Sylhet Today 24 PRINT

যেভাবে আমাকে অব্যাহতি দেয়া হলো

আফসানা বেগম |  ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গত মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকৃত আফসানা বেগমের নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হলো। জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন আফসানা বেগম। তখন এই নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান–সংগঠনের সঙ্গে কর্মসম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে এই নিয়োগ দেওয়া হলো। নিয়োগের অন্যান্য শর্ত চুক্তিপত্র দিয়ে নির্ধারিত হবে। তার মেয়াদ হবে দুই বছর।

এদিকে, চুক্তি বাতিলের পর বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) ফেসবুকে চার-পর্বে নিজের অবস্থান লিখেছেন আফসানা বেগম। তার ফেসবুক পোস্ট পাবলিক হওয়ার কারণে সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরের পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো:

যেভাবে আমাকে অব্যাহতি দেয়া হলো: পর্ব—১
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সংস্কার, সম্ভাবনা ও পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে একটা সেমিনার করার কথা ছিল আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি, সিডাপে সেজন্য হল বুকিংও দেয়া হলো, কক্সবাজারে ট্রেনিংয়ে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিনারের পরে এ নিয়ে তুমুল মিটিংয়ের এক পর্যায়ে গেজেট দেখা গেল, আমাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। মিটিং পণ্ড হলো।

২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের পরে ৫ সেপ্টেম্বর আকস্মিক আমাকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে নিয়োগ দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে পরিচালক হিসেবে লেখক/বুদ্ধিজীবীদের নিয়োগ দেয়ার চল আছে। তবে কেবল লেখক হবার জন্য নয়, কিছু রাজনৈতিক কলাম লেখা, মত প্রকাশের অধিকার কিংবা ভোটের অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে সভাসমিতিতে উপস্থিতির কারণে আমাকে এরকম একটা কাজের জন্য মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল বলে ধারণা করি। তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফোন করে আমাকে প্রস্তাব দিলে তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারি না এ কাজের জন্য আমি উপযুক্ত কি না। কিন্তু আসিফ ভাই অভয় দেন। তাঁর কথায় এমন কিছু একটা ছিল যেজন্য আমার মনে হয় শুধু লেখাই যথেষ্ট নয়, সুযোগ পেলে দেশের জন্য উপযুক্ত কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়।

গত জানুয়ারি ২০ তারিখে রাতের অন্ধকারে দুটো প্রজ্ঞাপন জারি হয়, পরপর ১৬ আর ১৭। মাঝখানে কোনো গ্যাপ নেই। অর্থাৎ, প্রথমটা যে দ্বিতীয়টার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে তা ঢাকার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও নেই। হয়ত ভাবা হয়েছে, আমাকে কেবল বাতিল বলে ছেড়ে দিলে আমি তা বদলানোর চেষ্টা করব। একদিন আমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে ওখানে কাজ করতে বলা হয়েছিল। লক্ষ করুন, ওখানে নিয়ে গিয়ে আমাকে নতুন পরিচয় দেয়ার জন্য নেয়া হয়েছিল মনে হতে পারে। তবে প্রকৃতপক্ষে, আমার আগে থেকেই একটি প্রতিষ্ঠিত পরিচয় ছিল, সে কারণেই আমাকে সেখানে ডাকা হয়েছে। সুতরাং নিজস্ব পরিচয় ও আত্মসম্মানবোধের জায়গা থেকে অব্যাহতি দেয়ার পরে সেই দায়িত্বের জন্য উঠেপড়ে লাগার প্রশ্ন নেই।

গতকালের ঢাকা স্ট্রিমের একটি রিপোর্টমতে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিয়োগ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মামুন শিবলী স্ট্রিমকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি এসেছে আফসানা বেগমকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন একজনকে নিয়োগ দেয়া জন্য আমরা শুধু আদেশ বাস্তবায়ন করেছি।’ সংস্কৃতি উপদেষ্টার চাওয়া তাঁরা বাস্তবায়ন করেছেন জানিয়ে মামুন শিবলী বলেন, ‘উপদেষ্টার চাওয়া থাকে, দরকার থাকে, সেটা তো আমরা জানি না। উপদেষ্টার ইচ্ছাতেই মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি এসেছে।’

‘উপদেষ্টার চাওয়া বা ইচ্ছা’ নিয়ে ভাবতে গেলে গত একদেড় বছরের অনেক কথা মনে পড়ে। এই মন্ত্রণালয়ের প্রথম উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ইচ্ছা ছিল বই নির্বাচন নীতিমালাটা এমন হবে যেন ভালো ভালো বই নেয়া যায় আর অযোগ্য বই প্রত্যাহার করা যায়। দায়িত্ব নিয়েই প্রথম কাজ হিসেবে পাঠাগারে বই বিতরণ তখন সামনে। হাজার হাজার চাটুকারিতাসমৃদ্ধ বই সরিয়ে ফেলার বা বিতরণে বাতিল ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আসিফ ভাই। সে কাজটা করতে গিয়ে ভারাক্রান্ত লাগত, লাখ লাখ সুন্দর কাগজ আর দামি প্রচ্ছদে মোড়ানো বইয়ের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ওইসব বই মূলত নেয়া হয়েছিল মন্ত্রী সচিব কোটার মাধ্যমে। আসিফ ভাই বললেন, নীতিমালাটা সংশোধন করতে হবে। শুরুতেই কঠিন কাজ। খুব মনোযোগ দিই আমরা। কয়েক দিনে শেষ হয়। আসিফ ভাইকে মেইলে পাঠালে তিনি রিভাইস করে দেন। বলেন, ভালো হয়েছে। সেই নীতিমালায় তাঁর সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে আমরা সচিব ও মন্ত্রী কোটা ২০% তুলে দিই ও ১০০% কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে বলে উল্লেখ থাকে। এ ছাড়া, তিন বছরের জায়গায় যে কোনো সময়ের বই (যেহেতু বহু বছর অনেক বিষয়ের বই উপস্থাপিত হবারই সুযোগ পায়নি, রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় অনেক প্রকাশক বই জমাই দেননি।) ও সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়।

নীতিমালা শুধুমাত্র অনুমোদনের কাজ বাকি থাকে। নীতিমালাটি মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে দিতে উপদেষ্টা পরিবর্তন হয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী চলে আসেন। আসিফ ভাই জানান বাকিটা ফারুকী ভাই দেখবেন। নীতিমালার পুরো বিষয়টা উনাকে বোঝানোর চেষ্টা করি, আসিফ ভাইয়ের মেইলগুলো পাঠাই, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া পাই না। শেষে অনেক অনুরোধের পরে একদিন একটা বড়ো কমিটি বসে। উপকমিটি সরাসরি নীতিমালা অনুমোদনের কাজ করবে বলে জানায়। তখন সমস্যা হয় ওই মন্ত্রী সচিব ২০% কোটায়। এটা থাকবে কি থাকবে না সে নিয়ে ফারুকী ভাই আমার সাথে বসতে চান কিন্তু কোনোভাবেই তাঁর সময় পাওয়া যায় না। এ নিয়ে দিনের পর দিন সময় দিয়ে, অফিসে বসিয়ে রেখে উনি মিটিং বাতিল করেন। শেষে একদিন ঘর ভরা লোকের মাঝখানে উনি আমাকে কথা বলতে দেন। অপেক্ষা করার সময়ে আমার পরপর পিএসের ঘরে ইউনেস্কো থেকে লেখক কিজি তাহনিন ও তার সঙ্গে সেখানে কর্মরত একজন বিদেশি নারী এসে বসেন। ফারুকী ভাই ডাকলে গিয়ে দেখি সেখানে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সচিব মফিদুর রহমান, খালিদ সাহেবসহ অন্তত দুজন উপসচিব, অতিরিক্ত সচিব নাজরিফা শ্যামা উপস্থিত আছেন। আমার সঙ্গে ছিলেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের একজন অফিসার। আমি বলা শুরু করি, কোটা না থাকলে কার্যকর লাইব্রেরি অনেক বেশি টাকা পাবে। তাদের খুব উপকার হবে। অন্যদিকে খারাপ বইয়ের বোঝা কমবে। কারণ নীতিমালা অনুযায়ী কোটায় কোনো বই নির্বাচন পদ্ধতি (ক্যাটালগ জমা নেয়া, বই বেছে নেয়া) অনুসরণ করা হয় না। আবার কোটায় আসা লাইব্রেরিরও কোনো পরিদর্শন রিপোর্ট লাগে না। যারাই সচিব বা মন্ত্রীকে পটাতে পারেন, তাদেরই লাইব্রেরি নির্বাচিত হয়। সাধারণ তালিকায় হিসাবের নিয়ম থাকলেও কোটার অধীনে যত ইচ্ছা তত কপি বই, যত ইচ্ছা তত টাকা অনুদান যায় লাইব্রেরিতে। অযোগ্য অপাঠ্য বইগুলো তখন সাধারণ লাইব্রেরিকে জোর করে নিতে হয়। দিনের পর দিন আগের আমলের কোটার বই ফেলতে গিয়ে আমার কাহিল লাগত।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তো বটেই, বহু সরকারি কর্মকর্তার বই নেয়া হতো। যেমন, একজন অতিরিক্ত সচিবের লেখা, ‘আমার স্ত্রীর জন্মদিনে লেখা ৫০ কবিতা’ বইটি, প্রচ্ছদে স্ত্রীর ছবি। এই বই গ্রন্থকেন্দ্র এক হাজার কপি কিনেছিল। মুজিব, হাসিনা, এমনকি পুতুলের ছবি দেয়া বইও হাজারে হাজার। মুজিব শতবর্ষে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত লাখ বই। মাঝখানে একটি ‘ও’ দিয়ে কত যে বই, যেমন, মুজিব ও লোককাহিনী, আবার, লোকসাহিত্য ও মুজিব। এসব তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে জুলাই নিয়ে লেখা বইয়ের বিষয়ে আমি শুরু থেকেই সতর্ক ছিলাম। বেছে বেছে জুলাইয়ের ভালো বইগুলো নিয়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে, বিভাগীয় বইমেলায় প্রদর্শনী করেছি বা কিনেছি। লাইব্রেরিগুলো যেন জুলাইয়ের সবচেয়ে ভালো বইগুলো পায়, সেদিকে নজর রেখেছি।

