Sylhet Today 24 PRINT

‘বাবার চেহারাটা দেখলে কলিজাটা ফেটে যায়’

পান বাগান হারিয়ে নিঃস্ব দুটি পরিবার

গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি |  ০১ আগস্ট, ২০২৫

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের প্রতাপপুর পুঞ্জিতে দুর্বৃত্তদের হামলায় নষ্ট হয়েছে দুটি খাসিয়া পরিবারের পানসুপারির বাগান। রাতের আঁধারে কেটে ফেলা হয়েছে দুই হাজারের বেশি পান গাছ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লামাপুঞ্জির হেডম্যান রিসন কংওয়াং ও গস্মিন ডিখার পরিবার।

দুটি খাসিয়া  পরিবার খালি শূন্যতায় কীভাবে টিকে থাকবে? ছেলে, মেয়েদের, বই-খাতা, বাজার, বিদ্যুৎ, ওষুধ—সবই এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবার দুটির মাঝে।  একজন কৃষকের গাছ মানেই শুধু পাতা বা ফল নয়, সেটাই তার স্বপ্ন, জীবিকা, তার ভবিষ্যৎ, তার জীবন। সেই স্বপ্নটা রাতারাতি কেটে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। বর্তমানে অসহায় হয়ে পরেছেন খাসিয়া সম্প্রদায়ের দুটি পরিবার।  

এ ব্যাপারে রিশন কংওয়াংয়ের মেয়ে রিমায়া খংলা শনিবার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দন। তার স্ট্যাটাসটি পাকেদের জন্য হুবুহু তুলে ধরা হলো।


 রিমায়া খংলা লিখেন- আমি রিমায়া খংলা, রিশন কংওয়াংরের ছোট মেয়ে। ২৯ জুলাই মাঝরাতে কিছু দুর্বৃত্ত এবং দু্স্কৃতকারিরা আমাদের একমাত্র পানবাগান থেকে প্রায় দুই হাজার এর বেশি পান গাছ কর্তন করেছে । আমাদের জীবিকা ও সংসার চলে একটি মাত্র জুমে (পান-সুপারি বাগানে) যেখানে আমার বাবা পান চাষ করেন। কিন্তু আজ অত্যন্ত দুঃখের ও লজ্জার সঙ্গে জানাতে বাধ্য হচ্ছি যে, সম্প্রতি কিছু দুর্বৃত্তরা আমাদের সেই একমাত্র পানবাগানটি থেকে পান গাছগুলো কেটে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। এই নিষ্ঠুর ঘটনার ফলে আমাদের পরিবারের উপর ভয়ানক আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। আমাদের পরিবারের সংসার খরচ , ভাইবোনদের পড়াশোনার খরচ যে কিভাবে চলবে এই চিন্তা করতেও ভয় পাচ্ছি।

তিনি লিখেন, বাবার চেহারাটা দেখলে কলিজাটা ফেটে যায়, এই মানুষটি আমাদের বড় করতে তার জীবনে কতটা কষ্ট করেছে, এখন আর বাবার কাছে কিছু আবদার করতে মন চায় না, শুধু ভাবি কি করলে বাবার কষ্ট কমবে..!  নতুন করে পান বাগানে পরিপূর্ণভাবে পান গাছ গড়তে আনুমানিক প্রায় ৫ বছর সময় লেগে যায়।
এই সময়ের মধ্যে আমাদের সংসার যাবতীয় খরচ, ভাইবোনদের পড়াশোনার খরচ আরও কত কিছু রয়েছে তা কিভাবে চলবে? আমরা সবাই ক্ষুব্ধ এবং ব‍্যথিত। সব থেকে বড় কষ্ট কি জানেন, যখন বাবা সবার সামনে কেঁদে ফেলে। যেখানে আমার পরিবার সম্পূর্ণ নির্ভর করে একটি পান জুমের উপর, সেখানে সেটি ধ্বংস করে দেওয়া মানে আমাদের বাঁচার শেষ ভরসাটুকু কেড়ে নেওয়া। মানুষ কেন এত নিষ্ঠুর হতে পারে?  

তিনি আরও লিখেন- ছোটবেলা থেকেই দেখছি, আমার বাবা কত কষ্ট করে, ঘেমে-নেয়ে পান-সুপারির বাগানে কাজ করছেন—শুধু আমাদের মুখে একবেলা খাবার তুলে দিতে, আমাদের পড়াশোনার খরচ চালাতে, একটা সম্মানের জীবন দিতে।

কিন্তু আজ কলম ধরতে গিয়েও হাত কাঁপছে।
২৯ জুলাই, ২০২৫—এই দিনটা আমাদের জীবনে চিরকাল একটা দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকবে। এই পানজুমই ছিল আমাদের সংসারের চালিকাশক্তি। এখান থেকেই চলতো বাজার খরচ, ওষুধপত্র, ভাইবোনদের পড়াশোনার ফি। এখন কিছুই নেই—এক নিমিষে সব শেষ।

আমার বাবা, যিনি সারা জীবন এই গাছগুলোর মতোই ধৈর্য ধরে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন, সেই মানুষটাকে আজ একদম ভেঙে পড়তে দেখছি।

পান গাছ বড় করে তোলার জন্য কমপক্ষে ৫ বছর সময় লাগে।

তার মানে পরবর্তী পাঁচটা বছর আমরা শূন্য হাতে বাঁচার চেষ্টা করবো। কিন্তু একটা পরিবার খালি শূন্যতায় কীভাবে টিকে থাকবে? বই-খাতা, বাজার, বিদ্যুৎ, ওষুধ—সবই এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন কৃষকের গাছ মানেই শুধু পাতা বা ফল নয়, সেটাই তার স্বপ্ন, জীবিকা,তার ভবিষ্যৎ, তার জীবন। সেই স্বপ্নটা রাতারাতি কেটে ফেলা হয়েছে।

এই নির্মম ঘটনায় আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

আমরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি—এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত করে যথাযথ শাস্তি প্রদান করা হোক এবং আমাদের এই ক্ষতির জন্য আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হোক।

আমাদের প্রতি এই অন্যায় যেন উপেক্ষিত না হয়। আমরা আশা করি, প্রশাসন মানবিকতার দৃষ্টিতে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবে এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

উল্লেখ্য, পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, সোমবার (২৮ জুলাই) দিনগত গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত বাগান দুটির আনুমানিক বাজারমূল্য কোটি টাকারও বেশি বলে দাবি করছেন মালিকরা। এ ঘটনায় পুরো খাসিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.