Sylhet Today 24 PRINT

যে জীবন খাসিয়াদের

নানান সমস্যায় জর্জরিত শ্রীমঙ্গলের খাসিয়ারা

হৃদয় দাশ শুভ, শ্রীমঙ্গল  |  ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

নানা সমস্যায় ভুগছেন শ্রীমঙ্গলের ১২টি পুঞ্জিতে থাকা প্রায় দশ হাজার খাসিয়া। ভূমির সমস্যা, যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্কট, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা সমস্যায় দিন কাটছেন এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির বাসিন্দারা।

বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের মধ্যে মাতৃতান্ত্রিক জনগোষ্ঠীর খাসিয়া সম্প্রদায়ের বাস সিলেট অঞ্চলেই। সিলেট বিভাগে মোট ৭৩ টি পুঞ্জিতে খাসিয়ারা বাস করেন৷ হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার সীমান্তে ৫টি, মৌলভীবাজারে ৬১টি এবং সিলেট জেলায় ৭টি খাসিয়া পুঞ্জি রয়েছে। যার মধ্যে শুধু শ্রীমঙ্গলেই রয়েছে ১২ টি খাসিয়া পুঞ্জি।

১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট ১২ হাজার ৩০০ জন খাসিয়া আছেন। কিন্তু ‘খাসি সোশ্যাল কাউন্সিল’ বলছে তাদের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার৷

সরকারী হিসাব অনুসারে বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ টির অধিক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বসবাস করে। যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ১.১৩ ভাগ। এরমধ্যে আদিবাসী খাসিয়া (খাসিয়া) জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভূমি সমস্যায় ভুগছেন।

ভূমি কমিশনের মাধ্যমে সমতলের আদিবাসীদের প্রকৃত ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করার দাবি খাসিয়াদের। বংশ পরম্পরায় যুগযুগ ধরে জমিতে বাস ও পান চাষ করলেও ভূমির উপর তাদের অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যে কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ জীবন মানের উন্নয়ন ঘটছে না তাদের৷

বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের মহাসচিব ও মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়ার পুঞ্জি প্রধান (মান্ত্রী) ফিলা পতমী সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, খাসিয়ারা ঐতিহ্যগত ও উত্তরাধিকার সূত্রে বনভূমির বাসিন্দা। বন আমাদের জীবন ও জীবিকার উৎস। কিন্তু আমাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি না থাকায় ভূমির মালিকানা নেই। এখানে ভূমি দখল, বসত ভিটা থেকে উচ্ছেদসহ প্রতিনিয়ত নানা নির্যাতনে স্বীকার হচ্ছি আমরা।

ভূমি সমস্যা নিয়ে খাসিয়ারা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের কাছে ধর্না দিলেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে জানান তারা৷

নাহার পুঞ্জির মন্ত্রী ডিবারমিন পতাম জানান, ভূমি সমস্যার কারণে ২০১৬ সালে আমাদের সাথে নাহার চা বাগানের দ্বন্দ্ব হয়। সেই দ্বন্দ্বের রেশে মামলাও হয়, যার ঘানি আমরা এখনো টানছি।

ভূমি সমস্যার পর খাসিয়া জনগোষ্ঠীর প্রধান সমস্যা হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা৷ পুঞ্জিগুলোতে যাওয়ার রাস্তাগুলো ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ।

সরেজমিনে গত কয়েকদিনে নাহার পুঞ্জি ১ ও ২, লাংলিয়াছড়া, ধনছড়া, জুলেখা পুঞ্জি ঘুরে দেখা যায় খাসিয়াদের দুর্ভোগের চিত্র৷

লাংলিয়াছড়া পুঞ্জিতে যাওয়ার রাস্তা এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে সামান্য বৃষ্টিপাতেই বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল৷ ফোর হুইল লাগানো জিপ গাড়িগুলো ছাড়া অন্য কোন গাড়িই সেখানে যেতে পারে না৷

