নিজস্ব প্রতিবেদক | ০২ অক্টোবর, ২০১৯
‘পত্রিকায় নামটা দিয়ে না বাবা, কিচ্ছু না থাকলেও তো একটা সমাজ আছে’।- আলাপ শেষে ওঠে যাওয়ার সময় এমন আকুতি জানালেন বৃদ্ধ। সোমবার সকালে সিলেট নগরীর বাগবাড়ি এলাকার সরকারী শিশু পরিবারের গিয়ে কথা হয় আনুমানিক ষাট-পয়ষট্টি বছর বয়সী এই বৃদ্ধের সাথে। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ এলাকায় তার বাড়ি। প্রবাসে ছিলেন ২৫ বছর। টাকা জমিয়ে দেশে ফিরে পাথর ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমদিকে লাভও করেন বেশ। কিন্তু শেষদিকে এসে টানা লোকসান গুণতে থাকেন। শেষমেষ একেবারে ফতুর অবস্থা।
ব্যবসার এই ধাক্কা পড়ে শরীরের উপরও। ২০১৬ সালে স্ট্রোক করেন তিনি। শরীরের ডানপাশ অবশ হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসায় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। একপর্যায়ে স্ত্রী-সন্তানও মুখ ফিরিয়ে নেয়। অভিমানে ২০১৭ সালের একদিন বাড়ি ছেড়ে সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.) দরগাহ প্রাঙ্গণে আশ্রয় নেন তিনি। মাজারেই ছিলো থাকা-খাওয়া। সেখান থেকে ওইবছরই সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মীরা তাকে নিয়ে সিলেট সরকারী প্রবীণ নিবাসে।
প্রবীণ নিবাস নিয়ে সন্তুষ্টির কথাই জানালেন বৃদ্ধ। বলেন, ‘এইটার কথা তো আগে আজনতাম না। জানলে মাজারে না গিয়ে সরাসরি এখানেই আসতাম। এখানে এসে নতুন একটি পরিবার পেয়েছি।’
মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) ছিলো বিশ্ব প্রবীণ দিবস। প্রবীণ দিবসে সিলেট সমাজসেবা কার্যালয় পরিচালিত প্রবীণ নিবাসে গিয়ে আলাপ হয় এই বৃদ্ধের সাথে।
২০১৬ সাল থেকে সিলেটে চালু হয় এই প্রবীণ নিবাস। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সরকারী শিশু পরিবার (বালক) ও সরকারী শিশু পরিবার (বালিকা)- তে প্রবীণদের জন্য ৫টি করে আসনের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে এই দুই জায়গায় ৫ জন করে প্রবীণ নারী ও পুরুষ রয়েছেন।
অন্যর বাসায় কাজ করতেন ইসমত আরা। শরীরে ডায়াবেটিকস ধরা পড়েছে। আর কাজ করতে পারেন না। একমাত্র মেয়ের বিয়ে গেছে। বাড়িতে দেখার কেউ নেই। তাই ইসমত আরার ঠিকানা হয়েছে নগরীর রায়নগর এলাকার সরকারী শিশু পরিবার (বালিকা)।
সিলেটের শিশু পরিবারগুলোর উপ তত্ত্বাবধায়ক জয়িতা দত্তও জানালেন, এইখানে থাকা প্রবীণদের বেশিরভাগই এসেছেন বাড়ি থেকে অভিমান করে। কেউ কেউ আবার এসেছেন বাধ্য হয়ে। আর্থিক সঙ্কট আর পরিবারের দেখভালের কেউ না থাকার কারণে।
খাওয়া-পরার কোনো অভিযোগ নেই প্রবীণ নিবাসের বাসিন্দাদের। তবে থাকার কক্ষ নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ আছে তাদের। একটি ছোটকক্ষেই গাদাগাদি করে থাকতে হয় পাঁচজনকে। এতে অনেকসময় নিজেদের মধ্যে বাদানুবাদও লেগে যায়। আবার শিশু পরিবারগুলোতে একসাথে থাকতে হয় বলে সবসময় শিশুদের হৈ-হুল্লোড় সহ্য করতে হয় তাদের। বিকেলে এমনকি অনেকসময় রাতেও বাচ্চাদের চিৎকার-চেচামেচিতে বিরক্ত হন তারা। আছে স্যানিটেশন সমস্যাও।
উপ তত্ত্বাবধায়ক জয়িতা দত্ত বলেন, শিশু পরিবারে প্রবীণদের রাখা হলেও তাদের জন্য আলাদা কক্ষ তৈরি হয়নি। আলাদা লোকবলও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তাদের আলাদা বিনোদনের ব্যবস্থাও নেই। ফলে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়। তাদেরও কিছুটা সমস্যা হয়। এখানে যারা কর্মী আছেন তারা শিশুদের দেখভালে অভিজ্ঞ। কিন্তু শিশু ও একজন পৌঢ় মানুষের মনস্তত্ব তো আলাদা। তাদের আলাদাভাবে দেখভাল করতে হয়। এজন্য আলাদা কোনো লোক নেই এখানে।