কেবলমাত্র এলোমেলোভাবে পেপার কাটিং, শহীদের ভুলভাল তালিকাসম্বলিত বই আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। আগের আওয়ামী আমলের মতো একটি পেপার কাটিংসম্বলিত একটি বইয়ের দাম ১৫,০০০টাকা, অনেক চাপ আসার পরেও সেই বই আমি নিতে বাধা দিয়েছি। আগে হাসিনার লেখা বই একেকটি ৭,০০০-৩০,০০০ টাকায় পর্যন্ত কিনেছে গ্রন্থকেন্দ্র। বিশেষ কোটায়। যে কোনো মূল্যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও মানহীন বইয়ের বিপক্ষে আমার অবস্থান ছিল। যেমন, একজন নারী মন্ত্রণালয় থেকে ফরওয়ার্ড করা একটি চিঠি হাতে এসেছিলেন তার জুলাই সম্পর্কিত বই নেয়ার জন্য। বইটির মধ্যে অসঙ্গতি, ভুল তথ্য, বাক্যেও চরম দুর্বলতা, তথ্যের ঘাটতি ইত্যাদির কারণে কমিটি বইটি নিতে চায়নি। আমি কখনোই চাইনি জুলাইয়ের স্পিরিট নিম্নমানের বই-ব্যবসার পিছনে নিভে যাক।

যা হোক, ফারুকী ভাই কথা বলা শুরু করেন, ‘কোটা থাকুক। পরবর্তী সরকার এসে ব্যবহার করবে। এটা ওদের লাগবে।’

আমি চমকে উঠি, ‘ভাই, কী বলেন, কোটা কেন থাকবে, কোটার জন্যেই না. . .’

‘আপনি বুঝতে পারছেন না, কোটা না থাকলে পরের সরকার অনুরোধের বইগুলো কীভাবে কিনবে? আর কত লাইব্রেরি অনুরোধ নিয়ে আসে জানেন?’

‘ভাই, আমরা কি পরবর্তী সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এখানে এসেছি? আমাদের নিজেদের কোনো অ্যাজেন্ডা নাই? এই দেখেন আজকে আমি কীরকম বইগুলো পেয়েছি স্টকে। একটা ভালো সাহিত্য নাই। গবেষণা নাই। এদেশে গত চল্লিশ বছরে কত সাহিত্যিক, কবি, গবেষক গড়ে উঠেছে, তার কোনো ছাপ গ্রন্থকেন্দ্রে নাই। কোটাটা তুলে দেন, ভাই, আসিফ ভাই কিন্তু কোটা...’

‘আহা আপনি এটাকে শুধু শুধু কোটা বলছেন কেন’, ফারুকী ভাই বিরক্ত হন।

‘এটা তো কোটাই। নীতিমালায় তো এটাকে কোটা বলা হয়েছে।’

‘এটা হলো গিয়ে তাদের জন্য একটা সুবিধা। এটার থাকার দরকার আছে। আমার কাছে তো অনেক অনুরোধ আসে, আপনার কাছে আসে না?’ ফারুকী ভাই সচিব সাহেবের দিকে তাকান। সচিব সাহেব বলেন, ‘জি স্যার। অনেক অনুরোধ আসে।’ ফারুকী ভাই বলেন, ‘তাহলে? জিনিসটা তো ফ্লেক্সিবল রাখতে হবে। পরের সরকারে যারা আসবে তারা আমাকে জিজ্ঞেস করবে। এটা তুলে দিলে তখন আমি কী জবাব দেব? আচ্ছা, আপনি কি মনে করেন আমি কোনো খারাপ বই কিনতে পারি? কোনো ভুয়া লাইব্রেরিতে টাকা পাঠাতে পারি?’

‘জি না। কিন্তু আপনি তো এখানে চিরকাল থাকবেন না। তাই আমি নীতিমালায় পরিবর্তনটা আনার কথা বলছি।’

‘আপনিও তো থাকবেন না। গ্রন্থকেন্দ্রে যদি একজন খারাপ পরিচালক আসে? যদি যা খুশি বই কেনে?’

‘সেটা তো একটা কমিটির মাধ্যমে হয়, পরিচালক চাইলেই পারবে না।’

‘আর পরের সরকার এসে আবার নীতিমালা বদলাতে পারে না?’

‘সেটা নিশ্চয় পারবে। কিন্তু আমরা কি আমাদের ছাপ রেখে যাব না?’

ফারুকী ভাই হাত উপরে তুলে আঙুল বিস্তৃত করেন, ‘শোনেন, আমরা যারা উপরে আছি, নতুন সরকার এসে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করবে, আপনাকে তো জিজ্ঞেস করবে না।’

সেধে এতটা অপমান নেয়ার পরে আর কথা জুটছিল না আমার মুখে। তবে খুব বলতে ইচ্ছা করছিল যে, আপনি আর আমি এখানে কোটা আন্দোলনের পথ ধরে হেঁটে হেঁটে এখানে এসেছি। আর এখন আপনি আমাকে কোটা থাকার যুক্তি বোঝাচ্ছেন? ঘরভরা এতগুলো লোকের সামনে ওভাবে বলতে সংকোচ হলো। এমনিতেই আমলাদের সামনে বসে থাকা দেবতার মতো একজন উপদেষ্টার সঙ্গে এতক্ষণ যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের জন্য ঘরের পরিবেশ থমথমে। প্রত্যেকের মুখ বিব্রত। মন্ত্রণালয়ে বিশটা মানুষের একটা মগজ হয়। উপরের পদের একজন ‘হ্যাঁ’ বললে বাকি উনিশ জনকে ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়। ভিন্নমতের কোনো চর্চা আমলাতন্ত্রের শিক্ষার মধ্যে নেই। ‘জি স্যার, হ্যাঁ স্যার’ ছাড়া কোনো কথা থাকতে পারে না। ওখানে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘স্যার’ সমার্থক শব্দ। প্রায়ই দেখতাম কেউ কোনো বাক্য ছাড়া কেবল ‘স্যার, স্যার স্যার, স্যার’ এভাবে উত্তর দিচ্ছেন। একজন উপসচিবকে একবার একজন অতিরিক্ত সচিবের সঙ্গে কথা বলতে শুনে পরে বললাম, ‘আপনি তো জানেন ওমুক জিনিসটা এরকম হয়েছে, কিন্তু বললেন না যে?’ উনি হেসে জবাব দিলেন, ‘আমি তো শুধু ‘জি স্যার বলি।’

যা হোক, ফারুকী ভাই একটু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘এক কাজ করেন, কোটা শব্দটা তুলে দেন। এটা তো ভালোর জন্য, ওটাকে অন্যভাবে বলেন।’

ঘরের মানুষগুলো তখন একটু নড়েচড়ে উঠলেন। ওটাকে কীভাবে বলা যেতে পারে এ নিয়ে আইডিয়া জেনারেশন শুরু হলো। ফারুকী ভাই বললেন, ‘মনে করেন সংরক্ষিত বা এরকম কিছু? কিন্তু এটা রাখতে হবে।’

কথা যেহেতু শেষ হয়ে গেল তাই আমি উঠব ভাবছি, এরই মধ্যে ফারুকী ভাইয়ের পিএস মুক্তাদির সাহেব এসে ইউনেস্কো থেকে দুজনের আসার কথা জানালেন। ফারুকী ভাই চমকে উঠে বললেন, ‘কখন এসেছেন?’

