নিজস্ব প্রতিবেদক | ২০ ডিসেম্বর, ২০১৮
গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনেই আওয়ামী লীগে আস্থার সঙ্কট দেখা দেয়। সে নির্বাচনে হেরেছিলেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। পরাজয়ের পরই তিনি দলের সিলেটের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ করেন কেন্দ্রে। কামরানের অভিযোগ তদন্তে নামে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। এরপর তিন নেতাকে শোকজ করা হয়।
তবে তাতেও কাটেনি আওয়ামী লীগের আস্থার সঙ্কট। বরং জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে তা আরও বেড়েছে। এই নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে ঠেকানোর চাইতে আওয়ামী লীগের ঘরের বিভেদ দূর আর নেতাদের মধ্য আস্থা ফিরিয়ে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন নেতাকর্মীরা।
এমনিতে সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ড. একে আব্দুল মোমেনের পক্ষেই মাঠে নেমেছে আওয়ামী লীগ। সব শীর্ষ নেতারাই প্রতিদিন প্রচারণা চালাচ্ছেন। গত সিটি নির্বাচনেও এমনটি দেখা গিয়েছিলো। বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের পক্ষে ‘ঐক্যবদ্ধভাবে’ মাঠে নেমেছিলো সিলেট আওয়ামী লীগ। অথচ নানা প্রশ্নের নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হেরে যান কামরান।
নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, যেসব কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ দলীয় কাউন্সিলররা বিপুল ভোটে জিতেছেন সেসব কেন্দ্রেও হারতে হয়েছে কামরানকে। এই নির্বাচনের পরই অভিযোগ ওঠে দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে। প্রকাশ্যে তারা কামরানের পক্ষে কাজ করলেও ভোটের দিন অনুসারীদের নিয়ে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
হারের পর দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করেও এমন অভিযোগ দেন কামরান। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পরিবারও তাঁর বিরুদ্ধে ছিলো বলে অভিযোগ করেছিলেন কামরান। এ অভিযোগ তদন্তে সিলেট আসেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা। এঘটনায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সিলেট মহানগর সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম নাদেলকে শোকজ করে কেন্দ্রীয় কমিটি। সেই আস্থাহীনতা আর বিভক্তি থেকে এখনো বেরোতে পারেনি সিলেট আওয়ামী লীগ।
এবার মনোনয়ন পাওয়ার আগ থেকেই মোমেনের বিরুদ্ধে ছিলেন মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। দুজনেই সিলেট-১ আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত মোমেনকে বেছে নেয় দল। দলীয় মনোনয়ন চুড়ান্ত হওয়ার পর প্রকাশ্যে মিসবাহ-কামরানসহ সব নেতাই মোমেনের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। তবে কর্মীদের মধ্যে এখনও রয়ে গেছে আস্থাহীনতা।
সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের মধ্যমসারির অন্তত তিনজন নেতা জানিয়েছেন, দলের শীর্ষ নেতাদের সকলে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলেও তারা কতোটা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন এ নিয়ে প্রশ্ন আছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। গত সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় নেতাদের প্রতি কর্মীদের এই অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য তাদের।
এই নেতারা বলেন, আগামীতে নিজেদের পথ পরিষ্কার করতেও ‘বহিরাগত’ মোমেনকে ঠেকাতে পারেন শীর্ষ নেতারা।
তবে এমন শঙ্কা ও অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ড. একে আব্দুল মোমেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগে বিরোধ ও আস্থাহীনতা এসব মিডিয়ার সৃষ্টি। বাস্তবে এসবের কোনো অস্থিত্ব নেই। আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ আছে। সব নেতারাই আমার সাথে আছেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনে জয় পরাজয় থাকতেই পারে। গত সিটি নির্বাচনে দূভাগ্যবশত আমরা জিততে পারিনি। জাতীয় নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব ফেলবে না।
কেবল সিলেট-১ আসন নয়, দল আর জোটের বিভক্তির কারণে আরও অন্তত তিনটি আসনে বিপাকে আছেন মহাজোটের প্রার্থীরা। সিলেট-২ আসনে মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া। দলের কেউ মনোনয়ন না পাওয়ায় এই আসনে এখনও নিস্ক্রিয় রয়েছে আওয়ামী লীগ। স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষেও কাজ করতে দেখা গেছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় অনেক নেতাকে।
সিলেট-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহমুদউস সামাদ চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় অনেক নেতাকর্মীর তোপের মুখে আছেন। তাকে এবার মনোনয়ন না দেওয়ার দাবিও জানিয়েছিলো স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ। তবু মনোনয়ন পান কয়েস। তবে এখনো কয়েসের পক্ষে মাঠে নামেনি বিরোধীপক্ষ। দলের বিভেদে বিপাকে আছেন সিলেট-৬ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ তাকে ঠেকাতে এখনও মাঠে সক্রিয় রয়েছে। দলের বিরোধ না মেঠাতে পারলে এইসব আসনে বিপাবে পড়তে হতে পারে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের প্রার্থীদের।
এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গত সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, সিটি নির্বাচনের পরাজয় থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। জাতীয় নির্বাচন হলো অস্থিত্ব রক্ষার নির্বাচন। এখানে বিভক্তি বা ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সবাইকে এটি মাথায় রেখেই বিজয়ের জন্য ঝাপিয়ে পড়তে হবে।