দেবকল্যাণ ধর বাপন | ১১ এপ্রিল, ২০২০
বিশ্ব কাঁপিয়ে বাংলাদেশেও ঢুকে পড়েছে করোনাভাইরাস। দেশজুড়ে এখন করোনা আতঙ্ক। এ ভাইরাস নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে সিলেট নগরবাসী ঝুঁকেছে হ্যান্ড গ্লাভস ও ফেস মাস্কের দিকে। কিন্তু ব্যবহারের পর এসব মাস্ক আর গ্লাভস ফেলে দেওয়া হচ্ছে যত্রতত্র। ফলে ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
নগরের অলিগলিতে এখন এসব ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রী পড়ে থাকতে দেখা যায়। এমনকি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অভ্যন্তরেও যত্রতত্র ফেলে রাখা হয়েছে হ্যান্ড গ্লাভস ও ফেস মাস্ক। এছাড়াও নগরীর বেশ কয়েকটি ফার্মেসির সামনেও দেখা যায় পরিত্যক্ত মাস্ক আর গ্লাভস ফেলা রাখা হয়েছে।
এতে ভয়ানক ছোঁয়াচে করোনা নিয়ে আরও আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। ব্যবহৃত এসব জিনিস থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি আর বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। ব্যবহৃত এসব জিনিস থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্র থেকে ভাইরাসটি অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে।
সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক সুলতানা রাজিয়া সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মাস্ক, গ্লাভস শুধুমাত্র করোনাভাইরাস নয়, সব ধরনের জীবাণু থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। তবে যত্রতত্র মাস্ক, গ্লাভস ফেলা দেওয়া ঠিক নয়। এতে অবশ্যই স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকে। এজন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যবহৃত মাস্ক, গ্লাভস ফেলতে হবে। আর যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসবেন তাদের ব্যবহৃত মাস্ক, গ্লাভস অবশ্যই পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
শুক্রবার সিলেট নগরীর মির্জাজাঙ্গাল, জিন্দাবাজার, মেডিকেল রোড, বিকাবীবাজার, কাজলশাহ, মধুশহীদ, চৌহাট্টা, এমনকি সিলেট সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অভ্যন্তরে ঘুরে দেখা মিলেছে যত্রতত্র ফেলে রাখা মাস্ক ও গ্লাভসের।
সংক্রমণ এড়াতে সকলকে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থানের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। জরুরি প্রয়োজনে বের হলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফলে অধিকাংশ নগরবাসী ঘর থেকে বের হলে সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করছেন। নগরের নিম্নআয়ের মানুষদের মধ্যে এখন মাস্ক ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।
কিন্তু ব্যবহার নিশ্চিত হলেও নিশ্চিত হচ্ছে না ব্যবহারের পর এসব সামগ্রীর নিরাপদ নিষ্পত্তি। মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভসসহ অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের পর তা সতর্কতার সঙ্গে ময়লার ঝুড়িতে ফেলতে বলা হলেও তা মানছেন না অনেকেই। ফলে এসব মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস পড়ে থাকতে দেখা গেছে নগরীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে ও ফুটপাতে।