‘স্যার, অনেকক্ষণ হলো।’

ভীষণ বিরক্তসূচক মুখ বা অর্থহীন শব্দ করলেন তিনি, মুক্তাদির সাহেব কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, ‘স্যার এনারা আগে এসেছিলেন তো. .’ ফারুকী ভাই প্রচণ্ড বিরক্ত। উনাদের বসিয়ে রেখে আমাকে ডাকা আর এসব অনর্থক কথার জন্য সময় নষ্ট করার জন্য ফারুকী ভাই মুখ বিকৃত করলেন। অনেক বড়ো প্রতিষ্ঠানের লোক বসিয়ে রেখে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মতো ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের ততোধিক ক্ষুদ্র নীতিমালা নিয়ে আলাপ যে উনার কত সময় নষ্ট করেছে, প্রকাশিত ওই ভাবের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে আমাকে অপরাধবোধে ভোগানোর চেষ্টা ছিল। অফিসারসহ উঠে চলে আসতে আসতে সালাম দিলেও উনি আমার দিকে আর লক্ষ করেন না। ফারুকী ভাইয়ের সঙ্গে আগের দুই থেকে তিনবারের দেখা-সাক্ষাৎও বলতে গেলে অনেকটা এভাবেই শেষ হয়েছিল।

একবার আন্তর্জাতিক বইমেলা, আগে গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে ১৫টি আসরের আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরে বোর্ড মিটিংয়ে আলাপ, এবং নতুন করে শুরু করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কয়েকবার মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠানোর পর গিয়ে একবার উনার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বইমেলা দেশের জন্য কত জরুরি আর সেই আয়োজন দিয়ে প্রকাশনা জগতের উৎকর্ষ সাধন কী করে হতে পারে, এসব নিয়ে আলাপে আমার খুব আগ্রহ ছিল। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে যুক্ত হবার পর থেকেই আমি এ নিয়ে কাজ করতে চাইতাম। সচিব সাহেবকে বোর্ড মিটিংয়ে সেটা বোঝানোর চেষ্টাও আমিসহ উপস্থিত প্রকাশক, শিক্ষক, লেখক করেছেন। আমি একটা পরিকল্পনা বলেছিলাম যে কেবল বই বিক্রি নয়, নিজেদের সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বইকে অনুবাদ করিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রকাশনা থেকে প্রকাশের কাজটা আমাদের শুরু করা উচিত। আমি বলেছিলাম প্রকাশকদের ক্যাটালগ বানাতে অনুপ্রেরণা দেয়া, সেখান থেকে গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে একটা ক্যাটালগ প্রস্তুত, তারপর যদি অন্তত ১০টি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা থেকে ১০ জন এজেন্টকে এনে একটা করে ট্রান্সেশন গ্রান্ট সরকারিভাবে দেয়া যায়, তাহলে বছরে দশটি বই ভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে বিশ্বের বাজারে উপস্থাপিত হতে পারে। আমাদের বই ভারতীয় কোনো অনুবাদকের মাধ্যমে অনুদিত হয়ে কেবল ভারত-বাংলাদেশের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে, এটা কোনো কাজের কথা নয়। বরং ইউরোপ-আমেরিকা থেকে প্রকাশ হয়ে সেটা টার্গেট ল্যাঙ্গুয়েজ অনুযায়ী পাঠকের কাছে উপস্থাপিত হতে পারত। তখন বোঝা যেত আমাদের সাহিত্যের গভীরতা। বলেছিলাম বাইরের এজেন্টদের সঙ্গে এভাবে জানাশোনা হলে আমাদের প্রকাশকেরা ভারতীয় প্রকাশনার কাছে দ্বিতীয় দফায় গ্রন্থস্বত্ব না কিনে সরাসরি প্রকৃত প্রকাশকের কাছে গ্রন্থস্বত্ব কিনতে পারত। প্রকাশনা শিল্পের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আমাদের সাহিত্যকে যেমন বাইরে নিয়ে যেত, তার ফলশ্রুতিতে দেশীয় প্রকাশনার ক্ষেত্রেও গুণগত পরিবর্তন আসত।

এর মাঝে অবশ্য অনেক ধাপ আছে, এবং সরকারের ইচ্ছা থাকলে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে সেসব কার্যক্রম হাতে নেয়া সম্ভব হতো। একদিকে বই বিক্রি, অন্যদিকে অনুবাদ স্বত্ব বিক্রি ও দেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের এক সমগ্র চিন্তা থেকে আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের সম্ভাবনাকে আমি আলোচনায় আনতে চাচ্ছিলাম বারবার। দেশ-বিদেশের লেখক-প্রকাশক-এজেন্টদের উপস্থিতিতে কিছু সেমিনারসহ আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন মন্ত্রণালয় ও দেশের জন্য কতটা সুফল ও পরিচিতি আনতে পারে সে বিষয়টি ফারুকী ভাইকে বোঝানোর ইচ্ছা ছিল আমার। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে যে মানুষটি অনেক বোঝেন তিনি বিষয়টিকে সহজে হৃদয়ঙ্গম করবেন, এমনটাই ধারণা করেছিলাম।

কিন্তু আমি যখন তাঁর কাছে এসবের একটু ব্যাখ্যা দিলাম, তিনি বললেন, ‘এত কিছু করে বইয়ের অনুবাদ করতে হবে নাকি? মেইল করলেই তো বইয়ের অনুবাদক পাওয়া যায়।’ আমি বললাম, ‘সেটা কীভাবে?’ তিনি বললেন, ‘ওই যে ফাহাম আব্দুস সালামের বইটা? মেইলে যোগাযোগ করেই তো অনুবাদক পেয়ে গেছে।’ আমি বিনয়ের সাথে বললাম, ‘ভাই, রাজনৈতিক হাইপের বই তো সেভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে যেতেই পারে, কিন্তু চাইলেই কি ‘চিলেকোঠার সেপাই’, ‘যে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ কিংবা ‘জীবন আমার বোন’ পেঙ্গুইন থেকে অনুবাদ হয়ে প্রকাশ হতে পারে?’ তিনি বললেন, ‘চেষ্টা করে দেখেন না!’

আলাপ শেষ। একটা আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যে কোনো একটি অনুষ্ঠানের খরচের চেয়ে কম বা একইরকম। অনেক অনুষ্ঠান হচ্ছিল মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে। বলতে গেলে মন্ত্রণালয় নিজেই একটি দপ্তরের মতো কাজ করছিল। তবে অধীনস্থ দপ্তর-সংস্থা হিসেবে গ্রন্থকেন্দ্রের উন্নয়ন বা পলিসি লেভেলে কাজ করার কোনো উৎসাহ আমি লক্ষ করিনি। গ্রন্থকেন্দ্রের একেকটা ফাইল দুই থেকে আড়াই মাস করে পড়ে থাকত। বিভিন্ন কার্যক্রমের কমিটি অনুমোদন নেয়ার দেরি হতো বলে অর্থবছরের মধ্যে সব কার্যক্রম শেষ করা এবং সময়ের কাজটা সময়ের মধ্যে ধরতে নাভিশ্বাস উঠে যেত। দীর্ঘসূত্রতার জন্য অফিসারদের রাত দশটা অবধিও অফিসে থাকেতে হতো প্রায়ই। তারপরেও নতুন কিছু করতে হবে, সংস্কার করতে হবে, এই চিন্তা আমাদের মাথা থেকে কখনো যায়নি। কিন্তু দুঃখজনক হলো উপদেষ্টা বা সচিব কখনো আমাদের ডেকে জানতে চাননি যে, গ্রন্থকেন্দ্রের আসলে কাজটা কী বলেন তো? গ্রন্থকেন্দ্র নিয়ে কী কী করা যেতে পারে? কীভাবে এই প্রতিষ্ঠান মানুষের উপকারে আসতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা অফিসে বসে বহুবার আলাপে আলাপে মুখস্থ করেছি, কিন্তু কেউ কোনোদিন আমাদের জিজ্ঞেস করেননি। হয়ত তারা আমাদের কাছে কেবল রুটিন কাজই চাইতেন। এরকম প্রতিষ্ঠানে সকালে অফিসে গিয়ে কোনোরকমে কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেও বলার কেউ নেই। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে কাজের যে বিপুল স্পৃহা আমি প্রতিষ্ঠানের লোকজনের মধ্যে দেখেছি, মন্ত্রণালয় তা ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা ছিল নিজেদের অর্জন আর সুনাম নিয়ে ব্যস্ত, অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রন্থকেন্দ্রকে কার্যকর করার বিষয়ে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ বা পরিকল্পনা ছিল না।

পর্ব—২: লেখক-প্রকাশক ও সচিব
১৯৯৫ সালের আইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে যে কাজের পরিধি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে তা বিপুল, ব্যাপক। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের, প্রকাশক-লেখকদের এবং সাধারণ মানুষের গ্রন্থকেন্দ্র সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি হলো গ্রন্থকেন্দ্র বই কেনে। মন্ত্রণালয় ভাবে বছরে বই কেনার আর বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়াই গ্রন্থকেন্দ্রের একমাত্র কাজ। বেশিরভাগ লেখক-প্রকাশকেরা ভাবেন একটি অফিস যেখানে তাকে পুশ সেল করতে হবে। আমি সন্দিহান তাদের আমি ‘লেখক’ বা ‘প্রকাশক’ বলব কি না। যারা দিনের পর দিন আমার টেবিলের সামনে নিজেদের বইয়ের মোটামুটি একশ’ কপি সরকারের কাছে বিক্রি করার জন্য অনুরোধ করে গেছে, অসম্পাদিত, অবান্তর বই উপহার দিতে দিতে আমাকে ভারাক্রান্ত করেছে, তাদের জন্য আমি কতটা করুণা বোধ করেছি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আমি সঙ্গে সঙ্গে বইগুলো চোখের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলতাম যেন বই নির্বাচনের মিটিংয়ের সময়ে চিনতে না পারি। এনারা কি লেখক? লিখলেই লেখক হয় না, আত্মসম্মানবোধ থাকতে হয়। এতই যদি বিক্রির ইচ্ছা, তাহলে ঘরে ঘরে সাবান-শ্যাম্পু বিপণন করেন না কেন তারা?

