যাব-৯ সিলেট বাজার তদারকি ও ভেজার বিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। এসব অভিযানের ফলে জানা যাচ্ছে- প্রতিদিন কি খাচ্ছি আমরা?

প্রতিদিনই সিলেট নগর ও উপজেলা শহরগুলো অভিযান ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ন খাবার, দাম বেশি রাখাসহ নানা অনিয়মের সন্ধান পাচ্ছে মোবাইল কোর্ট। ফুটপাতের দেকান থেকতে নামী দামি ব্র্যান্ডের খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, সুপার শপ- সব জায়গায়ই মিলছে ভেজাল। যেনো ভেজাল খাবারেই সয়লাভ পড়েছে সিলেট।

ভেজাল রুখতে প্রশাসনের এমন উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে সর্বমহলে। পাশপাশি প্রশ্ন ওঠেছে- একই ধরণের ভেজাল খাবার তো সারাবাছরই বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা। তবে কেনো রমজানেই এমন অভিযান?  সারা বছর কেনো এমন বাজার তদারকি ও ভেজার বিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকে না- এই প্রশ্ন সবার।
 
সিলেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. জিয়াউল হক বলেন, রমজান মাসে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বাড়ায় দাম বৃদ্ধি করে ফেলা হয়। তাই দব্রমূল্য স্থিতিশীল রাখতে, ভোজাল রোধ করতে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমান অভিযান পরিচালনা করা হয়। সারা বছর দ্রবমূল্য বৃদ্ধি না পেলেও খাদ্যে ভেজালের বিষয়টা থেকে যায়। এখন এই বিষয়টা শুধু অভিযান করে বা জরিমানা করে কাজ হবে না। এক্ষত্রে মানুষের বিবেক জাগ্রত করেত হতে হবে। যিনি ভেজাল পণ্য বিক্রি করছেন তাকেও চিন্তা করতে হবে যে খাবার তার পরিবারকে খাওয়াবো না সে খাবার অন্যের কাছে কিভাবে বিক্রি করবে। ক্রেতাদেরও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে এবং বিক্রেতাদের নীতি নৈতিকতা ঠিক থাকতে হবে। তা না হলে খাদ্যে ভেজাল রোধ করা সম্ভব না।

এ ব্যপারে সিলেট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহিনা আক্তার বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সারা বছরই এ ধরনের ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে রমজান মাসে যেহেতু সব পণ্যে চাহিদা বেশি থাকে তাই ভেজালের প্রবনতাও বেশি থাকে। সেজন্য রমজান মাসে ভেজাল বিরোধী অভিযানে বেশি নজর দেওয়া হয়। তবে এসব ভেজাল বিরোধী অভিযান সারা বছর যেন গুরুত্বসহকারে করা হয় সে ব্যাপারে আস্তে আস্তে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
 
মঙ্গলবার (৭ মে) সিলেটের দক্ষিন সুরমার মুক্তিযোদ্ধা চত্বরের পাশের ফল বাজারে অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-৯ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন অধিদপ্তরের। এসময় ফল বাজারের ৩টি দোকান থেকে ১২ টনের অধিক মেয়াদোত্তীর্ণ পচা খেজুর জব্দ করা হয়। অভিযানে ওই তিন প্রতিষ্ঠানকে ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমান আদালত। একই দিনে দক্ষিণ সুরমার বাবনা পয়েন্টের স্বাদ ও রাজমহলের শাখায় এ অভিযান পরিচালনা করে মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার ও প্রসাধনী সামগ্রী রেখে তা বিক্রির দায়ে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

বৃহস্পতিবার (৯ মে) মেয়াদোত্তীর্ন রসমালাই রাখার দায়ে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার চন্ডিপুল শাখা বনফুল এন্ড কোং-কে ৭ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই দিনে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে পণ্য বিক্রির দায়ে নগরের ইসলামপুরস্থ ফিজা এন্ড কোং এর শাখায় অভিযান পরিচালনা করে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এভাবে রোজা শুরুর পর প্রতিদিনই অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়মের দেখা পাচ্ছে মোবাইল কোর্র্ট। আদায় করছে জরিমানাও। গত শুক্রবারও (১০ মে) নগরীর আম্বারখানা এলাকায় অভিযানর চালিয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়।

