Sylhet Today 24 PRINT

হামহাম জলপ্রপাত রোমাঞ্চ প্রিয়দের হাতছানি দিচ্ছে কুরমার গহীন অরণ্য

সাজু মারছিয়াং, শ্রীমঙ্গল |  ০৮ জুন, ২০২৬

​"ঐ আসে ঐ ঘন গৌরবে নব যৌবনা বর্ষা, শ্যামল গম্ভীর সরসা, গুরু গর্জনে নীল অরণ্য শিউরে ওঠে উল্লাসে, ঝরে বারিধারা দিক-দিগন্তে অবিরল ত্রাসে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতার মতোই আকাশ ভেঙে নামা বৃষ্টির জলধারা যেন নতুন এক প্রাণস্পন্দন জাগিয়ে তুলেছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কুরমা বনবিটের গহীন অরণ্যে।

ইট-পাথরের যান্ত্রিক জীবন ছেড়ে যারা একটু রোমাঞ্চকর প্রকৃতির খোঁজে ব্যাকুল, তাদের জন্য এই বর্ষায় এক পরম তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে কুরমা বনবিটের দুর্গম এলাকার হাম হাম জলপ্রপাত। স্থানীয় আদিবাসীদের ভাষায় 'হাম হাম' শব্দটির অর্থই হলো, প্রবল বেগে পানি পড়ার শব্দ। বর্ষার এই ভরা যৌবনে জলপ্রপাতটি এখন তার নামের পূর্ণ সার্থকতা ছড়াচ্ছে।

​গহীন অরণ্যে প্রকৃতির এক বিস্ময়
​পাহাড়ের বুক চিরে, সবুজ অরণ্যের দেয়াল ভেদ করে প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০ ফুট ওপর থেকে আছড়ে পড়ছে টলমলে স্বচ্ছ জলের ধারা। ওপর থেকে নিচে পড়া সেই স্রোতধারা সমতলে বয়ে সৃষ্টি করেছে এক মায়াবী পরিবেশ। শুষ্ক মৌসুমে এই ঝর্ণার জলধারা কিছুটা ক্ষীণ হয়ে এলেও, বর্ষায় তা রূপ নেয় এক প্রমত্তা সুন্দরীতে। চোখ জুড়ানো এই হাম হাম জলপ্রপাতটি ইতিমধ্যেই কমলগঞ্জের পর্যটন খাতকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রশস্ততম জলপ্রপাত হিসেবে পরিচিত।

​আবিষ্কারের নেপথ্যে:
​২০১০ সালের শেষের দিকে পর্যটন ইকোট্যুর গাইড শ্যামল দেববর্মার সাথে একদল রোমাঞ্চ প্রিয় পর্যটক এই দুর্গম জঙ্গলে প্রবেশ করে প্রথমবার হাম হাম জলপ্রপাতটি আবিষ্কার করেন। এরপর ২০১১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে একটি দল এটি পরিদর্শন করার পর থেকেই দেশজুড়ে আলোচনা ও আকর্ষণের কেন্দ্রে চলে আসে এই প্রাকৃতিক বিস্ময়।

​রোমাঞ্চকর পথ এবং বন্য প্রকৃতির হাতছানি
মৌলভীবাজার জেলার ​কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে ইসলামপুর ইউনিয়নের রাজাকান্দি রেঞ্জের চম্পারায় চা-বাগান। এই কুরমা বনবিটের প্রায় ৮ কিলোমিটার গভীরে, ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত এই জলপ্রপাতটির অবস্থান। এখানে যাওয়ার পথটি মোটেও সহজ নয়, আর এখানেই লুকিয়ে আছে আসল অ্যাডভেঞ্চার।

​যোগাযোগের মাধ্যম: কমলগঞ্জ চৌমুহনা চত্বর থেকে চাম্পারায় চাবাগান পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার পাকা রাস্তায় হাইয়েস মাইক্রোবাস,জিপ চান্দের গাড়ি, তবে সিএনজি ও মোটরসাইকেল চাম্পারায় চা বাগানের কলাবন বস্তি ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লী 'তৈলংবাড়ী' পর্যন্ত আরও ৪-৫ কিলোমিটার এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। দুর্গম ট্র্যাকিং, তৈলংবাড়ী বা কলাবন বস্তি থেকে শুরু হয় মূল ট্র্যাকিং। পাহাড়ি আঁকা-বাঁকা, পিচ্ছিল, উঁচু-নিচু সরু পথ বেয়ে প্রায় ২ ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছাতে হয় ঝর্ণার কাছে। পথে ভারসাম্য বজায় রাখতে বাঁশের লাঠিই একমাত্র ভরসা।

​বন্য পরিবেশের অভিজ্ঞতা:
পথিমধ্যে পাড়ি দিতে হয় 'মাকাম' নামের এক বিশাল উঁচু টিলা বর্ষাকালে যা খুবই পিচ্ছিল থাকে। জারুল, চিকরাশি আর কদম গাছের ডালে ডালে দেখা মিলবে রঙ-বেরঙের পাখি আর প্রজাপতির। ডুমুর আর বাঁশ ক বেত বাগানের মাঝে হঠাৎ করেই দেখা পেয়ে যেতে পারেন দুর্লভ 'চশমা বানরের।

​ঝিরি পথ: বনের ভেতরের পাহাড়ি ঝিরি পথ ধরে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি ভেঙে এগোতে হয়। জলপ্রপাতের আধা কিলোমিটার দূর থেকেই কানে ভেসে আসে ঝর্ণার স্রোতের সেই চিরচেনা ধ্বনি, যা নিমিষেই দূর করে দেয় সব ক্লান্তি।

হামহাম ভ্রমনে আসা লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির শিক্ষার্থী হেরোলাস, ডিফ্রাংকি, সুহান ও ক্লিনটনরা জানান,আমাদের এলাকায় এত সুন্দর একটা জায়গা আছে তা আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতাম, কিন্তু কখনো আসা হয়নি। কলাবন থেকে ২ ঘণ্টায় যখন হাম হাম-এর মূল জায়গায় পৌঁছালাম, তখন এক নিমেষেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে মনটা ভরে গেল। ​ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা আশফাক করিম বলেন "হাম হাম দেখার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় এই বর্ষাকাল। এর রূপ দেখতে হলে একটু কষ্ট করে আসতেই হবে।

​পর্যটকদের জন্য বিশেষ সতর্কতা:
​পরিবেশ রক্ষা: চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের ফিল্টার, প্লাস্টিকের বোতল বা অব্যবহৃত খাবার বনের যেখানে-সেখানে ফেলে বনের পরিবেশ নষ্ট করবেন না। এগুলো ব্যাগে করে সাথে নিয়ে এসে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।

​প্রস্তুতি: পাহাড়ি ও পিচ্ছিল পথে হাঁটার জন্য অবশ্যই ভালো গ্রিপযুক্ত ট্র্যাকিং জুতো পরিধান করুন, এবং জোঁকের উপদ্রব থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকুন, সেখানে স্থানীয়রা ট্রেকিং এ ব্যবহার জন্য বাঁশের তৈরী লাঠি বিক্রি করে থাকে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.