আর প্রকাশকের দল আছে, গত এক বছরে কী বই প্রকাশ করেছেন জানতে চাইলে কোনো উত্তর দিতে পারবেন না। কিন্তু দলবাজি গলাবাজি করে চলছেন। কার বই কিনতে হবে, কী বই কিনতে হবে, দিনরাত উপদেশ দিয়ে যাচ্ছেন। একজনের চেয়ে আরেকজনের কেনার তালিকায় একটি বই কম পড়লে গ্রন্থকেন্দ্রে ছুটে আসছেন। এটা বই বিক্রির প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশি আধিপত্যের সংকট। সরকারি প্রতিষ্ঠান তার বই একটা-দুটো কম কিনলে বাজারে তার নেতৃত্ব থাকে না, গলাবাজি কমিয়ে ফেলতে হয়। ভারতীয় বইকে ফটোকপি করে প্রকাশ করছেন, চিরায়ত বলে নিম্নমানের মুদ্রণ করছেন, একই বই ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশনার নামে প্রকাশ করে গ্রন্থকেন্দ্রে বিক্রির উদ্দেশ্যে ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটালগ জমা দিচ্ছেন, কিন্তু প্রকাশ্য-চাতুরিতেও গলাবাজি থামাচ্ছেন না। এইটুকু দেশে প্রকাশনা শিল্পের বেহাল দশার মধ্যে সাড়ে পাঁচশ প্রকাশক কী করে গজায় তার বিস্তারিত ডিসপ্লে দেখলাম গ্রন্থকেন্দ্রে গিয়ে। আগাগোড়া ফটোকপি বই, প্রকাশনা করতে একটি টাকা বিনিয়োগ নেই, কিন্তু তার বই গ্রন্থকেন্দ্রকে কিনতেই হবে। মুখে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধ ফেনা, আর হাতে চুরি করা ভারতীয় বই।

অনুবাদের অবস্থা সবচেয়ে আশঙ্কাজনক। ধরা যাক, অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়রি। বাজার থেকে যদি দশটা কেনা হয়, পৃষ্ঠা ওলটালে দেখা যাবে দশটাই একই অনুবাদ। প্রথমে একটা ভূমিকা আছে, একই ভূমিকার পরে হয় আফজাল হোসেন, নাহলে ফারুক হোসেন লেখা। দুই প্যারা পড়লেই দেখা যাবে, বসার ঘরকে বৈঠকখানা, পানিকে জল লেখা হয়েছে। খানিক পরে বোঝা যাবে সবগুলো একটাই অনুবাদ যেটা হয়ত আশির দশকে পড়েছি। অন্যদিকে গত মাসে যে বই ইউরোপে-আমেরিকায়-ভারতে বেস্ট সেলার হচ্ছে, সেই বই অনুবাদ হয়ে চলে এসেছে। আবোল তাবোল ভাষার এআই দিয়ে করা অনুবাদ, কিন্তু সেসব বই কিনতে হবে, সাহিত্যের বদলে গাট্টি গাট্টি মোটিভেশনাল বই কিনতে হবে। তাহলে গ্রন্থকেন্দ্র চিরায়ত ও বর্তমানের উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কখন কিনবে? সারা দেশের কার্যকর লাইব্রেরিগুলোতে যে বই অবশ্যই থাকতে হবে, সেগুলো কখন আর কোন টাকা দিয়ে কিনবে? আমি নিজে দিনাজপুরে বাড়ির পাশের হেমায়েত আলী লাইব্রেরিতে যে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যগুলো পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম, সেই বয়সি একটি কিশোরের জন্য কি সুযোগ থাকতেও সেই পরিস্থিতি আমি তৈরি করতে পারব না? আমাকে কেবল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার জন্য বস্তাপচা বই পাঠাতে হবে লাইব্রেরিতে?

এটা আরেক সংকট, প্রকাশকদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও গণগ্রন্থাগারের দায়িত্ব হলো প্রকাশনা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা। কীভাবে? বই কিনে। বই নির্বাচন নীতিমালা কেবল প্রকাশকদের সাথে যেন সাম্য হয়, সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৈরি। আর লাইব্রেরির সাথে সাম্য? সেটা কে ভাববে? আমি যদি মনে করি ৮০০ লাইব্রেরিতে এক কপি করে প্লেটোর রিপাবলিক পাঠাব, তাহলে একজন প্রকাশকের কাছে যে সংখ্যক বই কিনতে হবে, সেটা জানলে প্রকাশকরা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে আগুন লাগিয়ে দেবে।

তাঁরা আমার কাছে আসতেন। কখনো বই সম্পাদনা, পাণ্ডুলিপির বিষয়বস্তু কেমন হওয়া উচিত, এখন কী বই প্রকাশ করছেন, এসব বিষয়ে কথা বলতেন না। তাঁরা কেবল একটিই কথা বলতেন, তাঁদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানকে বই কিনতে হবে। বছরে মাত্র দুই কোটির সামান্য বেশি টাকা দিয়ে বই কেনা হয়, এই তথ্যও তাঁদের কাছে ছিল না। তাঁরা মুখে মুখে বলতেন অমুকে কোটি কোটি টাকার বই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে বিক্রি করেছে। তাঁরা আমার সামনে বসে বলতেন বিগত বছরগুলোতে কী পরিমাণ বঞ্চিত, অবহেলিত ছিলেন। কিন্তু বাপুস (বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি) থেকে বছর বছর বের হওয়া বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রচুর পরিমাণ বই প্রকাশকারী গর্বিত প্রকাশকদের তালিকায় বইয়ের তালিকাসহ তাদের নাম জ্বল জ্বল করতে দেখেছি। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কোটায় কেনা বইয়েও তাদের কারো কারো বই কেনার প্রমাণ আমার ড্রয়ারে থাকত। তবে এ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কখনো কথা বলিনি। তাঁদেরকে আমি ব্যবসায়ী হিসেবে দেখতাম। ব্যবসায়ী সময়ের ফায়দা নেবেই। তাঁদের মধ্যে আমি আদর্শ খুঁজতে যেতাম না। প্রথম প্রথম আমি নীতিমালা থেকে ২০% কোটা উঠিয়ে দেয়ার ব্যাপারে তাঁদের সঙ্গে আলাপ করেছি। ভেবেছি তাঁরাও নিশ্চয় চাইবেন কোটা উঠে কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন হোক, তাহলে একচেটিয়া কারো বই বেশি আসতে পারবে না। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ করেছি তাঁরা প্রায় প্রত্যেকে কোটার দিকে তাকিয়ে আছেন, নিজের একটা বই কোটায় ঢোকাতে পারলে বর্তে যাবেন।

এটা ছিল একটা চক্র। আওয়ামী লীগ সরকার বেশি আগ্রাসী হবার পরেই নীতিমালায় কোটা ঢুকিয়েছে। ওদিকে প্রকাশকরা বিপুলবিক্রমে মুজিব আর উন্নয়নের গল্প ছাপিয়েছে সেই কোটায় জায়গা করে নিতে। দুই পক্ষ মিলে একটা সমঝোতা, আর ভারটা টানবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও গণ গ্রন্থাগার। কিন্তু অভ্যুত্থানের পরে সকলের আচরণটা কেমন হওয়া উচিত ছিল? যেখানে সাম্যের কথা বলা হচ্ছে সেখানে কীসের কোটা? কিন্তু অদ্ভুতভাবে দেখা গেল তাঁরা আগের সিস্টেমই চান, শুধু আওয়ামী লীগের জায়গায় নিজেদের প্রতিস্থাপন করে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে কেমন করে সম্পাদনার প্রশিক্ষণ, প্রকাশনার উন্নয়ন, কপিরাইটের প্রয়োগ, আন্তর্জাতিক বইমেলা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কাজ করা যায়, এসব নিয়ে আমি কখনো সাধারণ প্রকাশকদের কোনো আগ্রহ দেখিনি। ওদিকে গোটাবিশেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের লোকেরা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে কখনোই আসতেন না। তাঁরা ব্যস্ত থাকতেন প্রকাশনায়। নির্বাচনের সময়ে কমিটির সদস্যেরা সাকুল্যে তাঁদের বিশ-পঁচিশটি বইও কখনো প্রাথমিক তালিকায় নির্বাচন করে ফেলতেন। তবে নেয়া হতো নীতিমালা অনুযায়ী দশটাই।