ইফতারি ও খাবারে ভেজাল প্রতিরোধ এবং বাজারে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম সুমনকে আহবায়ক করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি বাজার মনিটরিং কমিটি গঠিন করা হয়।
 
এ ব্যাপারে সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম সুমন বলেন, মূলত শুধুমাত্র রমজান মাসের জন্য নয় বছরের ৩৬৫ দিন এই অভিযান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। কারণ সারা বছরইতো বাজারে ভেজাল খাদ্য থাকে। সারা বছরই মানুষজন খাবারের নামে বিষ কিনে খাচ্ছেন। তবে রমজান মাসে মানুষের চাহিদা বেশি থাকে তাই বাজারে ভেজালের পরিমান বেড়ে যায় তাই তখন ভেজাল বিরোধী মনিটরিং ব্যবস্থা সচ্চল থাকে। কিন্তু এই ভেজাল বিরোধী মনিটরিং ব্যবস্থা সবসময় সচ্চল রাখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আমারা সিসিকের পক্ষ থেকে রমজানের শুরু থেকে বাজার মনিটরিং করছি। তবে আমাদের কোনো ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নেই তাই আমরা অন্যায় হয়েছে বলতে পারি কিন্তু শাস্তি দিতে পারছি না। সেজন্য আমার ব্যবসায়িদের সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছি। ব্যবসায়িরা যেন দোকানে মূল্য তালিকা রাখেন, মেয়াদোর্ত্তীণ পণ্য না রাখেন, পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি না করেন সে বিষয়ে কথা বলছি।
   
তিনি আরো বলেন, যেসব পন্য, খাদ্যদ্রব্য বাজারে আসে সেগুলো যদি সব লেভেল থেকে যথাযথভাবে মনিটরিং হয়ে আসতো তাহলে এ ধরনের অভিযানের প্রয়োজন হতো না। তিনি বলেন, একটি পণ্য বাজারে আনতে কত নিয়ম কত আইন আছে। কিন্তু আমাদের দেশে আইন থাকলেও আইনের বাস্তবায়ন নেই। তাই যে কেউ যখন তখন ব্যবসা নিয়ে বসতে পারে। পণ্য উৎপাদন করতে পারে।

সিলেট চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্টিজের সভাপতি খন্দকার সিপার আহমেদ বলেন, রমজান এলেই ভেজাল বিরোধী অভিযানে সবাই সোচ্চার হন কারণ রমজানে যে সব পণ্যের চাহিদা থাকে সারা বছর সেসব পণ্যের চাহিদা থাকে না। যখনই কোনো পণ্যের চাহিদা থাকে তখনই এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা ওই সব পণ্যের দাম বৃদ্ধি করেন ও নিম্নমানের পণ্য বাজারে নিয়ে আসেন। আমি নিজেও র‌্যাব, ভোক্তা অধিকারের সাথে বিভিন্ন অভিযানে গিয়েছি। এসব অভিযানে ভেজাল পণ্য জব্দ কর আর জরিমানা করা হয়। তবে আমার মনে হয় শুধু মাত্র পণ্য জব্দ আর জরিমানা করে কাজ হবে না এসবের পাশাপাশি জেলও দিতে হবে।

তিনি বলেন, সব ব্যবসায়িরা খারাপ না আবার সব ব্যবসায়িরা ভালোও না। সেজন্য যারা খারাপ তাদের জন্য জরিমানা দেওয়ার বিষয়টা গায়ে লাগে না। তাদের জন্য ১ দিনের জন্য হলেও জেল দেওয়া দরকার। তাদের ব্যবসায়িক লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করা দরকার। যদি আমার চেম্বারের কোনো সদস্য এধরনের কাজ করেন তাহলে তার সদস্য পদও বাতিল করে দিব। সবাইকে জানান দেওয়া দরকার যে এই ব্যাক্তির ভেজাল খাদ্য বিক্রির জন্য জেল হয়েছে। সামাজিক ভাবে তাদের বয়কট করা দরকার। তাহলে হয়তো কিছু ফলাফল আসবে। দুয়েক জন কে কঠোর শাস্তি দিলে অন্যরা এ থেকে শিক্ষা গ্রহন করবে। তবে এই বিষয়টা যেনো উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে না হয়। যারা ভেজাল পণ্য বিক্রি করছে তারাই যেনো এই শাস্তির আওতায় আসে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.