Sylhet Today 24 PRINT

চট্টগ্রামে ‘বিহারী বগা’ নিয়ে তোলপাড়

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ০৯ অক্টোবর, ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াকিল হোসেন ওরফে ‘বিহারী বগা’ অবস্থান করছেন— এমন খবরে গত মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কার্যালয় ঘেরাও করে পুলিশ। তবে তাকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে ‘বিহারী বগা’কে নিজের গাড়িতে করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ভবন থেকে বের করে নিয়েছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তবে মেয়র এই অভিযোগ নাকচ করেছেন।

ওয়াকিল হোসেন ওরফে ‘বিহারী বগা’ চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। সম্প্রতি তাকে নিয়ে নানা অভিযোগ উঠার পর গত ৮ জুন তাকে সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে খুলশী থানায় অস্ত্র, বিস্ফোরক ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ২৩টি মামলা রয়েছে।

সম্প্রতি এক কলেজশিক্ষককে মারধরের ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে তার অনুসারীদের হামলায় ওসিসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার অভিযোগ করেছে পুলিশ। এর আগে ওসিকে মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগেও আলোচনায় আসেন ওয়াকিল।

অভিযোগ প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ওয়াকিল তার গাড়িতে উঠেছিলেন—এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারলে তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াবেন। এ বিষয়ে সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়েরও আহ্বান জানান তিনি। গত বুধবার (৭ অক্টোবর) নগরীর ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের ঈদগাঁ রূপসা বেকারি এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন মেয়র।

ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, তিনি সিটি করপোরেশন ভবন থেকে প্রকাশ্যেই গাড়িতে ওঠেন। ভবনের বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। ফলে ওয়াকিল তার গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেছেন- এমন অভিযোগ থাকলে ফুটেজ দেখিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না থাকলে যারা এ ধরনের দাবি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চসিক ভবনে ওয়াকিল আশ্রয় নিয়েছিলেন- এমন অভিযোগও অস্বীকার করেন মেয়র। তার ভাষ্য, ওয়াকিল নিজে তার কাছে আসেননি; বরং ওয়াকিলের দুই ভাই একটি অভিযোগ নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। মেয়র বলেন, ওয়াকিল যদি সিটি করপোরেশন ভবনের নিচে থেকেও থাকেন, তাকে গ্রেপ্তারের দায়িত্ব পুলিশের। কোনো ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি সিটি করপোরেশনের বাইরে অবস্থান করলে তাকে আইনের আওতায় আনা পুলিশের কাজ, মেয়রের নয়।

ওয়াকিলকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত করার বিরোধিতা করেন মেয়র শাহাদাত। তিনি বলেন, ওয়াকিল দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনেও তার ভূমিকা ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ওয়াকিলের বিরুদ্ধে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি মামলা করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন সবার জন্য উন্মুক্ত। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ নানা সমস্যা নিয়ে এখানে আসেন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর মেয়র নন; চট্টগ্রামের সব মানুষের মেয়র।

এদিকে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনের ক্ষোভ ও অভিযোগ প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মাথায় খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুর রহিমকে বিশেষ শাখায় (সিটিএসবি) বদলি করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সিএমপি কমিশনার হাসিব শওকত আলীর স্বাক্ষরিত এক আদেশে এই বদলি করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী। আদেশে বলা হয়, 'জনস্বার্থে' এই বদলির আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে আদেশে অন্য কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

এর আগে গত রোববার দুপুরে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন ওরফে 'বিহারি বগা'কে পুলিশের গ্রেপ্তারের চেষ্টা নিয়ে ওসি আবদুর রহিমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মেয়র শাহাদাত হোসেন।

কে এই বগা
ওয়াকিল হোসেন ওরফে বিহারী বগা চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। খুলশী, পাহাড়তলী ও আকবর শাহ এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে। চলতি বছরের জুনে একটি সরকারি জায়গা দখল নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রকাশ্যে গোলাগুলিতে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে বগার বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় গত ৮ জুন তাকে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির তালতলা এলাকায় হৃদয় নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে আট কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, দুই গ্যাংয়ের মধ্যে সম্প্রতি সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ে বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত হৃদয় ‘ফাইভ স্টার’ গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন। হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার আটজন ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের সদস্য। পুলিশ আরও জানিয়েছে, ওয়াকিল হোসেন বগা ও রকিবুল ইসলাম ওরফে পিচ্চি ‘সেভেন স্টার’ গ্যাং পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় বিজয়, কামরান ও শান্তর নেতৃত্বে ‘ফাইভ স্টার’ গ্যাং পরিচালিত হয় বলে পুলিশের দাবি।

গত ৩০ আগস্ট পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে নির্যাতন এবং কলেজের অধ্যক্ষকে ভিডিওকলে রেখে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়। এতে বগাকে ২ নম্বর আসামি করা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার থেকে পাঁচজনকেও আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় তাকে গ্রেপ্তারে গত ৪ সেপ্টেম্বর নগরের খুলশী থানাধীন ওয়্যারলেস এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। বগাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে তার অনুসারীরা পুলিশের ওপর হামলা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় বগা বাসার একটি গোপন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় খুলশী থানার ওসি ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

বগার বাসায় পুলিশ অভিযান চালানোর ঘটনায় গত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মহিদুল ইসলামের আদালতে মামলা করেন তার ৬৬ বছর বয়সী বাবা জাবেদ। মামলায় খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিম, এসআই শাহ পারভেজ, এসআই আনোয়ার হোসেন, বাবু মেম্বার ওরফে যুবলীগ বাবু, মিজানুর রহমান, আমান উল্লাহ আমান, সাংবাদিক আরিফ হোসেন ও আসাদ উল্লাহকে আসামি করা হয়। আদালত নালিশি মামলাটি আমলে নিয়ে অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, পুলিশ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে তার বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট, মারধর ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।

বগা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ বলেন, বগা একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে থানায় একাধিক মামলা আছে। মঙ্গলবার রাতে সিটি করপোরেশন ভবনে বগা আসতে পারে এমন তথ্যে সামনের সড়কে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি শুরু করে। তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান আছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.