তবে সে যাই হোক, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র যে মেলা করতে গিয়ে প্রকাশকদের খোঁজে, লাইব্রেরিতে বই বিতরণ করতে গিয়ে প্রকাশকদের বই কেনে, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মূল লক্ষ্য যে পাঠক বা পাঠক সমাজ, সেটা প্রকাশকরা কখনো বিশ্লেষণ করেননি। তারা কেবল ক্রেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠানকে বই গছাতে চেয়েছেন। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রেরও যে শিশু-কিশোর-তরুণ-বৃদ্ধ পাঠকদের উপযোগী বই যোগাড় করার একটা উদ্দেশ্য আছে সেটা নিয়ে তারা চিন্তিত নন।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র যেহেতু সংস্কারের জন্য কোনো মনোযোগ পায়নি তাই আমরা নিজেই একটা সংস্কার প্রস্তাব লিখেছিলাম। দেড়শ' পাতার। অবশ্য একসময় সচিব মহোদয় বলেছিলেন যে, মুখ্য সচিব আমাদের প্রতিষ্ঠানের বিকাশের বিষয়ে আগ্রহী। আমাদের অনুরোধে তিনি সংস্কার প্রস্তাব ও শতবর্ষী পাঠাগারের সংস্কারেরও একটি প্রস্তাব দাঁড় করাতে বলেছিলেন। যেজন্য অল্প সময়ে সারা দেশ চষে প্রাচীন পাঠাগার পরিদর্শন করে তথ্য সংগ্রহ করেছি আমরা। এই দুই সংস্কার প্রস্তাব দুবার প্রিন্ট করে দিয়ে এসেছি। কারণ তারিখ দেয়ার পরে সেই তারিখে গেলে দেখা যায় সচিব মহোদয় তাঁর টেবিলের উপরে এদিকওদিক সংস্কার প্রস্তাবটা খুঁজছেন। খুঁজে পাচ্ছেন না, পিএসকে জিজ্ঞেস করছেন। তাই বরাবর হাতে প্রিন্ট করেই নিয়ে যেতাম। একবার বোর্ড মিটিংয়ের পরে রিডিং পড়ে শুনিয়ে সচিব মহোদয়ের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছি আমি। উনি শুনছেন কি শুনছেন না বোঝা যায় না, অবহেলাভরে জয়েন্ট সেক্রেটারি শাখাপ্রধানকে বলেন, ‘এগুলো থেকে মূল বিষয়টা বের করে আনো তো।’ উনি যখনই একটা তারিখ দিতেন, সেই তারিখে গিয়ে আবারো একই অনুরোধ করতাম আমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সংস্কার নিয়ে বসুন অনুগ্রহ করে। উনি আবারো তারিখ দিতেন। শেষ তারিখ দিয়েছিলেন গত ১৫ জানুয়ারি। সেদিন সংস্কার প্রস্তাবের কথা বলতেই উনি আমাকে জানালেন যে, ‘হয়েছে কী, উপদেষ্টা মহোদয়ের সঙ্গে আপনার কিন্তু একটা গ্যাপ আছে।’ আমি বললাম, ‘সেটা আমার জানা নেই, তিনি বলতে পারবেন।’ উনি বললেন আমি পাঠাগারের অনুদানের ফান্ডের কোটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি সেটা তাঁর ভালো লাগেনি। (ওই কোটায় গত কয়েক বছর যেসব চাটুকারিতাসমৃদ্ধ ও অপাঠ্য বা অযোগ্য বই কেনা হয়েছিল তা ফেলে দেয়ার কোনো রাস্তা আমরা পাইনি। ছোটো অফিসে উপরের তলাগুলোয় মাথার উপরে বোঝার মতো হয়ে আছে বিশাল তৈলাক্ত বইয়ের ভার।)

নীতিমালা পরিবর্তনের বিষয়টি তাঁরা যে দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতেন, তা হলো, মন্ত্রণালয়ের ফান্ডের উপরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কর্তৃত্ব করছে। নীতিমালার রেজ্যুলেশনেও লিখেছেন ঠিক সেইভাবে, মন্ত্রণালয়ের কমিটির জায়গায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উল্লেখ। বিষয়টি আগে উল্লেখ করেছিলাম, শেষবারে সময় স্বল্পতায় নোট অফ ডিসেন্ট দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। এতেও সচিব সাহেব আমার উপরে নাখেশ তা জানালেন। পরে কারেকশন করে পাঠালে সরাসরি সম্মতি দিয়েছি। এসব প্রসঙ্গ শেষ হলে মনে করিয়ে দিলেন, তাজউদ্দীনের জন্মবার্ষিকী পালন করার জন্যেও তিনি আমার উপরে নাখোশ। মনে আছে জন্মদিন পালনের পরের দিন সচিব সাহেব আমাকে ডেকেছিলেন। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কার্যাবলী উনার সামনে খোলা ছিল। উনি উচ্চারণ করে পড়ছিলেন। আমি ব্যাখ্যা করেছিলাম মন্ত্রণালয় যখন মঈদুল হাসানকে একুশে পদক দিয়েছিল, যিনি তাজউদ্দীনকে নিয়ে লিখতে ও বলতেই পছন্দ করেন, তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি প্রস্তাব দেয়াতে আমারও মনে হয়েছিল শিক্ষার্থীদের তাজউদ্দীনের কথা জানানো উচিত। আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবকে কাল্ট বানানোর নেশায় তাজউদ্দীনকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, কিন্তু দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বা যুদ্ধকালীন উপস্থিত নায়কের কথা শিক্ষার্থীদের জানার অধিকার আছে বলে আমি মনে করেছিলাম। পাঠ কার্যক্রমের সময়ে দেখি সারা দেশের কলেজের শিক্ষার্থীরাও তাজউদ্দীনকে চেনে না। মঈদুল হাসান সেই অনুষ্ঠানে দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ থেকে পঁচাত্তর অবধি দুঃশাসনের কথা বলে যান। মনে আছে অনুষ্ঠানের পরের দিন এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমাকে জরুরি ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ে ডাকা হয়েছিল। কেন খবর দিইনি। আমি চিঠি দেখিয়েছি। ফেসবুকে প্রচার করেছি, সেটাও দেখিয়েছি। অনুষ্ঠানের বিষয়ে লেখক মঈদুল হাসানের কথা বলাতে তিনি হেসে বিষয়টা ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে তো সরকার অনেক কাজ দিয়েছে দেখি!’

১৫ তারিখে কথার মাঝখানে উনি হুট করে বলেছিলেন, ‘চাকরির মেয়াদ শেষ হলে কি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যেতে পারবেন?’ আমি বলেছিলাম, ‘ছেড়ে দিয়ে এসেছি।’ উনি বললেন, ‘সে কী, ছেড়ে কেউ দেয়, ছুটি নিয়ে আসতেন।’ আমি বললাম, ‘ওখানে ছুটির কোনো নিয়ম নেই।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে আসলেন কেন?’ আমি উত্তর দিলাম, ‘কাজ করতে।’ তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘আপনি তো খুব ইমোশনাল!’ আমি বিরক্ত বোধ করেছি, চুক্তি শেষ হলে আমি চাকরি করব নাকি না-খেয়ে থাকব সেটা আমার ব্যাপার। উনি কেন অপ্রাসঙ্গিকভাবে আমাকে এসব জিজ্ঞেস করবেন? উনার সঙ্গে আমার কেমন ব্যক্তিগত কোনো যোগাযোগও তো নেই! তবে এখন মনে হয়, এই কথাগুলো উনি বলছিলেন আমার অব্যাহতি ও আরেকজনের যোগদানের ছকটি তখন কাটা হয়ে গেছিল বলে। উনার কি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা হচ্ছিল? এই ভেবে এখন খানিক হাসিই পায়। যা হোক, তখন মনে হয়েছিল আমার উপরে আগের রাগ-টাগ উনাদের যায়নি। মতের অমিল থাকতেই পারে কিন্তু কথা বলতে আমার কোনো দুঃখ-লজ্জা বোধ হয়নি, কারণ আমি ব্যক্তিগত কোনো লাভালাভের জন্য উনার কাছে যাই না। আমি যাই প্রতিষ্ঠানের ভালোর জন্য, যেটা আমার দায়িত্ব। তাই সেকথা বাদ দিয়ে আমি আবারো সংস্কারের কথা তুললাম, উনার কাছে সময় চাইলাম। বললাম, ‘আমি দুঃখিত, কিন্তু আমি তো প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলতে এসেছি, যে প্রতিষ্ঠান সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের, এর ভালো হলে মন্ত্রণালয়ের ভালো হবে।’ উনি বললেন, ‘আচ্ছা ২০ তারিখের পরে আসেন।’ তারপর ২০ তারিখে রাতের অন্ধকারে আমার অব্যাহতির খবর এল।