শুক্রবার নগরীর রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছিলে সোহাগ নামের এক তরুণ। রাস্তায় তার পায়ের কাছেই ফেলে রাখা ছিলো এক জোড়া হ্যান্ড গ্লাভস। তা দেখে সোহাগ বলেন, রাস্তার পাশে এসব মাস্ক, গ্লাভস যারা ফেলছেন, তারাও তো কেউ না কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। এগুলো তো আমাদের ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সিলেটের পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী আশরাফুল কবির বলেন, সারাবিশ্ব যখন করোনাভাইরাস আতঙ্কে কাঁপছে, ঠিক এ মুহূর্তে নগরবাসীর এমন কর্মকাণ্ড অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। যেখানে সারাবিশ্বে মানুষ করোনা সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, সেখানে কিছু অসচেতন নাগরিকের জন্য আমরা পরতে যাচ্ছি মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। যত্রতত্র ব্যবহৃত গ্লাভস-মাস্ক ফেলায় আমরা করোনাসহ অন্যান্য রোগের মুখোমুখি হচ্ছি প্রতিনিয়ত। এখনই নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে।
ব্যবহৃত পরিত্যক্ত মাস্ক আর গ্লাভস থেকে নগরবাসীর থেকেও পরিছন্নতাকর্মীরা বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের যারা পরিচ্ছন্নকর্মী রয়েছে, তারাই বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। কেননা রাস্তার বা যত্রতত্রে পরে থাকা এসময় মাস্ক বা গ্লাভস পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনিও আক্রান্ত হতে পারেন।
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এটি একটি নতুন সমস্যা। এই ব্যাপারটা আমারও চোখে পড়েছে দুই একদিন আগে। অনেকে সচেতনতার নামে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করছেন। তবে এখন থেকে নিজেদের সুরক্ষার কথা ভেবে ব্যবহৃত পরিত্যক্ত মাস্ক আর গ্লাভস নগরবাসীকে যত্রতত্র ফেলা থেকে বিরত থেকে নির্দিষ্ট স্থানেই ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে বলে জানান এ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
শনিবার থেকে সিলেট সিটি করপোরেশনের করোনাভাইরাস নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারগাড়ি থেকে এ বিষয়ে সচেতনামূলক প্রচারণা চালোনো হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা এখনো নগরবাসীকে সচেতন করাতে পারিনি। আমরা নগরবাসীর সুরক্ষার কথা চিন্তা করে প্রতিদিনই নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সচেতনতামূলক প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। তবুও নগরবাসী সচেতন হচ্ছেন না। এখনই সময় সকলকে সচেতন হওয়ার, না হলে এর জন্য আমাদের অনেক বড় মূল্য চুকাতে হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যে বা যারা নগরীর যত্রতত্র ব্যবহৃত হ্যান্ড গ্লাভস ও ফেস মাস্ক ফেলে যাচ্ছেন তারা নিজেদের পরিবারের সাথে সাথে দেশকেও বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। কারণ পরিত্যাক্ত এ গ্লাভস ও মাস্ক থেকে দ্রুতই ছড়াতে পারে সংক্রমণ। সবচাইতে বিপদজনক মানুষের ব্যবহৃত গ্লাভস।
এ ব্যাপারে ওসমানী মেডিকেল কলেজের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বর্তমান সময়ে মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহার করা ভালো। তবে এগুলো যত্রতত্র ফেলা ঠিক না। আমাদের মেডিকেলেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়। তারপরও কিছু মানুষ যত্রতত্র ফেলে দেন। শুধু মেডিকেলে নয় সারা শহরেই এভাবে যত্রতত্র ব্যবহৃত মাস্ক গ্লাভস ফেলা হয়। এটা বিপদজনক হতে পারে। তাই আমরা আমাদের পরিচ্ছন্ন কর্মীদের হেবি ডিউটি গ্লাভস দিয়েছি। তারা এসব সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলেন। মাস্ক ব্যবহার করা ভালো, তবে ব্যবহারের পর সঠিক জায়গায় ফেলার ব্যাপারে সবাইকে আরও সর্তক হতে হবে।
তিনি বলেন, এখন সবাই মাস্ক ব্যবহার করছেন। তাই বলে সবাই যে ব্যবহৃত মাস্ক পোড়াতে হবে না। শুধুমাত্র যারা করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসবেন তাদের ব্যবহৃত মাস্ক, গ্লাভস পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কাপড়ের তৈরি মাস্কগুলো একবার ব্যবহার করে ধুয়ে রোধে শুকিয়ে ইস্ত্রি করে আবার ব্যবহার করা যাবে এবং মাস্ক ব্যবহারের নিয়ম মানতে হবে।