হৃদয় দাশ শুভ, শ্রীমঙ্গল | ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
দুয়ারে কড়া নাড়ছে বাঙ্গালি সনাতন ধর্মাম্বলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। আগামী ৪ অক্টোবর সায়ংকালে ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে ৫দিনব্যাপি দুর্গোৎসবের সূচনা হবে। ইতোমধ্যে সনাতন ধর্মাম্বলম্বীদের ঘরে ঘরে বইছে পূজার আনন্দ। একইসাথে ঘরে ঘরে নতুন কাপড়ের ঘ্রাণ। তবে এ আনন্দ থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের বেশীরভাগ শ্রমিক ও তাদের সান্তানরা।
যেখানে শ্রীমঙ্গল শহরের বিপণী বিতানগুলো সেজেছে নতুন রঙে, সবাই ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা নিয়ে। ঠিক তারই উল্টো চিত্র সেখানকার চা বাগানগুলোর বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে। সেখানে চিত্রটা এমন, বেশীরভাগ শ্রমিকেরই নেই নতুন কাপড় কিনে উৎসবে মাতোয়ারা হওয়ার সুযোগ, তাই তাদের ভরসা পুরনো কাপড়ের উপরেই।
যদিও দুর্গা পূজা উপলক্ষে চা বাগানের হাটগুলোতেও বিকিকিনি হচ্ছে কাপড়-চোপড়ের, কিন্তু সেখানে বিক্রি হচ্ছেনা কোন নতুন কোন কাপড়। সেখানে শুধুই বিক্রি করা হচ্ছে মানুষের ব্যবহার করা পুরনো কাপড়। আর সেসবই চা শ্রমিকদের কাছে বিক্রি করছেন হকাররা।
সরেজমিনে শ্রীমঙ্গলের কয়েকটি চা বাগানের পূজার হাটে গিয়ে দেখা যায়, পুরনো কাপড়ের স্তূপ নিয়ে বসেছেন হকাররা। আর চা শ্রমিকরা সেই পুরনো কাপড়ের বান্ডিল থেকেই কিনে নিচ্ছেন নিজের প্রয়োজনীয় পূজার পোশাক।
কালীঘাট চা বাগানের হাটে কথা হয় চা শ্রমিক সন্তোষ বাউরির সাথে। তিনি বলেন, “আমরা নতুন কাপড় কেনার পয়সা কই পামু বাবু? আমরা পূজা পার্বণ হইলে এইসব কাপড়ই কিনি। যারা একটু পয়সাওয়ালা তারা নতুন কাপড় কিনতে পারে।”
চা বাগানে ফেরি করে কাপড় বিক্রি করতে আসা রাসেল নামের এক হকার জানান, “আমরা এসব কাপড় ঢাকার বেগমগঞ্জ থেকে পাইকারি কিনে আনি, মূলত পুরনো হয়ে যাওয়া যেসব কাপড়ের বিনিময় মানুষ বাসনকোসন কিনে সেইসব কাপড় আমরা এখানে বিক্রি করি। পূজা এবং পৌষ সংক্রান্তিতে আমাদের আনা কাপড়গুলো বেশ ভালোই বিক্রি হয়।
পুরনো কাপড়ের বান্ডিল থেকে নিজের দুই সন্তানকে হাট থেকে কাপড় কিনে দিচ্ছিলেন লছমী রিকিয়াশন নামের এক নারী চা শ্রমিক। স সময় কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, “১০২ টাকা মজুরী পাই আমরা সেই টাকায় সংসার চালানোই কষ্টকর, নতুন কাপড় কেনার মত টাকা আমাদের কাছে থাকে না। কিন্তু পূজা পার্বণে বাচ্চাগুলারে কিছু না দিলেও তো চলে না তাই বাধ্য হয়ে এখান থেকে পুরনো কাপড় কিনে নিয়ে যাই। তাতে অন্তত বাচ্চাদের মুখে কিছুটা হাসি ফোটে।”
শ্রীমঙ্গলের ৪০ টি চা বাগানের বেশীরভাগেরই চিত্র এরকম। প্রতিদিন বিকেল থেকে হাট বসে বাগানের নাটমন্দির বা তার আশে পাশের এলাকায় সেখানে কাপড় কিনতে দলবেঁধে আসেন চা শ্রমিকরা কিন্তু বেশীরভাগ চা শ্রমিকই পুরনো কাপড় কিনেই বাড়ি নিয়ে যান, একটু অবস্থা সম্পন্ন চা শ্রমিকরা শহরে আসে কেনাকাটা করতে পারেন তবে তাদের সংখ্যাও সীমিত, যারা শহরে কেনাকাটা করতে আসেন তারাও সাধ এবং সাধ্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে না পেরে তুলনামূলক কম দামের পণ্যগুলো কিনে নিয়ে যান।
চা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘চা শ্রমিকের অধিকার আন্দোলনের’ আহ্বায়ক নয়ন নায়েক সিলেটটুডে ২৪কে বলেন “চা শ্রমিকরা মজুরির দিক থেকে এমনিতেই বঞ্চিত, উৎসব পার্বণে চা শ্রমিকদের দীনতা আরও বেশী করে ফুটে ওঠে, যেখানে দুইবেলা ভাত খাওয়াই সবার পক্ষে সম্ভব না সেখানে তারা নতুন কাপড় কিনবে কিভাবে? চা শ্রমিকরা যেহেতু দেশের অর্থনীতিতে এক বিশাল ভূমিকা রাখছে তাই আমাদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দাবী প্রত্যেক চা শ্রমিককে সরকারীভাবে যাতে উৎসব ভাতা প্রদান করা হয়, উৎসব ভাতা প্রদান করলে চা শ্রমিকরা অন্তত পূজার পাঁচটা দিন একটু খুশী থাকতে পারবে তারা।”