পর্ব—৩
এই প্রতিষ্ঠানে আমার নিয়োগ হয়েছিল চুক্তিভিত্তিক, একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। যেমন একটা গল্প লেখার সময়ে যদি পত্রিকা জানায় ২০০০ শব্দের মধ্যে লিখতে হবে, আমি শব্দসীমাকে ক্যানভাস ধরে প্যারাগুলোর উত্থান মনে মনে সাজিয়ে নিই। ঠিক তেমনই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে আমার ক্যানভাসের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ মাস। আমি কী কী করব, কী পরিবর্তন আনব, কবে কোনটা শেষ হবে তার টাইমলাইন সাজানো ছিল। আমি সেটা করেছিলাম দায়িত্ব পেয়েছিলাম বলেই। প্রতিষ্ঠান দখল করে আমি কিছু করছিলাম না।

আমি নিজের লবিং বা পরিকল্পনায় সেখানে যাইনি। যেখানে আমার দখলের কোনো স্পৃহা ছিল না, সেখানে আমার কাছ থেকে বেদখল করে নেয়ার প্রচেষ্টাটি আমি অশোভন ও হাস্যকর হিসেবে দেখি। আমাকে যেমন সসম্মানে ফোন করে, অনুরোধ করে প্রতিষ্ঠানের হাল ধরতে বলা হয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে এই দায়িত্বের শেষ হতে পারত। যদি সময়ের আগেই শেষ করার প্রয়োজনীয়তা উদ্ভূত হয়, তবে কারণ নিয়ে কথা বলেও শেষ করা যেত। একটা মানবিক পরিবেশ চাকরির ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সেটা আমলা এবং তাঁদের নির্দেশনা দেয়ার লোকদের বোধ করা প্রয়োজন। রক্তক্ষয়ী একটা অভ্যুত্থানের পরে আমাদের মানবিক হবার কথা ছিল। মত প্রকাশের অধিকার পাবার কথা ছিল। আমার মতো একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে ডেকে নিয়ে গিয়ে পরিণতিতে অপমান করার কোনো যোগ্যতা বা অধিকার উপদেষ্টা বা মন্ত্রণালয়ে বসে থাকা আমলাদের আছে বলে আমি মনে করি না। স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একমত না হলে অন্য কোনো সাহিত্যসেবীও তাঁদের কাছে যোগ্য সম্মান পাবেন বলে আমি মনে করি না। সমাজের সাধারণ থেকে গণ্যমান্য অনেকে আমারই মতো আমার আকস্মিক ও নাটকীয় অব্যাহতির বিষয়টিকে বিব্রতকর, অপ্রয়োজনীয়, অপমানজনক, হঠকারিতামূলক ও স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। মানুষের এই অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হবে। গণঅভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ভাবনাকে ব্যর্থ করার প্রচেষ্টা হিসেবে এই ঘটনা দীর্ঘদিন মানুষের মনে থাকবে। এক মুখে গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটের কথা ও পরমুহূর্তেই সেই স্পিরিটের বিপক্ষে কাজ করার দ্বিচারিতা হিসেবে এই ঘটনা উল্লেখ করা হবে।

মানুষের সৎ প্রচেষ্টা যে দলগত নির্বুদ্ধিতা ও অসততার কাছে জিম্মি তার প্রমাণ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উত্থানকে ঠেকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা। একে স্বাধীনভাবে কাজ না করতে দেয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হওয়া। ভালো বই লাইব্রেরিতে যাবে না, কোটায় নিম্নমানের বই কেনা হবে। আমাকে যেমন দিনের একটা সময়ে আগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত কুৎসিত বইগুলো বেছে আলাদা করতে হতো, পরের অনেক পরিচালককে সেটাই করতে হবে। একের পর এক আমল আসবে-যাবে, কিন্তু গ্রন্থকেন্দ্র মানুষের করের টাকায় ভালো সাহিত্যের জায়গায় অপ্রয়োজনীয় বইয়ের স্তূপ লাইব্রেরিতে পাঠাবে। আমল গেলেই আবারো তা উপরের কোনো ঘরে লুকিয়ে রাখতে হবে। কোটায় কাগজের লাইব্রেরিকে লাখ লাখ টাকা দেয়া হবে। এটাই ভবিতব্য।

যদিও জানানো হয়নি কী কারণে নির্বাচনের কয়েকদিন আগে অন্য ব্যস্ততা ফেলে জরুরি ভিত্তিতে আমাকে বহিষ্কার করা হলো, তবুও আমাকে বলতে হবে যে, জ্ঞানত আমি এমন কিছু করিনি যাতে গ্রন্থকেন্দ্রের তথা সরকারের কোনো ক্ষতি হয়। স্বজনপ্রীতি তো দূরের কথা, গত বছর ১৭৩১ শিরোনামের বইয়ের তালিকায় আমি নিজের কোনো বই রাখতে দিইনি। কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের কথা ভেবেছি। এবারেও বই নির্বাচন চলছিল, কমিটির অন্য সদস্যেরা আমার বই নেয়ার পক্ষে একযোগে মত দিয়েছেন। কিন্তু সাইন করার আগে আমি সেসব কেটে দিয়েছি। কাটার অধিকার নেই, কিন্তু নিজের বই বলে কেটেছি। বইয়ের তালিকা আগেরবার জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ইতিহাসে প্রথম ওয়েবসাইটে দিয়েছি, এবারেও থাকলে দিতাম। আমি জানতাম বইয়ের তালিকা এমনই হতে হবে যা আমি প্রকাশ করতে পারি। আর এবারে তো সফটওয়ারের মাধ্যমে বাড়িতে বসে মানুষে বই নির্বাচন করবে, সমস্তকিছু স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হবে, এই প্রত্যাশা ছিল। প্রকাশকদের জন্য সফটওয়ারের যে অংশটি চালু হবার কথা সেটি হলে একই বইয়ের ডুপ্লিকেট কপি কেনার জন্য চাপ দেয়া কমত। লেখককে কেউই টাকা দিতে চান না, সেজন্য এবারে চুক্তি বা অনুমতিপত্রও চেয়েছিলাম। লেখকদের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ থেকেই এরকম চিন্তা করেছিলাম।

কাজ করলে সব পক্ষ প্রভাবিত হবে। কাজ না করলে করো আপনাকে নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। কাজ করলে মানুষে আপনার ভুল ধরতে পারবে। কাজ না করলে আপনার কোনো ভুল নেই। আমি কাজ করার রাস্তাটা বেছে নিয়েছিলাম। সপ্তাহে সাতদিন কাজ করেছি। আমার বাহিনি অফিসারেরা তো করেছেই। আমার তৃপ্তি হলো অব্যাহতি পাওয়ার সংবাদটি পাওয়ার মুহূর্তে আমরা কাজ করছিলাম। দেশের চিন্তাশীল মানুষের সামনে গ্রন্থকেন্দ্রের সম্ভাবনার কথা কী ছবিতে কী ভাষায় তুলে ধরব সে নিয়ে ছক কাটছিলাম। আমার তৃপ্তি হলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি পাঠক সমাজের কল্যাণে কাজ করে গেছি। শুধু চাইতাম এই সরকারের অবদানের মধ্যে যেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সংস্কারটি মানুষে মনে রাখে। মন্ত্রণালয় তুলে ধরেনি বা ধরবে না জেনে নিজেরাই কাজটা করার উদ্যোগ নিচ্ছিলাম। আগের সব অনুষ্ঠানের মতো করেই তাঁদেরও আমন্ত্রণ করতাম।

আমার প্রশান্তি হলো, আমি এই প্রতিষ্ঠানে থাকাকালীন কোনো দুর্নীতিতে জড়াইনি। আমার বিরুদ্ধে কাজ-প্রসঙ্গে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ করা যাবে বলে আমি মনে করি না। আমার সাথে যে অন্যায় হলো তা আমাকে বলতে হবে না, বহু বছর পরেও আমার কাজগুলো তা বলবে। ভালো করে ভাবলে বলতে পারি, মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বা সচিবের বিরক্ত মুখ আমাকে যতটা কষ্ট দেয়, তার থেকে বহুগুণ আনন্দ দেন প্রান্তিক অঞ্চলের কোনো পাঠাগার-সংগঠক, যখন তিনি বলেন, ‘এবার ইউএনওর সাইন লাগবে না? লাইব্রেরির ঠিকানায় বই চলে আসবে? আসেন আপনারে মিষ্টি খাওয়াবো।’

