নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
স্টলের পেছনে একটি ব্যানারে লেখা- ‘বৃক্ষ ভিক্ষা’। স্টলটির সামনে কয়েকটি প্ল্যাকার্ড। যাতে লেখা রয়েছে- ‘বৃক্ষ ভিক্ষা দিন’। সিলেটে হওয়া বিভাগীয় বৃক্ষমেলায় গিয়ে একটি স্টলে দেখা যায় এমন ব্যানার আর প্ল্যাকার্ড।
বৃক্ষমেলায় বৃক্ষের প্রদর্শনী আর বিক্রি হয়। মেলায় স্টল দেন সাধারণত বিক্রেতারা, নার্সারি মালিকরা। এসব স্টল থেকে গাছ কিনে নিয়ে যান ক্রেতারা। অথচ এই মেলায় বৃক্ষ বিক্রির বদলে সংগ্রহের স্টল। স্টলটি ‘ভূমিসন্তান বাংলাদেশ’ নামের একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের। তাদের স্টলে গাছ বিক্রি হয় না। উল্টো মেলায় আসা ক্রেতা আর দর্শনার্থীদের কাছ থেকে গাছ সংগ্রহ করা হয়।
মেলায় আসা নানা শ্রেণিপেশার মানুষ গাছ কিনে নেওয়ার পাশাপাশি স্বেচ্ছায় দু’একটা গাছ ‘ভিক্ষা’ প্রদান করেন এই সংগঠনকে। এভাবে এবছর প্রায় এক হাজার গাছ সংগ্রহ করে ভূমিসন্তান-এর সদস্যরা। গত আগস্টে হওয়া বৃক্ষমেলা থেকে ‘ভিক্ষায়’ পাওয়া এসব বৃক্ষ সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে চলছে সিলেটের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রোপণের কাজ।
![]()
সর্বশেষ গত শনিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সুনামগঞ্জের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ করে ভূমিসন্তান। এরআগে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শহরতলীর লাক্কাতুরা এলাকার সিলেট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, খাদিমনগর প্রফুল্ল পাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষভিক্ষায় প্রাপ্ত বৃক্ষ রোপণ করা হয়।
তবে এবারই প্রথম নয়, ২০১৪ সাল থেকে এভাবে প্রতিবছর বৃক্ষমেলার সময় ‘বৃক্ষভিক্ষা’ কর্মসূচির আয়োজন করে ভূমিসন্তান। মেলায় পাওয়া গাছগুলো পরে রোপণ করা হয় বিভিন্ন স্থানে। এ নিয়ে সিলেটজুড়ে প্রায় পাঁচ হাজার গাছ রোপণ করেছে ভূমিসন্তান।
পরিবেশ সুরক্ষায় ছয় বছর ধরে ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগসহ আরও নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সিলেটে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে পরিবেশবাদী এই সংগঠনটি। প্রশংসা কুড়াচ্ছে সকল মহলের।
![]()
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শারফ উদ্দিন এমন উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, বিপন্ন পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষভিক্ষা একটি চমৎকার। এটি বৃক্ষরোপণে সকলকে উৎসাহিত করবে।
তিনি বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় সারা পৃথিবীতে এধরণের কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। সভ্যতা বিনির্মাণে কোনোভাবেই যেনো প্রাণপ্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে যত্নবান হতে হবে।
সিলেটের বিভিন্ন পেশার কয়েকজন তরুণ ও যুবক মিলে ২১০২ সালে গড়ে তুলেন ‘ভূমিসন্তান বাংলাদেশ’। ২০১৪ সালের আগস্টে সিলেটের সুরমা নদীতীরের কিনব্রিজ এলাকায় বৃক্ষমেলায় ‘বৃক্ষভিক্ষা’র আহ্বান নিয়ে প্রথমবারের মতো অংশ নেয় ভূমিসন্তান বাংলাদেশ।
এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগে প্রথম বছরেই ব্যাপক সাড়া মিলে। প্রথম দুই বছরে বৃক্ষভিক্ষা থেকে সংগৃহিত ১ হাজার ৩০০ চারা রাতারগুল জলারবনে রোপণ করে ভূমিন্তান।
![]()
কেবল স্টল দিয়েই বৃক্ষ সংগ্রহ করে না ভূমিসন্তান। বরং ‘বৃক্ষভিক্ষা’র আহ্বান নগরীর বিভিন্ন সড়কে সড়কে ঘুরে বেড়ান সংগঠনটির সদস্যরা। যান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। এতে সংগঠনটির সদস্যদের পাশাপাশি অংশ নেন নগরীর পরিবেশ সচতেন সাধারণ মানুষেরাও। শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হয় এতে। এবার বৃক্ষরোপণে ব্যাপকভাবে অংশ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
গাছ লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ মনে না করে বছরজড়েই এগুলো দেখভাল ও পরিচর্যা করেন ভূমিসন্তান। বৃক্ষনিধন বন্ধ ও বৃক্ষরোপণে মানুষকে উৎসাহিত করতে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মসূচিও পালন করে তারা।
ভূমিসন্তান বাংলাদেশের সমন্বয়ক আশরাফুল কবীর বলেন, ভিক্ষাবৃত্তিকে একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে ধরা হয়। আমরা সেই ব্যধিকে আমাদের হাতিয়ার বানাতে চাই। এ ভিক্ষা পরিবেশের জন্য, এ ভিক্ষা বেঁচে থাকার জন্য। এ ভিক্ষা সমাজকে নাড়া দিয়ে আবারো জাগানোর জন্য।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, পাল্টে যাচ্ছে জলবায়ু আর এর সাথে অস্তিত্ব সংকটের দিকে যাচ্ছি আমরা। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের অন্যতম উপায় বৃক্ষরোপণ। বৃক্ষভিক্ষার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে গাছ কিনতে এবং সে গাছ রোপণে উৎসাহিত করি। গত ৬ বছরে আমরা সিলেটের সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। এখন অনেকে ডেকে নিয়ে আমাদের বৃক্ষ উপহার দেন আবার কোথাও বড় কোনো গাছ কাটা হলেও মানুষ আমাদের ফোন করে অভিযোগ জানায়।