জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া, তাহিরপুর | ১১ মে, ২০২০
করোনা পরিস্থিতির কারণে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলসহ সারা দেশের মানুষ বর্তমানে ঘরবন্দি। এর ফলে কমেছে দূষণের মাত্রা। উন্মুক্ত হয়ে নিজেকে মেলে ধরার এখন সুযোগ পেয়েছে প্রকৃতি।
করোনাভাইরাস হয়তো একসময় চলে যাবে কিন্তু এ মহামারী যা কিছু দেখিয়ে শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে সত্যি তা বিরল। দুই-তিন মাস আগেও হাজার হাজার পর্যটকসহ স্থানীয় নানা বয়সের মানুষের পদভারে সবুজ বন ক্লান্ত ও বিবর্ণ ছিল।
যাদুকাটা নদী, বারেকটিলা, টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক, শিমুল বাগানসহ হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার পর্যটন স্পট। ব্যস্ততম এই এলাকা মানুষের পদভারে থাকা এ স্থানের দৃশ্যে এখন একেবারেই ভিন্নতা। সেখানে এখন বাসা বেঁধেছে নির্জনতা, নির্মল বাতাস ও সবুজ ঘাসে।
বিজ্ঞাপন
সরেজমিনে দেখা যায়, যাদুকাটা এখন একেবারেই অচেনা। যে যাদুকাটায় হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় কর্মমুখর, ইঞ্জিনচালিত মেশিনের শব্দে মুখরিত থাকত পুরো যাদুকাটার চারপাশে এখন কেবলই নির্জনতা। নেই চিরচেনা ব্যস্ততা। জীবিকার তাগিদে হাজার হাজার নারী ও পুরুষের বালু, পাথর উত্তোলন, ইঞ্জিন চালিত নৌকার লোড-আনলোড করার চিত্র পাওয়া যায়নি। প্রকৃতির ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে চিরচেনা এ দৃশ্য।
নদীর ঘোলা পানি এখন স্বচ্ছ কাচের মতো। নদীতে থাকা মাছ সহ অন্যান্য প্রাণী পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। নদীরপাড়ে কেবলই নিস্তব্ধতা।
যাদুকাটা নদীসহ পর্যটন স্পটগুলোর বর্তমান পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। পাশাপাশি এসব প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রকৃতিবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেছেন তারা।
এ ব্যাপারে সচেতন মহল জানান, টাঙ্গুয়ার হাওর, বারেকটিলা, যাদুকাটা নদীসহ পর্যটন স্পটগুলোর পরিবেশ পুনরুদ্ধারে পরিবেশবাদী সংগঠন আন্দোলন করে আসলেও প্রকৃতি এখন আপন মনে তা গড়ে নিচ্ছে। করোনা নিষেধাজ্ঞার সুযোগকে পরিবেশগত পুনর্গঠনে কাজে লাগাতে পারলে তাহিরপুর উপজেলার এই অনিন্দ্য সুন্দর এলাকায় মন মাতানো দৃশ্যের সমারোহ ঘটবে।
যাদুকাটা নদীর পাড়ে চা বিক্রেতা জসিম উদ্দিন বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে প্রশাসনের কঠোর নিষেধাজ্ঞায় মানুষ যখন ঘরে বন্দি। প্রকৃতি তখন মুক্ত। নদীর পানি একদম পরিষ্কার হয়ে গেছে। কোনো ধরনের ময়লা নেই। নদীর পাড়ে এখন সবুজ ঘাস দেখা যাচ্ছে। এছাড়া শামুকের ছড়াছড়ি, কোন দুর্গন্ধ নেই যা গত ১৫ দিন আগেও দেখা যায়নি। যেহেতু এই সময়ে মানুষের চলাফেরা কম, তাই দূষণও এখন আগের মত নেই। পরিবেশ ফিরে পাচ্ছে তার হারানো সৌন্দর্য।
যাদুকাটা নদীতে পাথর শ্রমিক হৃদয় হাসান জানান, কাজ করতে পারছি না। টাকাও নেই, বড় অসহায় অবস্থায় আছি। নদীতে সারাদিন উৎসবমুখর পরিবেশে বালু পাথর উত্তোলন হতো, ফলে নদীর পানি নষ্ট হতো। এখন কাজ নেই গত এক মাস ধরে। ফলে নদীর পানি একেবারেই স্বচ্ছ টিউবওয়েলের পানির মতো। নদী এমন থাকলে ভাল দেখায় কিন্তু আমাদের তো না খেয়ে থাকতে হবে।
এ ব্যাপারে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজেন ব্যানার্জি বলেন, মানবসৃষ্ট নানা কারণে প্রকৃতি তার নিজস্ব রূপ হারিয়েছিল। বর্তমানে করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় সবাই সবার ঘরে অবস্থান করায় প্রকৃতি তার নিজস্ব রূপ ফিরে এসেছে এবং এটাই হওয়া উচিত।