নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৩ মে, ২০২০
সিলেট নগরীতে মশার উৎপাত কিছুতেই কমছে না। বরং বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর এ উৎপাত আরও বেড়েছে। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে সিলেটে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু আতঙ্ক। এমন আতঙ্কের মধ্যেই নগরীর দুটি ওয়ার্ডের ৫ টি স্থানে ডেঙ্গু বিস্তারকারী এডিস মশার লার্ভার সন্ধান পেয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন।
সিলেট সিটি করেপোরেশন (সিসিক) এর অভিযানে গত সপ্তাহে নগরীর ২৫ এবং ২৬ নং ওয়ার্ডের ৫ টি জায়গায় এডিস মশার লার্ভার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এতে নগরবাসীর মধ্যে ডেঙ্গু আতঙ্ক আরও বেড়েছে। এমনিতেই করোনার কারণে বিপর্যস্ত জনজীবন ও স্বাস্থ্যসেবা। এ অবস্থায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লে আরও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তাদের।
তবে সিসিক কর্তৃপক্ষ বলছেন, এডিস মশার লার্ভার অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও আতঙ্কিত হবার প্রয়োজন নেই। কারণ ইতোমধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন কর্মসূচীর বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়েছে। ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে ৫টি করে ওয়ার্ডকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। এ ব্যাপারে জুলাই পর্যন্ত একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেহেতু ২৫ এবং ২৬ নং ওয়ার্ডের এডিস মশার লার্ভার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে তাই সিসিকের প্ল্যানে ২৫ এবং ২৬ নং ওয়ার্ডকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
সিলেট সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা দাবি করেন, গতবার প্রস্তুতি কম থাকলেও এবার ডেঙ্গু মোকাবেলায় পুরোদমে প্রস্তুত সিসিক। কিন্তু করোনা সংকট আসায় এই কার্যক্রম এবং কর্মসূচির মধ্যে বেশ পরিবর্তন এসেছে। গতবছর প্রাথমিক পর্যায়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের ৬ থেকে ৭টি ওয়ার্ডে এডিস মশার অস্তিত্ব পেয়েছিলাম। সেই ওয়ার্ডগুলো থেকে এবারও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ এবং ২৬ নং ওয়ার্ডের এডিস মশার লার্ভার অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত অন্য ওয়ার্ডগুলোতে এডিস মশার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি গত বছর আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের বিপরীতে থাকা নার্সারিতে যে এডিস মশার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল, এবার সে জায়গায় এডিস মশার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এছাড়াও ২২, ৮, ১০ নং ওয়ার্ডেরও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেই ওয়ার্ডগুলোতেও এবার এডিস মশার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
সিসিকের স্বাস্থ্য শাখার কর্মকর্তারা জানান, নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এডিস মশার লার্ভা সংগ্রহ করা হয়েছে। আবার জুনের ১৫ তারিখের দিকে লার্ভা সংগ্রহ কাজ শুরু হবে। এরমধ্যে মশকনিধন কর্মসূচি চলমান থাকবে। এবং প্রতিটি ওয়ার্ডের মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বাড়ি বাড়ি সার্ভে কার্যক্রম ১৫ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কারণে এটা করা যাচ্ছে না। করোনা প্রকোপ কমে গেলে সিসিকের স্বাস্থ্যকর্মীসহ অন্যান্য শাখার কর্মীদের নিয়ে নাগরিক কমিটি গঠন করে বাড়ি বাড়ি জরিপ কর্মসূচি চলমান রাখা হবে।
বিজ্ঞাপন
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় সিসিক প্রস্তুত রয়েছে। গত শনিবার থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন কর্মসূচীর বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়েছে। ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে ৫টি করে ওয়ার্ডকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। আমাদের ডেঙ্গু প্রতিরোধে যে কর্মসূচি শুরু করেছি সেটা চলমান থাকবে। এ ব্যাপারে জুলাই পর্যন্ত একটি প্ল্যান করা হয়েছে। এই প্ল্যান অনুযায়ী কাজও চলমান থাকবে। এছাড়া এবার একটি স্বস্তির বিষয় হল গতবার যেভাবে ঢাকা থেকে রোগীরা এসে স্থানীয়দের আক্রান্ত করেছিলেন সেই শঙ্কাটা এখন পর্যন্ত নেই। কারণ সারাদেশে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় লকডাউন রয়েছে।
তিনি বলেন, গত ১০দিন থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের করণীয় নিয়ে নগরীতে মাইকিং করানো হচ্ছে। মশক নিধন করার আগে ওয়ার্ডের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার আওতায় আনা হচ্ছে। এবার সিলেট সিটি করপোরেশনের ম্যাপ ফলো করে একটি সাইড থেকে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। বর্তমানে ১, ৪,৫,৬ ও ২৬ নং ওয়ার্ডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন কর্মসূচীর বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। ১৩ মে থেকে ৭, ৮, ৯ ও ২০ নং ওয়ার্ডে কাজ শুরু করা হবে।
বিজ্ঞাপন
ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু জ্বর হয় এডিস মশার কামড়ে। নোংরা পানি, জলাশয়, ছড়া, খালে এডিস মশা জন্মায় না। এডিস মশার জন্ম হয় পরিষ্কার পানিতে, বাসা বাড়ির ভিতরে, আঙিনায়, বাসা বাড়িতে রাখা ফুলের টব, এসি, রেফ্রিজারেটরের পানি যেখানে জমে থাকে। এছাড়াও টায়ার টিউব, ডাবের খোসাসহ পরিত্যক্ত পাত্রের জমে থাকা পানিতে এডিস মশার জন্ম। বৃষ্টির জমা পানিতেও এডিস মশার লার্ভা জন্ম নেয়। যার ফলে বাসা বাড়ির ছাদেও এডিস মশার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তাই ডেঙ্গু মোকাবেলায় জনগণ সচেতন না হলে কোনো ভাল ফলাফল আসবে না।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় আমরা যতই চেষ্টা করি সত্যিকার অর্থে ততটা সফল হবো না যতক্ষণ পর্যন্ত প্রত্যেক নাগরিক তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করেন। সিসিকের বাসা বাড়ির যে ময়লা আবর্জনা আছে সেটা যদি যথাস্থানে রাখেন বা সিসিকের ময়লার ভ্যানে দিয়ে দেন তাহলে ওয়ার্ডগুলো অনেক পরিচ্ছন্ন থাকবে। কিন্তু আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি প্রতিটি ওয়ার্ডেই বাসা বাড়ির ময়লা পলিথিনে করে বাড়ির সামনে, পাশে রেখে দেন। না হয় ড্রেন ও ছড়ার মধ্যে ফেলেন। এখন সিসিকের যেমন দায়িত্ব আছে তেমনি নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন আছে। প্রতি নাগরিকের সামাজিক দায়িত্ব আছে। তারা যদি নিজের বাসা বাড়ি পরিষ্কার রাখেন, মশা জন্মানোর স্থানগুলো ধ্বংস করেন তাহলে মশা নিধন করা অনেক সহজ হবে। নাগরিকরা সচেতন না হলে মত শত চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
ডেঙ্গু মোকাবেলার প্রস্তুতি সম্পর্কে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাপসাতালের উপ-পরিচালক হিমাংশু লাল রায় বলেন, ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রস্তুত রয়েছে তাদের চিকিৎসা দিতে। এছাড়া ওসমানী হাসপাতালে পর্যাপ্ত কিট রয়েছে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য, যার মাধ্যমে রোগী শনাক্ত করা বা তাদের চিকিৎসার আওতায় আনতে খুব একটা সময় লাগবে না।