এই স্মৃতিগুলো আমি দীর্ঘদিন ধরে লালন করব। দায়িত্বশেষে আমার নিজের জীবনেই ফিরে আসার কথা ছিল। আসার অপেক্ষাও ছিল। সেখানে সাহিত্য চর্চায় আমি আবারো নিমজ্জিত হতে পারবো, আপাতত এই আনন্দ নিয়েই আছি। শুধু খারাপ লাগে অফিসের প্রিয়জনদের জন্য, যারা আত্মার খুব কাছের হয়ে উঠেছিলেন, আমার কারণে তাঁরা প্রতিষ্ঠান নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন, জান দিয়ে সেই স্বপ্নের পিছনে ছুটছিলেন। আমার কারণে যে তাদের সেই স্বপ্নে হতাশা এল, এই বেদনা ভয়াবহ। তাঁরা যেন আমাকে ক্ষমা করেন। হুট করে টিকেট কেটে আমাকে যখন এয়ারপোর্টে দিতে এসেছিলেন তখন পরিণত বয়সের এতগুলো মানুষ অঝোরে কাঁদছিলেন, দেখে আমি দ্রুত এয়ার পোর্টের ভিতরে ঢুকে গেছি।

পর্ব—৪: জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সংস্কার
আমি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে আগে কখনো যাইনি। প্রতিষ্ঠানটির কাজ সম্পর্কেও আমার কোনো ধারণা ছিল না। তবে তখন মাথার মধ্যে কেবল সংস্কার ঘুরছিল, তাই ধরে নিয়েছিলাম কাজ যা-ই হোক, একটা প্রতিষ্ঠানকে ঢেলে সাজাতে হবে আমাকে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে আমি প্রথম পা রাখি পরিচালক হিসেবে। সহকর্মীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও গাইডেন্সে কদিনেই আমি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কাজের সঙ্গে মিশে যাই। কয়েকদিনেই বুঝতে পারি সাহিত্য নিয়ে ধারণা থাকা এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গেলে জরুরি, তবে সবচেয়ে বেশি জরুরি ব্যবস্থাপনার জ্ঞান। গতানুগতিক কাজগুলো তো বটেই, নিত্য নতুন কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে আমার দিন কাটে। নিজের কাজকে মন থেকে ভালোবাসার চেয়ে সৌভাগ্যের হয়ত আর কিছু হতে পারে না।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র পাঠক সমাজ নির্মাণে কাজ করে। যেহেতু এর মাধ্যমে সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাঠকের হাতে বই পোঁছে দেয়া সম্ভব, তাই পাঠকেরা কী পড়বেন বা শিখবেন, মননশীলতায় কী পরিবর্তন আনবেন, এটি নির্ধারণের ক্ষমতা কিছুটা হলেও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের রয়েছে। পাঠক সমাজ নির্মাণে প্রতিষ্ঠানটি আগে যা করত তাতে গত বছর দেড়েকে দৃশ্যমান যে সমস্ত পরিবর্তন এনেছি ও নতুন যাকিছু করেছি তা নিয়ে আপনাদের জানাতে চাই। (চরম অস্থির ও অনিশ্চিত সময়ের মধ্যে নতুন কিছু করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে এত বেশি ছোটাছুটিতে ব্যস্ত ছিলাম, কখনো সেভাবে বলা হয়নি, ভেবেই রেখেছিলাম টার্ম শেষ হলে যখন হাতে সময় থাকবে, তখন নাহয় বলা যাবে।)

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে অবাক হলাম, ১৯৭৮ সালে নির্মিত বিল্ডিং হাজার হকারের চ্যাঁচামেচির মধ্যে শত তারের বেষ্টনীতে টালমাটাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রঙ নেই, শ্রী নেই। অফিসারদের বাথরুমের অবস্থা ভয়াবহ, দরজা ঠেলে ধরে থাকতে হয়, ছিটকিনি নেই। দরজার নিচের দিকে ক্ষয়ে গেছে, প্রাইভেসি নেই। নানা অব্যবস্থাপনায় দুর্গন্ধে ঠাসা। পানি খাওয়ার ফিল্টার নেই। এই অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতির মধ্যেই তারা নাকি গ্রন্থ উন্নয়নের বা পাঠক সমাজ নির্মাণের কাজ করেন! এখানেই আসেন দেশের প্রথিতযশা শিল্পী-সাহিত্যিক-কবিরা। ভবন মেরামত খাতে কিছু টাকা পড়ে ছিল, হয়ত বছর শেষে ফিরেও যেত। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ভবনটি মেরামতের কাজে হাত দিই। কিছুদিনের মধ্যে নতুন ঝকঝকে ওয়াশরুম আর আলোকিত অন্দরমহল পাই আমরা।
ভবন সংস্কার দিয়েই শুরু করি সংস্কার, কারণ, কাজের পরিবেশ ঠিক না হলে তাঁদের কাজ করতে বলব কী করে? যা হোক, এবারে কাজের কথা।

১. জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বিভাগীয়/জেলা বইমেলা। দেশের প্রধান প্রকাশকদের প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ বই নিয়ে জেলা বা বিভাগীয় শহরে মেলা করেছি। এই আয়োজন আগেও কমবেশি হতো, কিন্তু প্রচার প্রচারণার জন্য বিভাগীয় কমিশনার/জেলা প্রশাসক অফিসকে ফান্ড দেয়া হতো। সে ক্ষেত্রে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেই। তাই প্রচারণার বিষয়টি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে লাগিয়ে করা আরম্ভ করলাম। স্কুল- কলেজ, শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা কিছুই বাদ পড়ল না। এতে করে তুমুল জাগরণের সৃষ্টি হলো। শিশু-কিশোরদের ঢল নামল। যদিও মেলা বইয়ের কাছে মানুষকে আনার জন্য, তবুও সংখ্যা ছাড়া এর সফলতা নির্ণয় করা কঠিন। তাই সেভাবে বলতে গেলে, আগে একেক মেলায় ৫-৬লাখ টাকার বিক্রি হতো, এবারে হয়েছে ২৫-৩৫লাখ। ক্রমাগত লেগে থাকলে বিভাগীয় শহরে একেকটি একুশে বইমেলার মতো বিশাল আয়োজনের দিকে যাবে একদিন এই বইমেলা।

২. সারাদেশের ব্যক্তিগত মালিকানার পাঠাগারের জন্য ‘পাঠাগার নির্দেশিকা সফটওয়ার’ বানানো ও চালু করা হলো। পাঠাগারের নাম-ঠিকানা, বইয়ের সংখ্যা ও তালিকা, লোকেশন, পাঠ কার্যক্রমের ছবি ইত্যাদি তাতে আপলোড করা যায়। প্রত্যেক পাঠাগারের থাকে একটি প্রোফাইল। এতে পাঠাগারের সঙ্গে যোগাযোগে আমূল পরিবর্তন এল।

৩. জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে সরকার সারা দেশে ব্যক্তিগত মালিকানার পাঠাগারে বই নির্বাচন করে বই বিতরণ করে। পাঠাগারের নির্বাচন সে ক্ষেত্রে খুব জরুরি কারণ ভুরি ভুরি ভুয়া পাঠাগার। পাঠাগার ব্যবসা বন্ধে পরিদর্শন চালু করলাম। কর্মকর্তারা পাঁচ দিন অফিসের পরে সাপ্তাহিক ছুটি উপেক্ষা করে সারাদেশে চষে বেড়াতে লাগল। এতে তাদের পারিবারিক জীবন ব্যাহত হলো কিন্তু অস্তিত্বহীন পাঠাগার সনাক্ত হয়ে কার্যকর পাঠাগারের প্রতি অনুদান সেবা, পাঠ কার্যক্রম অংশগ্রহণ বাড়ল। পরিদর্শনের মাধ্যমে সারা দেশের ছোটো-বড়ো পাঠাগারের তথ্য, যোগাযোগ হাতের মুঠোয় চলে এল।

৪. অনুদানের জন্য গ্রন্থাগারের আবেদন প্রাচীন হাতে লেখা পদ্ধতি বন্ধ করে এবারে অনলাইনে নেয়া হয়েছে। ইউএনও অফিসের পিছনে সুপারিশের জন্য ঘুরতে হয়নি প্রান্তিক মানুষদের। সফটওয়ারে ইউএনও সরাসরি মত দেবেন। এরপর আগের মতো বই নিতে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে আসতে হবে না তাদেও, যাদের ঢাকায় থাকারও কোনো জায়গা থাকে না। সফটওয়ারের মাধ্যমে বই বাছাই করে তাতেই জানিয়ে দেবেন, আর গ্রন্থকেন্দ্র থেকে কুরিয়ারে পৌঁছে যাবে বই। (সফটওয়ারের এই শেষ অংশটি সমাপ্ত হতে আর মাত্র ২-৩ মাস লাগবে।) গ্রন্থকেন্দ্রের অল্প জনবল আর মাসের পর মাস বই বিতরণের জন্য ব্যস্ত থাকবে না। (অন্য অনেক ক্রিয়েটিভ কাজ করা যাবে তখন।)