লাংলিয়াছড়া ও নাহার যাওয়ার পথে মাটির কাঁচা রাস্তার একপাশ দিয়ে নেয়া হয়েছে গ্যাসের পাইপলাইন। মাটি সরে সেই পাইপলাইনগুলো আছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। জোড়াতালি দিয়ে কাজ করা হলেও কখনোই পরিপূর্ণভাবে গ্যাস লাইনের কাজ হয় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের৷ নাহার পুঞ্জিতে উঠার মূল রাস্তার অবস্থা সবচেয়ে নাজুক৷ ধনছড়া পুঞ্জির রাস্তার মোটামুটি ভালো থাকলেও সেখানে আছে ভিন্ন সমস্যা। জুলেখানগর চা বাগানের মূল ফটক দিয়ে ধনছড়া পুঞ্জিতে যেতে হয় কিন্তু ধনছড়া পুঞ্জিতে বসবাসরত খাসিয়ারা অভিযোগ করে বলেন প্রায় সময়ই জুলেখা নগর চা বাগানের মালিক পক্ষ তাদের ওই গেইট দিয়ে চলাচল করতে দেয় না৷

জুলেখা পুঞ্জির রাস্তা মোটামুটি ভালো থাকলেও বর্ষা মৌসুমে রাস্তা অতিরিক্ত পিচ্ছিল হয়ে পড়ার কারণে চলাচলে খুব সমস্যা হয় স্থানীয়দের ৷

এছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি পুঞ্জি ঘুরে দেখা গেছে, সব কয়টি পুঞ্জির যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক৷

ধনছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা পরমান কংওয়াং বলেন, আমাদের এখানে কেউ গর্ভবতী হলে ডাক্তারের দেয়া তারিখের প্রায় মাসখানেক আগে জেলা বা উপজেলা শহরে বাসা ভাড়া করে নিয়ে রাখতে হয় ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে। জরুরি অবস্থায় কোন রোগীকে পুঞ্জি থেকে হুট করে হাসপাতালে নেয়া অসম্ভব৷

যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা প্রকৌশলী সঞ্জয় মোহন সরকার জানান, অধিক ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও বাঁকগুলোতে আরসিসি ঢালাইয়ের ব্যবস্থা করা হবে এবং বিশেষ বরাদ্দের জন্যও আবেদন করা হবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে৷

যোগাযোগ ব্যবস্থার এই দুরবস্থার কারণে খাসিয়া পুঞ্জিগুলোতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও সংকট তৈরি হয়েছে৷ শ্রীমঙ্গলের নিরালা পুঞ্জি ছাড়া অন্যকোন পুঞ্জিতে নেই সরকারি কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়৷

বাকি এগারোটি পুঞ্জিতে খাসিয়ারা নিজেদের ব্যক্তি উদ্যোগে এবং কিছু যায়গায় এনজিওদের সহায়তায় শিশু শিক্ষা কেন্দ্র খুলেছেন৷ কিন্তু সেইসকল শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের অবস্থাও নাজুক৷

খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রচার সম্পাদক সাজু মারছিয়াং বলেন, দেশের শিক্ষার হার শতভাগে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার যেখানে ব্যতিব্যস্ত, উল্টোদিকে সিলেটের খাসিয়া নৃগোষ্ঠীর মানুষের কাছে শিক্ষা গ্রহণ এক ধরনের ‘বিলাসিতা’। পর্যাপ্ত সরকারি বিদ্যালয় না থাকায় ও যাতায়াত সমস্যার কারণে খাসিয়া শিশুরা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না। বহু কষ্টে খাসিয়াদের সন্তান প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারলেও এই শিশুদের অর্ধেকই বাসস্থানের কাছাকাছি মাধ্যমিক বিদ্যালয় না পেয়ে শিক্ষা জীবনের ইতি টানছে।

এদিকে চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়েও সংকটে আছেন খাসিয়ারা৷ পুঞ্জি থেকে উপজেলা বা জেলার হাসপাতালগুলোর দূরত্ব ও পরিবহনের অপ্রতুলতাই এর জন্য দায়ী বলে মনে করেন তারা৷

লাউয়াছড়া পুঞ্জির জেসি পতমী বলেন, সিলেট বিভাগের লাউয়াছড়া ও মাগুরছড়া বাদ দিলে বাকি সব পুঞ্জিরই চিকিৎসা ব্যবস্থার অবস্থা নাজুক৷

জুলেখা পুঞ্জির মান্ত্রী মিন সুমের বলেন, আমাদের পুঞ্জিগুলোতে টিকাদান বা ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর জন্যও কেউ আসে না৷

শ্রীমঙ্গলের উপজেলা নির্বাহী অফিসার নজরুল ইসলাম বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে খাসিয়া পুঞ্জিগুলোর সমস্যার সমাধার করা হবে। তাছাড়া পুঞ্জিগুলোতে স্কুল নির্মাণের জন্যও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে৷

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.