তাহিরপুর প্রতিনিধি | ১৪ এপ্রিল, ২০২০
হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল হারানোর ঘটনা কৃষকসহ সাধারণ মানুষকে ব্যথিত করে। প্রতি বছরের মত এবারও প্রতিটি হাওরে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও যেকোনো সময় আগাম বন্যায় পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তেমনি রয়েছে শ্রমিক সংকটও। এবার নতুন করে করোনাভাইরাস হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দুর্দশায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা। ফলে জমির ধান জমিতেই পড়ে থাকার আশঙ্কায় হাওরপাড়ের কৃষক পরিবারসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় বিরাজ করছে।
জানা যায়, স্থানীয় শ্রমিকরাও করোনায় ঘরবন্ধী। ফলে হাওরে ধান কাটার শ্রমিকরা ধান কাটতে যেতে বিমুখ। আবার যে সকল স্থানীয় শ্রমিকেরা ধান কাটতে রাজি তাদের মজুরির পরিমাণ বেশি। করোনায় পর্যাপ্ত শ্রমিক না পাওয়া গেলে নির্ধারিত সময়ে কৃষকেরা তাদের ফসল ঘরে তুলতে পারবেন না। ২০১৭ সালে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজে সীমাহীন দুর্নীতি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল হারানো সুনামগঞ্জসহ দেশের হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দুর্দশায় খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে তৈরি হয় সংকট। দুবেলা দুমুঠো খাদ্যের জন্য বেঁচে থাকার লড়াই করে হাজার হাজার অসহায় কৃষক পরিবার। যিনি যত বড় কৃষক তার ক্ষতির পরিমাণ তত বেশি। ধনী-গরীব সবাই এক কাতারে। কৃষকেরা দেনার দায় মেটাতে আর শ্রমিকেরা খাদ্য যোগাতে কাজের সন্ধানে প্রিয় গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দিতে বাধ্য হন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জসহ হাওর অঞ্চলের সাতটি জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ৯ লাখ ৩৬ হাজার ১০১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭২১ হেক্টর, উফশী ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬৪৫ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতরে ধান ১১ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। এবার সুনামগঞ্জে ২ লাখ ১৯ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে তাহিরপুর উপজেলায় এবার বোরো ফসল আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৭ হাজার ৫০০ হেক্টর। তবে সর্বশেষ ১৮ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ অর্জিত হয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান উদ দোলা জানান, এই পর্যন্ত আবাদকৃত জমিতে কোনও ধরনের সমস্যা নেই। কৃষকগণ তাদের কষ্টের ফলানো জমিতে ভাল ফলন পেয়েছে। উপজেলার হাওরগুলোতে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। কিছু দিনের মধ্যেই পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে। শ্রমিক সংকট নিরসনে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
এদিকে শ্রমিক সংকট নিরসনে ও শ্রমিকদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ ধান কাটার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের ত্রাণের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়াও তিনি বালুমহাল ও বারকি শ্রমিকদের ধান কাটার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এবার শ্রমিকদেরকে রাতে নিরাপদে থাকার জন্য স্থানীয় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলার সচেতন মহল জানান, হাওরের কৃষকদের করোনাভাইরাস ভীতি আর অন্যদিকে শ্রমিক সংকটের মধ্যে কীভাবে ধান কর্তন করবেন তা নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। বহিরাগত শ্রমিকেরা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। আবার স্থানীয় শ্রমিকেরাও যদি স্বাস্থ্যবিধি বা সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে কাজ করে তাহলেও এ ঝুঁকি থেকে যাবে।
তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের কৃষক আলী আহমদ জানিয়েছেন, শনির হাওরে তার জমি রয়েছে। ধান কাটার জন্য তিনি যে সকল শ্রমিকের সাথে কথা বলেছিলেন তারা করোনা পরিস্থিতির কারণে আসতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। ফলে স্থানীয় শ্রমিকদের দিয়ে ধান কাটাতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। কিন্তু স্থানীয় শ্রমিকেরা ৫০০-৭০০ টাকা বেশি দাবি করছেন।
তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের মাটিয়ান হাওরপাড়ের কৃষক মোস্তফা মিয়া বলেন, ধান কাটার মেশিন ক্রয় সহজলভ্য হলে কিংবা ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে দিলে সাধারণ কৃষকেরাও মেশিনটি ক্রয় করতে পারতো। ফলে ধান কাটায় অনেকটা সহযোগিতা হতো।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজেন ব্যানার্জি বলেন, বর্তমানে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য সবাইকে সর্তকতা অবলম্বন করে অন্য এলাকা থেকে যে সকল শ্রমিকেরা আসবে তাদেরকে আলাদা করে রাখার জন্য কৃষকদেরকে বলা হয়েছে।
উপজেলার সকল দিনমজুর, রিকশা, ভ্যান, অটো, মিশুক ও মোটরসাইকেল চালকদেরকে ধান কাটার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।