৫. বই বাছাই এবারেই শেষবারের মতো কাগজে হচ্ছে। এরপর সেটাও সফটওয়ারভিত্তিক হবে। এক ক্লিকেই বইয়ের প্রচ্ছদ, সিনপসিস দেখে বই নির্বাচন কমিটি ও গ্রন্থাগারের মানুষেরা বই পছন্দ করবে। মিটিংয়ের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসে অর্থ সাশ্রয় হবে, একই বাজেটে পাঠাগারে আরও বেশি বই দেয়া যাবে।

৬. বই পত্রিকা একটি রাজনৈতিক ক্রোড়পত্রে পরিণত হয়েছিল। নব পর্যায়ে নতুন উদ্যমে সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে তা প্রকাশ হতে শুরু করেছে। (যদিও কোনো মেকআপ, প্রুফ, সম্পাদনার লোক নেই।) অফিসের পরে বা গাড়িতে কাজ করে বই পত্রিকা প্রকাশ হলো দুটো সংখ্যা। বোদ্ধারা প্রশংসাই করলেন।

৭. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পাঠ কার্যক্রমে অল্প বাজেট। কম দামের চিরায়ত বই আর নিজেদের ফি কমিয়ে এনে আরও বেশি বেশি কলেজ-স্কুলকে এবারে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। ৩০০-৪০০ বই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ দূর দূরান্তের জেলার গুরুত্বপূর্ণ কলেজের শিক্ষার্থীদের সাহিত্য পাঠের উৎসাহ দেখলে আনন্দে চোখে পানি আসে।

৮. জাতীয়ভিত্তিক পাঠ কার্যক্রমে উৎসাহ দিয়ে আগের বছরের ৪০-এর জায়গায় এবার ৮০টি পাঠাগারের পাঠকেরা অংশগ্রহণ করছে। একই বইয়ের রিভিউ আর তার উপরে বক্তৃতার প্রতিযোগিতা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যখন এক গাদা বই উপহার নিয়ে ফেরে, তাদের চকচকে মুখ হয় দেখার মতো।

৯. বই নিয়ে আজকাল মানুষ মুখোমুখি কথা বলা ভুলেই গেছে। ভাবলাম ফেরাই আশির দশক আবার। এই জ্যাম-হকারের এলাকাতেই পাঠচক্রের কথা তুললাম। জুটেও গেল অআকখ নামের এক পাগল-পড়ুয়া দল। দ্রুতবেগে পরপর ছয়-ছয়টি পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হলো। খুবই লো-বাজেট। একজন মাত্র অতিথি লেখক, আর চা-নাস্তা অতি সামান্য। নাচ-গান নয়, কিন্তু ভিডিওগুলোতে ৪-৫ লাখ ভিউ, শত কমেন্ট। মানুষ দূর দূরান্ত থেকে ফোন করতে লাগল, আমাদের শহরে আসেন পাঠচক্র নিয়ে! অআকখ-এর তরুণদের সঙ্গে নিয়ে হয়ত কখনো হতো সেটা. . .

১০. অনুষ্ঠানের সীমা নেই। কদিন পরে পরে আলোচনা, বই আলোচনা, পাঠ কার্যক্রম চলত, চলবেও হয়ত।

১১. পরিদর্শন করানোর ফলে গ্রন্থাগারিকদের ট্রেনিংয়ে এখন হাজির হচ্ছেন কেবল সত্যিকারের গ্রন্থাগারের সংগঠক, আগেকার পাঠাগার ব্যবসায়ীরা নয়।

১২. এ ছাড়া পলিসি তৈরিতে কাজ করেছি আমরা। অনুদানের নীতিমালা সংশোধন-প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পেশ করা হয়েছে। নীতিমালা ছাড়াই যে কার্যক্রমগুলো চলছিল, সেসবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনার জন্য আরও নীতিমালা তৈরি হয়েছে, যেমন, পাঠাগারের তালিকাভুক্তি নীতিমালা। বিভাগীয়/জেলা বইমেলা, ভ্রাম্যমাণ বইমেলা, মিলনায়তন ভাড়া, ইত্যাদি নীতিমালা চলমান।

১৩. উপজেলা পর্যায়ে যেহেতু আমাদের কোনো কার্যক্রম নেই, তাই বুক ভ্যান দিয়ে সেসব স্থানে স্কুল কলেজের সামনে ভ্রাম্য মান বইমেলা করার আয়োজন চলছিল। ২-১ মাসের মধ্যে শুরু হতো।

১৪. বিল্ডিংয়ের অডিটোরিয়াম সংস্কার করার ফলে তা ভাড়া দেয়ার উপযুক্ত হয়েছে। ১-২ মাসের মধ্যে নীতিমালা প্রকাশ করে ভাড়া কার্যক্রম শুরু করার কথা। চাহিদা আছে বলে এতে প্রচুর আয় হবে।

আর মজার ব্যাপার হলো, এসমস্ত কাজ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র করেছে কেবলমাত্র হাতে গোনা ৪-৫ জন অফিসার দিয়ে। একটা শক্তিশালী টিম তৈরি করেছি। কাজের স্পৃহা তৈরি করেছি। আমার মতে এটাই আমার সবচেয়ে বড়ো সংস্কার। তারা যা করেন ভালোবেসে করেন, এ এক পরম পাওয়া।

আরও যা করা যেতে পারে
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় তথা সরকারের জন্য প্রভূত সম্ভাবনার জায়গা। সরকার এর মাধ্যমে গ্রন্থ নিয়ে কাজ করতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটি দেশে-বিদেশে প্রচুর কাজ করতে পারে। ওদিকে, গ্রন্থকেন্দ্রের কাজগুলো পরস্পর ভিন্নধর্মী কিন্তু লোকবল সে অনুসারে সজ্জিত নয় বলে এক কাজকে স্থগিত রেখে অন্য কাজ করতে হয়। অথচ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এমন হতে পারত যে সারাবছর একাধারে বইমেলা, পাঠাগার কার্যক্রম, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও অনুষ্ঠানাদি চলতে পারে। আবার বিভাগীয় বইমেলা আয়োজন প্রতিষ্ঠানটি রাজধানীতে বসে পরিকল্পনা ও পরিচালনা করে, এতে যেমন সমস্যাও প্রচুর, স্থানীয় প্রশাসনের উপরে নির্ভরশীলতাও প্রকট। এ ক্ষেত্রে বিভাগীয় পর্যায়ে শাখা অফিস স্থাপন করা যেতে পারে, যে নির্দেশনা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আইনসিদ্ধ।

বাংলাদেশে অন্তত ৭০টি শতবর্ষী ও প্রাচীন পাঠাগার আছে, কোনোটা ধুকে ধুকে টিকে আছে, কোনোটা অকার্যকর। পাঠাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরে সহায়তার প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। সাহায্যকল্পে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে ইতোমধ্যে তাদের বিচিত্র প্রয়োজনের তথ্য সংগ্রহ করেছে। সরকার চাইলেই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে শতবর্ষী পাঠাগারগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে তাদের মডেল পাঠাগার হিসেবে ঘোষণা দিতে পারে। এতে করে নতুন পাঠাগার গড়ে তোলার চেয়ে অতি অল্প ব্যয়ে দেশ বিশাল ও সমৃদ্ধ বহু পাঠাগার পেয়ে যেতে পারে, যা চৌকস সরকারের অবদান হিসেবে স্মরিত হবে।

লোকবল সন্নিবেশ ও নানান প্রশাসনিক জটিলতায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আন্তর্জাতিক বইমেলা ও পুরস্কার প্রদান কার্যক্রম স্থগিত হয়ে আছে। এই দুই কর্মযজ্ঞ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সুনামের নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক বইমেলার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা ও এজেন্টদের প্রণোদনা দিয়ে দেশের প্রখ্যাত গ্রন্থ অনুবাদের ও বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশের সুযোগ গ্রহণ করা জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষুদ্রাকারে শুরু করলেও একদিন তা বিশাল আকৃতি নিতে পারে। বাংলাদেশের সাহিত্যের মান অন্য ভাষাভাষীদের জানানোর সুযোগ তৈরি না করলে চিরকাল তা অবহেলিত ও গোচরেই থেকে যাবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন, পাঠাগার সংক্রান্ত গবেষণা, পাঠাগারের ডিজিটাইজেশন এ ধরনের বহু সম্ভাবনাময় কাজ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে করা সম্ভব।

সরকারি উদ্যোগে গ্রন্থনীতির একটি বাস্তবায়নযোগ্য খসড়া প্রস্তুত করা আছে। সেটির বিষয়ে বর্তমানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় মনোযোগী হতে পারে। যেহেতু সংস্কৃতি নীতি সংস্কারের কাজ চলছে, তার অংশ বলেই, গ্রন্থনীতির অনুমোদন ও বাস্তবায়ন ছাড়া সংস্কৃতি নীতি অপূর্ণ থেকে যাবে। আর কেবলমাত্র গ্রন্থনীতির বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিলেই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র তথা পাঠক সমাজের জন্য যা প্রয়োজন তা-ই করা হবে।

গুরুত্বপূর্ণ ও শেষ প্রশ্ন: সংস্কার কি হবে?

  • আফসানা বেগম: কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.