নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৫
তিনি মৌলভীবাজারেরই সন্তান। বছর দু'য়েক পূর্বপর্যন্তও মৌলভীবাজারই ছিলো তার ঠিকানা। স্থানীয় পৌর চেয়ারম্যান, এরপর সাংসদ হিসেবে সুখে দুঃখে মৌলভীবাজারবাসীর পাশেই থেকেছেন তিনি। সোহাগে-শাসনে স্থানীয় জনতার সাথে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন তৈরি হয়েছিলো তাঁর। হয়ে উঠেছিলেন সত্যিকারের জননেতা।
বছর দু'য়েক আগে মৌলভীবাজারের মহসিন আলী হয়ে উঠেন দেশের মন্ত্রী। সমাজ কল্যান মন্ত্রী। স্থানীয় নেতা থেকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন এই মুক্তিযোদ্ধা। সংগত কারণেই মৌলভীবাজার ছেড়ে তাকে ঢাকার বাসিন্দা হতে হয়। তবে নিজ এলাকার সাথে বিচ্ছেদ হয়নি কখনোই। নিয়মিতই আসতেন এলাকায়। মন্ত্রী আসলে একটা উৎসবের আমেজ দেখা দিতো নেতাকর্মীসহ শুভানুধ্যায়ীদের মাঝে।
আজ (বুধবার) আবার মৌলভীবাজার আসছেন মহসিন আলী। প্রিয় নেতা আসছেন, মন্ত্রী আসছেন, তবু কোথাও কোনো উৎসব নেই, কোথাও কোনো আনন্দ নেই। সর্বত্র কেবল বিষাদ। সবখানে কেবল শোক। যেনো শোকের ছাদর পড়েছে এই ছোট্ট-ছিমছাম শহর।
দোকানপাট থেকে অফিস আদালত, স্কুল কলেজ থেকে মসজিদ মন্দির- মঙ্গলবার সর্বত্রই ছিলো একই আলোচনা, মহসিন আলীর মৃত্যু। মহসিন আলীর জন্য শোকগাঁথা।
শোকে স্তব্দ, বিষাদগস্ত মৌলভীবাজার জুড়ে এখন কেবল প্রিয় নতার জন্য অপেক্ষা। শেষ প্রিয় মুখটা দেখার অপেক্ষা।
সৈয়দ মহসীন আলীর মৃত্যুতে মৌলভীবাজারের সব সড়ক যেন মিশেছে মন্ত্রীর মৌলভীবাজার শহরের ৩৬ শ্রীমঙ্গল সড়কের বাড়িতে। বাড়ির চারপাশে কোন দেওয়াল নেই। সবখানে লোকে লোকারণ্য। প্রিয় নেতার জন্য সবার সকরুণ অপেক্ষা। প্রিয় নেতা, প্রিয় মানুষকে একনজর দেখার অনন্তহীন প্রতীক্ষা!
বাড়িতে জড়ো হয়ে অনেকেই ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করছেন, দোয়া করছেন, মহসিন আলীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন, আবার বিলাপ করছেন কেউ কেউ। এর ফাঁকেই চলছে প্রিয় নেতাকে শেষ বিদয় জানানোর প্রস্তুতি।
সৈয়দ মহসিন আলীর নামাজে-জানাযা আজ বিকেল ৪টায় মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হবে।
মন্ত্রীর ছোট ভাই সৈয়দ সলমান আলী জানান, বেলা ১টায় হেলিকপ্টারযোগে মৌলভীবাজার স্টেডিয়ামে মরদেহ নিয়ে আসা হবে। সেখান থেকে ৩৬ শ্রীমঙ্গল সড়কের দর্জির মহলের বাসায় নিয়ে আসা হবে মরদেহ। বেলা ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত স্থানীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। বিকেল ৪টায় নামাজে জানাযা শেষে হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা (রঃ) এর দরগাহ প্রাঙ্গণে তাঁকে শায়িত করা হবে।
মৌলভীবাজারের জ্যেষ্ঠ আওয়ামীলীগ নেতা, জেলা পরিষদ প্রশাসক আজিজুর রহমান জানান, সুষ্ঠুভাবে নামাজে-জানাযা অনুষ্ঠানের জন্য মাঠ তৈরী সহ সবধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এজন্য দলীয় নেতাকর্মী সহ স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছেন।
তিনি জানান, দলীয় নেতাকর্মীসহ পুরো শহরবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে শোকের আবহ।
সৈয়দ মহসীন আলী আওয়ামী লীগ নেতা হলেও শহর মৌলভীবাজারের সবার আপনজন। তাই আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাম দলগুলোর নেতাকর্মীদের সবার চোখে জল।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, নিজ দল আওয়ামীলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সাধারণ মানুষেরা প্রিয় নেতার বাড়িতে ভিড় জমান।
মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র এবং জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল করিম ময়ূন বলেন, আওয়ামীলীগ করলেও সকল দল ও মতের মানুষের সাথে তাঁর ছিলো বন্ধুতপুর্ণ। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলের মানুষের অভিভাবক।
মঙ্গলবার রাত ১০টা ৫০ মিনিটে সিঙ্গাপুর থেকে মহসিন আলীর মরদেহ ঢাকায় এসে পৌঁছে। এরপর তার মরদেহ ৩৪ মিন্টু রোডস্থ সরকারি বাসভবন নেওয়া হয়। বুধবার সকাল থেকে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মরহেদ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে রাখা হবে।
বেলা সাড়ে ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনে তার প্রথম নামাজে জানাজার পর দুপরে ১২টার দিকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকা থেকে মৌলভীবাজারে নিয়ে আসা হবে।
১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার ভোরে সিঙ্গাপুর জেলারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মহসিন আলীর মৃত্যু হয়।
নিউমোনিয়া, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের সমস্যা নিয়ে ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হন মন্ত্রী। সেখানে তাকে লাইফ সাপোর্টে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ৫ সেপ্টেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়।
২০০৮ এবং ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য হওয়ার আগে মৌলভীবাজার পৌরসভায় পরপর ৩ বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন সৈয়দ মহসিন আলী।